অণ্ডকোষে বরফ বা লাল আলো: শুক্রাণু বাড়াতে অনলাইনে পাওয়া পদ্ধতিগুলো কতটুকু কার্যকর?

- Author, জ্যাকুই ওয়েকফিল্ড
- Role, গ্লোবাল হেলথ রিপোর্টার
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
অনেক পুরুষই তাদের শুক্রাণুর সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন- এই ধারণার প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায় পুরুষের উর্বরতা সম্পর্কিত হ্যাশট্যাগগুলো টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমে শত কোটি ভিউ পেয়েছে।
এমনি একজন হলেন ফ্লোরিডার মায়ামির ২৮ বছর বয়সী সাইমন যিনি শুক্রাণুর কার্যকারিতা 'উন্নত করতে' প্রতিদিন বহু ধাপের একটি রুটিন অনুসরণ করেন।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সাইমন স্টিম বাথ নেন বা বাষ্পীয় স্নানাগারে যান। তাপ তাকে ঘামিয়ে শরীরের টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্ত বের করতে সাহায্য করে এবং তার শুক্রাণুর কার্যকারিতা উন্নত করে বলে তার বিশ্বাস। তবে তাপ থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত সুরক্ষাও নেন তিনি।
"আমি বরফের প্যাক ব্যবহার করি, এর নাম 'চিল নাটস' এবং আমি এটি অণ্ডকোষের ওপর রাখি যাতে উচ্চ শুক্রাণু সংখ্যা বজায় থাকে," বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন ভেনেজুয়েলা-আমেরিকান সাইমন।
তিনি প্রতিদিন সূর্যালোক নেওয়া ও নিয়মিত ব্যায়াম করাও নিশ্চিত করেন। তিনি মাইক্রোপ্লাস্টিক ফিল্টার করা পানি পান করেন এবং সম্ভাব্য টক্সিনের প্রভাব এড়াতে তুলার বক্সার শর্টস পরেন।
শুক্রাণুর মান বাড়াতে সাইমন যেগুলো করছেন এগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণ করার মতো কোনো প্রমাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো নেই।
সাইমন এখনই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না, এমনকি তার কোনো সঙ্গীও নেই। তবে, কম শুক্রাণু সংখ্যা স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগে আছেন তিনি।
"কম উর্বরতা এন্ডোক্রাইন ফাংশন, আপনার টেস্টোস্টেরন লেভেল বা অন্যান্য হরমোনে প্রভাব ফেলতে পারে — আর এটা বড় ধরনের ভয়," তিনি বলেন।
যদিও এন্ডোক্রাইন ফাংশন শুক্রাণু সংখ্যায় প্রভাব ফেলে, কম উর্বরতা সরাসরি এন্ডোক্রাইন ফাংশন বা টেস্টোস্টেরন লেভেলকে বিঘ্নিত করে না।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিশ্বজুড়ে পুরুষদের ফার্টিলিটি বা প্রজনন ক্ষমতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা দেখতে পাচ্ছেন যে ক্রমশ আরো বেশি সংখ্যক পুরুষরা তাদের বীর্য পরীক্ষা করাতে চাইছেন এবং ভবিষ্যতে নিজের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে আংশিক কারণ হলো টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) ও স্টেরয়েডের ব্যবহার বৃদ্ধি, পাশাপাশি পরিবেশগত টক্সিন নিয়ে উদ্বেগ– যা উর্বরতার সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুক্স মিনহাস বলেন, এই মনোযোগের ফল মিশ্র।
"পুরুষদের বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু আমরা কি অপ্রয়োজনীয়ভাবে এই উদ্বেগ বাড়াচ্ছি?"
এদিকে, পুরুষদের প্রভাবিত করা এবং নানা ধরনের পণ্য বিক্রির একটি শিল্পও গড়ে উঠছে, যা এই উদ্বেগকে কাজে লাগাচ্ছে, তিনি যোগ করেন।
অনেকের মতো, সাইমনও প্রথম এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পারেন। তবে তিনি এখনো তার শুক্রাণু পরীক্ষা করেননি এবং তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণও নেই।
"এটা এমন কিছু যা নিয়ে আমি সাধারণভাবে ভীত, তাই আমি আমার উর্বরতা রক্ষা করতে চাই," তিনি বলেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
ইনফ্লুয়েন্সার ব্রায়ান জনসনের কনটেন্ট দেখেই সাইমন তার উর্বরতা নিয়ে "গুরুতরভাবে ভাবতে শুরু" করেন।
বিশ্বজুড়ে শুক্রাণু সংখ্যা কমে আসার কথা বর্ণনা করে সিলিকণ ভ্যালির সাবেক টেক উদ্যোক্তা ও বিলিয়নিয়ার ব্রায়ান জনসন দাবি করেন, তার শুক্রাণু সংখ্যা গড়ের তুলনায় চার গুণ বেশি। তিনি টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু সংখ্যা বাড়াতে সাউনা বা স্টিম বাথ ও বরফ প্যাক ব্যবহারের মতো পদ্ধতির কথা প্রচার করেন — যা সাইমন অনুসরণ করেন।
জনসনের কনটেন্ট ছয় মিলিয়ন বা ৬০ লাখের বেশি মানুষ অনুসরণ করে, তিনি সম্ভাব্য গ্রাহকদের তার ওয়েবসাইট 'ব্লুপ্রিন্ট'-এ নিয়ে যায়, যেখানে তিনি সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করেন।
তিনি এধরনের একমাত্র কণ্ঠ নন। অন্যান্য ইনফ্লুয়েন্সাররাও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচার করেন, যেমন– নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট, রেড লাইট থেরাপি এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক "ছেঁকে বের করার" জন্য রক্তদান।
স্বাস্থ্য বিষয়ক এই ইনফ্লুয়েন্সারদের কনটেন্ট এসেছে বিশ্বব্যাপী জন্মহার কমার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরএফকে জুনিয়র সম্প্রতি একটি "উর্বরতা সংকট"-এর কথা বলেছেন, দাবি করে যে ১৯৭০ সালে "পুরুষদের শুক্রাণু সংখ্যা আজকের কিশোরদের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল"।
কিশোরদের শুক্রাণু সংখ্যা ১৯৭০ সালের পুরুষদের তুলনায় কম — এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আর কিছু বড় গবেষণা ১৯৭০-এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী শুক্রাণু সংখ্যা কমেছে বলে ইঙ্গিত দিলেও, বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যাপ্তভাবে গবেষণা করা হয়নি।
এর অর্থ, শুক্রাণু সংখ্যা হ্রাসের কারণ এবং জন্মহারের ওপর এর প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।
একই সময়ে, অ্যান্ড্রু হিউবারম্যানের মতো ইনফ্লুয়েন্সাররাও তাদের পডকাস্টে পুরুষদের শুক্রাণু সংখ্যা হ্রাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, আর জো রগান "জনসংখ্যা ধ্বংস" আসন্ন বলে সতর্ক করেছেন।
জন্মহার কমার পেছনে জৈবিক সক্ষমতা ছাড়াও অনেক কারণ রয়েছে — যা বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতটি দম্পতির মধ্যে একটির ওপর প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকে নিয়মিতভাবেই মানুষকে সন্তান নেওয়া থেকে বিরত রাখার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রজনন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অধ্যাপক চান্না জায়াসেনা বলেন, উদ্বেগের কিছু বাস্তব কারণ থাকলেও সামাজিক মাধ্যমে দাবি অতিরঞ্জিত।
"কিছু চ্যালেঞ্জ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর কারণ কী তা এখনো স্পষ্ট নয়," তিনি বলেন।

লুকাস স্বাস্থ্য বিষয়ক এমন একজন ইনফ্লুয়েন্সার, যিনি তার কনটেন্টে উর্বরতার হার নিয়ে সতর্কবার্তা দেন।
"আমরা বিশ্বব্যাপী একটি মহামারি দেখছি, সার্বিকভাবে প্রজনন ক্ষমতা কমছে," তিনি বিবিসিকে বলেন।
তিনি তার ইউটিউব দর্শকদের এটিও বলেছেন যে ৩৩ বছরের মধ্যে পুরুষেরা বন্ধ্যা হয়ে যাবে।
তিনি অনলাইন কোর্স বিক্রি করেন, ব্যক্তিগত পরামর্শ দেন এবং টেস্টোস্টেরন ও উর্বরতা বাড়াতে চাওয়া পুরুষদের জন্য সাপ্লিমেন্টও বিক্রি করেন।
তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট, যেখানে কিছু অপ্রমাণিত পদ্ধতি প্রচার করা হয়, ভাইরাল হয়েছে।
"আমি ছেলেদের বলি, দিনে দুই থেকে তিনবার, ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য অন্তর্বাসের ওপর বরফ প্যাক লাগাতে," তিনি বলেন। সঙ্গে দাবি করেন যে, তার ক্লায়েন্টদের কেউ কেউ এর ফলে তাদের সঙ্গীকে গর্ভবতী করতে পেরেছেন।
তার কিছু অনুসারী অণ্ডকোষের ওপর বা সামনে রেড লাইট ডিভাইসও ব্যবহার করেন।
"এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে কোনো ক্ষতি না হওয়ায় এটি চেষ্টা করার মতো একটি কৌশল বলে আমি মনে করি," তিনি বলেন।
তার পরামর্শের অপ্রমাণিত দিক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লুকাস বলেন, অণ্ডকোষে বরফ দেওয়া একটি "আশাব্যঞ্জক পদ্ধতি", তবে তিনি এ বিষয়ে আরও গবেষণা দেখতে চান।
তিনি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও ব্যায়ামের পরামর্শও দেন – যেগুলোর পক্ষে জোরালো প্রমাণ রয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

প্রজনন ক্ষমতা সম্পর্কিত এসব পরামর্শ এমন সময় এসেছে, যখন বডিবিল্ডিং ও 'লুকসম্যাক্সিং'—অর্থাৎ চেহারা উন্নত করার অনলাইন প্রবণতার কারণে পুরুষদের মধ্যে টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর ওষুধ গ্রহণের হার বাড়ছে।
কিন্তু স্টেরয়েড ও টেস্টোস্টেরন গ্রহণ উর্বরতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ইনফ্লুয়েন্সাররা বিভিন্ন ওষুধের 'স্ট্যাক' ব্যবহারের পরামর্শ দেন — যা তারা প্রায়ই নিজেদের ওয়েবসাইটে বিক্রি করেন।
এর মধ্যে রয়েছে এইচসিজি ও এইচএমজি নামের ওষুধ, যা পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই উর্বরতা হরমোন সক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়।
তবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এগুলো নেওয়া বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং স্থায়ী ক্ষতিও করতে পারে।
"এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক," বলেন অধ্যাপক জায়াসেনা। "(কিছু ক্ষেত্রে) রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, এমনকি স্তনের বৃদ্ধিও ঘটাতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না করলে বিকৃতির কারণ হতে পারে।"
আমরা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার সাতজন পুরুষের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা টিআরটি নেওয়ার পর তাদের উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে এসব 'স্ট্যাক' ব্যবহার করছিলেন।
অনলাইনে স্টেরয়েডের মতো ওষুধ কেনা অবৈধ হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
একজন বলেন, তিনি "এইচএমজি ও এইচসিজি নেওয়ার পর অনেক সন্তানের বাবা হবেন" বলে ভেবেছিলেন।

জামাল (ছদ্মনাম) বডিবিল্ডিংয়ের জন্য উচ্চমাত্রার টেস্টোস্টেরন ও স্টেরয়েড গ্রহণ করেছিলেন, যার ফলে তার উর্বরতা কমে যায়।
গত বছরের শেষ দিকে তিনি এটি বন্ধ করেন, যখন তিনি ও তার সঙ্গী সন্তান নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন।
তিনি অনলাইন ফোরাম ও ইউটিউব থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার পুরুষদের কাছ থেকে "নিশ্চিত কার্যকর" বিভিন্ন ওষুধের স্ট্যাক নেওয়ার পরামর্শ পান।
"অনলাইনে মানুষ বলেছে, 'এভাবে নাও, এটাই করো'," বলেন জামাল। "আমি জানি এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের কাছে যাওয়া ভালো, কিন্তু আমি এগুলো এ ধরনের কিছু প্রকাশনা দেকেই কিনেছি।"
এসব পদ্ধতি কাজ না করায় তিনি পেশাদার সাহায্য নেন এবং অধ্যাপক জায়াসেনার সঙ্গে দেখা করেন।
ততদিন পর্যন্ত তিনি জানতেন না যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এসব 'স্ট্যাক' নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
অধ্যাপক জয়সেনার পরামর্শে জামাল এখন সব ধরনের ওষুধ বন্ধ করেছেন, যার মধ্যে উর্বরতা স্ট্যাকও আছে।
ছয় মাস পরে তার স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন লেভেল উন্নত হচ্ছে, তবে শুক্রাণু উৎপাদন উদ্দীপক হরমোন এখনো কম।
তিনি ও অধ্যাপক আশা করছেন এটি সময়ের সঙ্গে উন্নত হবে।
অধ্যাপক জায়াসেনা সতর্ক করেন, পুরুষ উর্বরতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও এতে তথ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে – যার ফলে জামালের মতো অনেকেই ইনফ্লুয়েন্সারদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন, কারণ বিশেষজ্ঞদের কাছে পৌঁছানো সবসময় সহজ নয়।
"সবচেয়ে ভালো হলে এটি তাদের প্রকৃত উপকারী কাজ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে, আর সবচেয়ে খারাপ হলে তাদের ক্ষতিকর কিছু করতে প্ররোচিত করতে পারে," তিনি বলেন।








