আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠকেও 'পুশ-ইন' নিয়ে সমাধান মেলেনি
- Author, ময়ূরী সোম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্তে নানা জায়গায় যখন প্রায় নিয়মিতই ভারত থেকে 'পুশ-ইন'এর প্রচেষ্টা চলছে, তার মধ্যেই দিল্লিতে বিএসএফ আর বিজিবির মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও এর কোনো সমাধান পাওয়া যায় নি বলেই বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে যখন কাউকে ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, সেটা ভারতের দিক থেকে 'পুশ-ব্যাক' আর বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটাই 'পুশ-ইন'।
দিল্লিতে আট থেকে ১১ই জুন পর্যন্ত দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে যে 'পুশ-ইন' বা 'পুশ-ব্যাক' গুরুত্ব পাবে, তা আঁচ করা গিয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্যার যে কোনো সমাধান পাওয়া যায় নি, তা বিবিসি বাংলার কাছে নিশ্চিত করেছে দুই দেশেরই কূটনৈতিক সূত্রগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈঠক শেষে প্রথাগত যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত না হওয়া থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
তেসরা জুন প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফ জানিয়েছিল, দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠকে একাধিক সীমান্ত-নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
এর মধ্যে ছিল কাঁটাতার অতিক্রম করে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতে প্রবেশ, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্ত-অপরাধ দমনের মতো বিষয়।
তবে উভয় দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, এসব ইস্যু নিয়ে আলোচনা খুব একটা প্রীতিকর পরিবেশে হয়নি। সীমান্ত-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতেও কোনো পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি বলে সূত্রগুলোর বক্তব্য।
বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্র বিবিসিকে বলেছে, "সীমান্ত আউটপোস্ট দিয়ে কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের 'পুশ-ইনের' মাধ্যমে নয়, বরং অফিশিয়াল প্রোটোকল এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিজার মেনে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রত্যার্পণ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।"
অন্যদিকে, ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, "নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য দুই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেগুলো বেশ কয়েক বছর ধরে পেন্ডিং অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের ফেরত পাঠাতে আমাদের বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।"
পশ্চিমবঙ্গে 'ডিটেক্ট ডিলিট ডিপোর্ট' অভিযান
এই বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। গত মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রথমবার রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং রাজ্য থেকে 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'দের 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তার বক্তব্য, যারা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতায় পড়েন না, তারা 'পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'।
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ভারতে আসা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না।
গত মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অভিযান চলছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জেলায় জেলায় গড়ে তোলা 'হোল্ডিং সেন্টার'-এ রাখা হচ্ছে।
সাতই জুন মি. অধিকারী জানান, যে ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ৮৬৩ জনকে রাজ্যের বিভিন্ন 'হোল্ডিং সেন্টার'-এ আটক রাখা হয়েছে।
তবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ উঠছে, যাদের ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে 'পুশ-ইন' করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই কাঁটাতারের মাঝখানে জিরো লাইনে খাদ্য ও পানীয় জল ছাড়া আটকে পড়ে আছেন।
ভারতের পক্ষ থেকে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তাদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন বলে বিবিসি বাংলা সহ বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ২,২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে।
বিজিবির দাবি, চলতি মাসের ছয়ই জুন পর্যন্ত বিএসএফ ২০০-রও বেশি মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২৯শে মে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, "বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, আমরা ২,৬৮০জন ব্যক্তির তালিকা বাংলাদেশ পক্ষের কাছে পাঠিয়েছি যাতে তারা নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে আমরা বাংলাদেশের নাগরিকদের ডিপোর্ট করার অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।"
তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে। "আমরা আশা করছি, এ বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে দ্রুত সাড়া পাওয়া যাবে, যাতে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এখানে অবৈধ ভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়।"
এদিকে, 'পুশ-ইন' নীতি নিয়ে সম্প্রতি বিতর্কের মুখে পড়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন,আসামে আটক হওয়া কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরাসরি সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের দিক থেকে এই পুশ-ইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
প্রত্যর্পণের আইন কী বলে?
ভারতের প্রচলিত আইনে বৈধ ভ্রমণ নথি, যেমন পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশকারী বিদেশি নাগরিকদের বিএসএফ বা পুলিশ আটক করলে তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অভিযুক্ত বিদেশি নাগরিকদের রাজ্যের বিভিন্ন সংশোধনাগারে রাখা হয়। সাজা সম্পূর্ণ হওয়ার পর তাদের জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের কাছে তথ্য পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার পর স্থানীয় পুলিশ সুপার, জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং বিএসএফের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে ওই বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, নাবালক বা কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে আটক করা হলে তাদের সংশোধনাগারের পরিবর্তে পর্যবেক্ষণ গৃহে রাখা হয়। তাদের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পর নিজ দেশে প্রত্যর্পনের ব্যবস্থা করা হয়।
'স্বেচ্ছায় ফিরে যাচ্ছেন অনেকে'
পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভার সদস্য অশোক কীর্তনিয়া বিবিসির কাছে দাবি করেছেন, ৪ হাজার ৮০০ 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী'কে ফেরত পাঠানোর যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
রাজ্য পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য জেলায় জেলায় সূত্রভিত্তিক অভিযান চালানো হচ্ছে। যাদের কাছে ভারতীয় নাগরিকত্বের যথাযথ নথি নেই, তাদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে।
এদিকে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে, কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের একটি অংশ নিজেরাই বাড়িঘর ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছেন।
উত্তর কলকাতার নাগেরবাজারের একটি বস্তির এক বাসিন্দা বিবিসিকে জানান, ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৪০টি বাংলাদেশি পরিবার গত কয়েক মাসে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
"আমাদের প্রতিবেশীরা বলতেন তাদের দেশের বাড়ি ঢাকা, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরাতে। তাদের বেশির ভাগ এখানে ময়লা তোলার কাজ করছিলেন। কয়েকজন বড়বাজার, ভাঙড়, লেক টাউনের দোকানপাটে কাজ করতেন। অশান্তির, অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না চেয়ে, মারপিটের ভয়ে বাধ্য হয়ে ওপারে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা," নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি।
তিনি আরো বলেন,তার বাংলাদেশী প্রতিবেশীদের কাছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মতো একাধিক ভারতীয় নথি ছিল এবং তারা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ভোগ করতেন।
"অনেকের ছেলে মেয়ে নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতালে জন্মেছে ভারতীয় নাগরিক হয়ে। তারা এখানে স্কুলেও যেতেন। হঠাৎ কিছুদিন ধরে দেখছি, তারা দিনের আলোয় তাদের জিনিসপত্র গুঁটিয়ে চলে যাচ্ছেন।"