পশ্চিমা ফ্যাশন ব্রান্ডগুলো কতটা দায়িত্বশীল?

প্রাইমার্কের পোশাক তৈরি হতো রানা প্লাজার একটি কারখানায়
ছবির ক্যাপশান, প্রাইমার্কের পোশাক তৈরি হতো রানা প্লাজার একটি কারখানায়
    • Author, মোয়াজ্জেম হোসেন
    • Role, বিবিসি বাংলা, লন্ডন
  • Published

সস্তা মূল্যে মাত্র এক মৌসুমের জন্য যে ধরণের পোশাক ইউরোপ-আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তার নাম দেয়া হয়েছে ফাস্ট ফ্যাশন।

কিন্তু এই ফাস্ট ফ্যাশনের সত্যিকারের মূল্য বিশ্ব জানতে পারলো ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের মতো এক বিরাট ট্র্যাজেডির মাধ্যমে।

রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। কারখানা নিরাপত্তা নিয়ে চাপ তৈরি হয় পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর।

তখন দাবি উঠলো, পশ্চিমের যেসব নামকরা ফ্যাশন ব্রান্ড বাংলাদেশের সস্তা শ্রমের পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে, সেই শ্রমিকদের নিরাপত্তার দায়ও তাদের নিতে হবে।

“এটা ছিল এমন একটা বিরাট ট্র্যাজেডি, যা এই শিল্পের ওপর এক বিরাট প্রভাব ফেলেছিল, এবং এ শিল্পকে অনেক দিক থেকে পাল্টে দিয়েছে”, বলছেন জাস্টিন বেটি, যিনি গত দেড় দশক ধরে যুক্ত আন্তর্জাতিক পোশাক শিল্প খাতের সঙ্গে।

clean_clothes_campaign
ছবির ক্যাপশান, সুইডিশ ব্রান্ড এইচএন্ডএমের বিরুদ্ধে ক্লিন ক্লোদস ক্যাম্পেইন অভিযোগ তুলছে, যে তারা বাংলাদেশে অনেক কারখানা ব্যবহার করছে, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ

তার ভাষায়, সেই প্রথম বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ফ্যাশনব্রান্ড গুলোর বোর্ড রুমে বড় কর্তাদের নড়ে-চড়ে বসতে হলো। গার্মেন্টস কারখানাগুলোর চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশকে আর উপেক্ষা করার কোন সুযোগ তাদের ছিল না।

জাস্টিন বেটি এখন কাজ করেন সেডেক্স নামের একটি সংস্থার সঙ্গে। মার্কস এন্ড স্পেন্সার, টেসকো থেকে শুরু করে ব্রিটেনের অনেক বড় বড় ব্রান্ড তাদের সদস্য।

সেডেক্স মূলত তাদের সদস্য কোম্পানিগুলোকে পরিচ্ছন্ন সাপ্লাই চেন বজায় রাখার মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্বশীলতা পালনে উৎসাহিত করে।

কিন্তু রানা প্লাজা ধসের পর গত তিন বছরে অবস্থা আসলে কতটা বদলেছে? বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোকে নিরাপদ করতে কতটা এগিয়ে এসেছে ইউরোপ-আমেরিকার নামকরা ফ্যাশন ব্রান্ডগুলো।

“আমার মনে হয় রানা প্লাজার পর সবচেয়ে ভালো যে কাজটা হয়েছে, তা হলো অনেক বড় আন্তর্জাতিক ব্রান্ড, প্রায় দুশোটির মত ব্রান্ড, কারখানার আগুন এবং ভবন নিরাপত্তার মান কি হওয়া উচিত, সে বিষয়ে একটা অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এর আগে সব কোম্পানি যার যার মত করে এই কাজটা করছিল”, বলছেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন বিজনেস স্কুলের গবেষক সারাহ লেবউইটয।

রানা প্লাজা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনা
ছবির ক্যাপশান, রানা প্লাজা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনা

তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও বাংলাদেশের কারখানা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা যে রয়েই গেছে সেটা স্বীকার করছেন তিনি।

“এখন যেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো, এসব কারখানায় যেসব ত্রুটি ধরা পড়েছে, সেগুলো কে ঠিক করবে। আর অন্যদিকে বাংলাদেশে যে প্রায় সাত হাজার কারখানা আছে, এর মধ্যে এই বড় ব্রান্ড গুলো কিন্তু মাত্র এক হাজার নয়শোর মতো কারখানায় তাদের পোশাক তৈরি হয় বলে স্বীকার করে। এই যে বাকী যে কারখানাগুলো, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোন অগ্রগতি কিন্তু আমরা দেখছি না।”

রানা প্লাজার পর নামকরা ফ্যাশন ব্রান্ডগুলো তাদের নীতি বদলাবে, তাদের সাপ্লাই চেনকে পরিচ্ছন্ন করতে উদ্যোগ নেবে এমনটাই আশা করা হয়েছিল। কিন্তু যারা এসব ইস্যুতে ইউরোপে সক্রিয় প্রচারণা চালায়, তারাও এখন হতাশ।

নেদার‍ল্যান্ডস ভিত্তিক একটি সংগঠন ক্লিন ক্লোদস ক্যাম্পেইনের মুখপাত্র সামান্থা মাহের বলছেন, “যখন কোন কারখানার পরিদর্শন রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে সেটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে, তখন তো দ্রুত সেটা মেরামত করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা যেটা দেখছি, তিন বছর পরও গড়পড়তা মাত্র অর্ধেক মেরামত কাজ শেষ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সংস্কার বা মেরামত কাজ কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন অনেক কারখানায় আগুন লাগলে জরুরী নির্গমণ পথ নেই, নেই আগুনের বিপদ সংকেত বা আগুন নেভানোর জন্য পানি ছিটানোর ব্যবস্থা। এগুলো কিন্তু কোন যেন-তেন ব্যাপার নয়, এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, যার ওপর অনেকের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করছে।”

rana_plaza
ছবির ক্যাপশান, রানা প্লাজার সামনে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী শহীদ বেদি

“কোন ব্রান্ডই যে পুরোপুরি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা বলতে পারছি না যে কোন একটি ব্রান্ড ভালোভাবে চেষ্টা করছে পরিস্থিতি বদলানোর।”

সুইডিশ ফ্যাশন ব্রান্ড এইচ এন্ড এমের ওপর বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ক্লিন ক্লোদস ক্যাম্পেইন।

আগামী তেসরা মে এইচ এন্ড এমের বিরুদ্ধে ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তারা।

সংগঠনের মুখপাত্র সামান্থা মাহের বলেন, “আমরা যে এইচ এন্ড এমের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার কারণ এই নয় যে তারাই সবচেয়ে খারাপ। তাদেরকে আমরা টার্গেট করেছি, কারণ তারাই সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ব্রান্ড। বাংলাদেশ ফায়ার সেফটি একর্ডে কিন্তু তারাই প্রথম স্বাক্ষর করেছিল। এবং এই একর্ড বাস্তবায়নের জন্য যে স্টিয়ারিং কমিটি, সেটিতেও তারা আছে। আর এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের তারাই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। সুতরাং এক্ষেত্রে একটা মানদন্ড ঠিক করার দায়িত্বটা কিন্তু তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি বর্তায়।”

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো কতটা নিরাপদ সে প্রশ্ন উঠছে এখনো
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো কতটা নিরাপদ সে প্রশ্ন উঠছে এখনো

এইচএন্ডএমের বিরুদ্ধে ক্লিন ক্লোদস ক্যাম্পেইন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলছে, যে তারা বাংলাদেশে অনেক কারখানা ব্যবহার করছে, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ।

এসব অভিযোগের জবাবের জন্য বহুবার এইচএন্ডএমের যোগাযোগ করা হলেও তারা সময়ের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে কোন সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরিবর্তে এক লিখিত বিবৃতিতে এইচএন্ডএম জানিয়েছে যেসব কারখানা তাদের জন্য পোশাক তৈরি করে, সেগুলো যেন নিরাপদ হয়, সেটা তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে,“বাংলাদেশে আমরা যেসব সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করি, তাদের সবাইকে একটি টেকসই অঙ্গীকারনামা বা আচরণবিধিতে স্বাক্ষর করতে হয়। এর মানে হচ্ছে তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবেই আমাদের অগ্নি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়।”

বাংলাদেশে এইচ এন্ড এমের পোশাক তৈরি হয় এমন কিছু কারখানার ফটকে তালা মেরে রাখার অভিযোগ সম্পর্কে বিবৃতিতে বলা হয়, “এইচএন্ডএম এর সব সরবরাহকারী এটা নিশ্চিত করেছে যে তারা তাদের কারখানার কোলাপসিবল, স্লাইডিং বা রোলিং শাটার দরোজা এবং এরকম তালা মেরে রাখার সব ব্যবস্থা অপসারণ করেছে। এসবের পরও এক্ষেত্রে আরও কড়া নিয়ম চালুর প্রস্তাবকে এইচ এন্ড এম স্বাগত জানায়।”

রানা প্লাজার ধসে পড়া ভবনটিতে যেসব কারখানা ছিল, তার একটিতে তৈরি হতো প্রাইমার্কের পোশাক।

তিন বছরে বাংলাদেশে কারখানা নিরাপত্তার উন্নয়নে তারা কি করেছে জানতে আমরা কথা বলতে চেয়েছিলাম প্রাইমার্কের সঙ্গে। কিন্তু কোন সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রাইমার্ক এক বিবৃতিতে বলেছে “আমরা বাংলাদেশে আমাদের সহযোগীদের সঙ্গে মিলে কারখানার নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করে চলেছি। এক্ষেত্রে যে আরও অনেক কিছু করার দরকার, সেটা আমরা স্বীকার করি।”