করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ কি বন্ধ করা হবে?

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠানো নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

তাদের অনেকেই কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন।

এরকম একজন ঢাকার বাসিন্দা মাহবুবা ডিনা।

তিনি বলছেন, ''বলতে পারেন, এটা আমার একধরণের সচেতনতা। আমার কাছে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে। বলাই তো হচ্ছে, সবাই একটু দূরে দূরে থাকতে, মেলামেশা কম করতে। বাচ্চারা তো এসব হাইজিনের ব্যাপার-স্যাপার বুঝে না। স্কুলের রুমগুলোও ছোটছোট। তার ওপর তাদের আনা নেয়ার সময় পরিবহন ব্যবহার করা, স্কুলে সামনে অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে মেলামেশা-ইত্যাদি তো হচ্ছে।''

''তাই আমি নিজে থেকেই বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি। পড়াশোনার ক্ষতির চেয়ে আমার কাছে বাচ্চার নিরাপত্তাই আগে''।

তবে আরেকজন অভিভাবক, ইশরাত জাহান, তিনি তার সন্তানদের স্কুলে পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন।

তিনি বলছেন, "এই মুহূর্তে বাচ্চাদের একটা পরীক্ষা চলছিল। তাছাড়া আমাদের দেশে তো এখনো সেরকম কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, ওরকমভাবে (ভাইরাস) ধরা পড়েনি, কোন সমস্যাও হয়নি। সেজন্যই বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছি। তাছাড়া স্কুলগুলোও তো বন্ধ করেনি।"

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে স্কুল- কলেজ খোলা রাখা না রাখার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এখনো স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়ার মতো সময় আসেনি।

তবে অনেক অভিভাবক সরকারের কথায় কান দিচ্ছেন না।

ঢাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারিভাবে স্কুল-কলেজ বন্ধ করার ঘোষণা না আসায় তারা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে পারছেন না, যদিও অভিভাবক এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন:

একাধিক স্কুলের কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে জানিয়েছেন, অভিভাবকরা প্রতিদিনই তাদের কাছে স্কুল বন্ধ করে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন। স্কুলে শিক্ষার্থীদের হাজিরা গত এক সপ্তাহ ধরে কমছে। উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষকদের মধ্যেও। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত না আসায় তারা এখনি স্কুল বন্ধ করে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।

ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপ্যাল অধ্যাপক ফওজিয়া বলছেন, ''সকাল থেকে আমার স্কুলে যে শিফটগুলো চলে, তাতে দেখলাম অনেক বাচ্চারা অনুপস্থিত। ৩০%, ৫০% উপস্থিতি নেমে এসেছে। অনেক বাচ্চা আসছে না।''

''অভিভাবকদের একটা অনুরোধ ছিল যে, দুই সপ্তাহ যেন স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। তারা ভাবছেন, বাচ্চারা প্রতিদিন আসলে একটা গ্যাদারিং হয়, সেখান থেকে যদি করোনাভাইরাস ছড়ানোর মতো পরিস্থিতির তৈরি হয়, তাই বন্ধ রাখাই ভালো।''

''কিন্তু স্কুল বন্ধ রাখার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। তাই আমরাও বন্ধ করতে পারছি না। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এলে আমরাও বন্ধ করে দেবো। আমরা সেই নির্দেশনার অপেক্ষা করছি।'' বলছেন প্রফেসর ফওজিয়া।

ধানমণ্ডির একটি স্কুল, এক্সেল একাডেমীর উপদেষ্টা জিনাত আফরোজা বলছেন, ''আমাদের মধ্যেও উদ্বেগ আছে, শিক্ষকদেরও উদ্বেগ আছে। উপস্থিতিও অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্তু হুট করে আলাদাভাবে স্কুল বন্ধ করে দিতে চাচ্ছি না। আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার মনে হয় অন্যান্য স্কুলগুলোও তাই করছে।''

''এমনিতে স্কুলে যারা আসছে, তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সতর্কতার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যেমন নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো আমরা অনুসরণ করছি।''

তিনি জানান, আপাতত স্কুলে কোন পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে না, অ্যাসেম্বলি হচ্ছে না। স্কুলের অন্যান্য ইভেন্ট বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু স্কুল বন্ধের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

করোনাভাইরাস আক্রান্ত অনেকগুলো দেশেই স্কুল-কলেজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

স্কুল বন্ধ করা না করার নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও। সেখানে অনেক অভিভাবক এখনি স্কুল বন্ধ করে দেয়ার দাবি তুলছেন।

কী বলছেন শিক্ষামন্ত্রী

তবে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তারা সব দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনি বলছেন, বাংলাদেশে এখনো করোনা পরিস্থিতি এখনো এমন হয়নি যে, স্কুল-কলেজ বন্ধ করার কোন ধরণের কোন বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত অনেক দেশেই স্কুল কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেন সেই পদক্ষেপ নিচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, '' দেখুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে ১৩৬টি দেশ। তাদের সবাই কিন্তু স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়নি। তার মধ্যে ৬১টি দেশ আংশিকভাবে, বা পুরোপুরি স্কুল বন্ধ করেছে, সবাই কিন্তু করেনি।''

''যেসব দেশে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছে, সেসব দেশে করেছে। আমাদের এখানে তো তা হয়নি। বিদেশ থাকা আসা কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছিলেন, আর একজনের স্ত্রী আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারা সবাই ভালো হয়ে গেছেন। আমাদের স্থানীয় সংক্রমণের কোন তথ্য নেই, আর আমরা স্কুল বন্ধ করে দেবো, তখন তো আরো বেশি আতঙ্ক ছড়াবে।''

তিনি বলছেন, ''সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সব দপ্তরকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আপাতত স্কুল বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন দেখা দিলে অবশ্যই বন্ধ করা হবে।''

তিনি বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের কারণে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত তথ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে তো সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সামনেই রোজা ও গ্রীষ্মকালীন লম্বা ছুটি থাকার কথা রয়েছে। ফলে অনেকে মনে করছেন, এখন লম্বা ছুটিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা খানিকটা ব্যাহত হতে পারে।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, স্কুল বন্ধ ঘোষিত হলে অথবা শিক্ষার্থীরা স্কুলে না এলেও, তাদের পড়াশোনার যাতে কোন ক্ষতি না হয় বা পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য তারা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।