আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
করোনাভাইরাস: প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবিগুলো যাচাই করা হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছুদিন ধরেই নিজের নেয়া পদক্ষেপগুলোর প্রশংসা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক কিছু দাবির সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করেছে বিবিসি।
দাবি ১: 'পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভাল অবস্থানে রয়েছে। মানুষ যখনই পরীক্ষা করাতে চায়, তখনই তা পারে তারা'
মার্চের শুরুতে হোয়াইট হাউজ স্বীকার করে যে যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষা করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কিট নেই।
কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে অভিযোগ করা হয় যে তারা কিট যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।
সরকার জানিয়েছে, ১০ লাখের চেয়ে বেশি কিট এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরো কিট আসছে।
তবে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক কম সংখ্যক পরীক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র - ৩রা জুনুয়ারি থেকে ১১ই মার্চ পর্যন্ত প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ২৬টি পরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সংখ্যাটি ৪ হাজার।
আরো পড়তে পারেন:
প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য যুক্তরাজ্যে চালানো পরীক্ষার সংখ্যা ৪০০ এবং ইতালিতে ১০ই মার্চ পর্যন্ত এই সংখ্যা ১ হাজার।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কম সংখ্যক পরীক্ষা হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকার সম্ভাবনা আছে।
দাবি ২: ১১ই মার্চে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন: "চীনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে আমরা জীবন বাঁচিয়েছিলাম ইউরোপের বিষয়েও একই ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
এর আগে অনেকবারই যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হিসেবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে চিহ্নিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার দাবি, এর ফলে বহু মানুষের জীবন বেঁচেছে।
৩১শে জানুয়ারি সিদ্ধান্ত জানানো হয় যে, পূর্ববর্তী ১৪দিন চীনে ছিল এমন কোনো বিদেশি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
চীনে ফ্লাইট যেতো এমন তিনটি প্রধান মার্কিন এয়ারলাইনস এর আগেই ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়।
পরে ফেব্রুয়ারিতে, আগের ১৪দিন ইরানে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তবে ইরান এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকা দেশের তালিকায় ছিল।
এখন ২৬টি ইউরোপীয় দেশ থেকে যুক্তরাজ্য ছাড়া অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া পদক্ষেপের কারণে সরকার প্রস্তুতি নেয়ার সময় পেয়েছে এবং করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু এর ফলে মানুষের প্রাণ বাঁচানো হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা 'তথ্য আদান প্রদান, চিকিৎসা সেবার মালামাল পরিবহণ ও অর্থনীতির' জন্য ক্ষতিকর।
দাবি ৩: ভাইরাসে মৃত্যুর হার নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ৫ই মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন: "আমার মনে হয় ৩.৪% মিথ্যা একটি সংখ্যা...ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সংখ্যাটি ১% এরও নিচে।"
ফক্স নিউজকে দেয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে জানানো করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হার ৩.৪% সংখ্যাটি মিথ্যা।
৩রা মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায় যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত যেসব ব্যক্তি মারা গেছেন, তাদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, তার 'অনুমান' অনুযায়ী সঠিক মৃত্যুর হার '১% এর অনেক নিচে।'
তিনি মন্তব্য করেন যে, মৃত্যু হার বেশি মনে হয়েছে কারণ যারা সামান্য সংক্রমিত হয়েছিলেন তারা ডাক্তারকে জানায়নি এবং তাদেরকে ভাইরাস আক্রান্তদের তালিকায়ও দেখানো হয়নি। কাজেই গড়ে মৃত্যুহার বেড়ে গেছে বলে মনে হয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১%।
দাবি ৪: ৯ই মার্চে ট্রাম্প বলেন: "গত বছর ৩৭ হাজার অ্যামেরিকান সাধারণ ফ্লু'তে মারা যায়। কিছুই বন্ধ করা হয়নি, জীবন ও অর্থনীতি সাধারণভাবে চলেছে...চিন্তা করে দেখুন।"
প্রেসিডেন্টের এই বিবৃতি প্রসঙ্গের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ফ্লু'র কারণে ঠিক কী পরিমাণ অ্যামেরিকান মারা গেছে তা অবশ্য আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার অব ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) ধারণা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২৬ হাজার ৩৩৯ থেকে ৫২ হাজার ৬৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথার সত্যতা রয়েছে, প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লু'তে প্রতিবছর অনেক মানুষ মারা যায়।
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন সাধারণ ফ্লুয়ের চেয়ে সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসে মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি। সাধারণ ফ্লু'তে মানুষের মৃত্যু হার গড়ে প্রায় ০.১%।
দাবি ৫: ৭ই মার্চ ট্রাম্প বলেন: "অতি দ্রুত আমরা একটি প্রতিষেধক তৈরি করতে পারবো।"
এই মুহুর্তে করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক নেই, তবে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এর একটি প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা করছেন।
বাস্তবতা যাচাই করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী বছরের মাঝামাঝির আগে কোনো প্রতিষেধক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
পশুর ওপর প্রতিষেধকের পরীক্ষা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এবং তা যদি পরিকল্পনা মাফিক চলে, এই বছরের মধ্যে মানুষের মধ্যে পরীক্ষাও শুরু করা হতে পারে।
দাবি ৬: ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন: "করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আমরা সর্বোচ্চ আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছি। যে কোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে আগ্রাসী পদক্ষেপ আমরাই নিয়েছি।"
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং কোয়ারেন্টিন করার পদক্ষেপ নিলেও এগুলো যে অন্য কোনো দেশের তুলনায় আগ্রাসী পদক্ষেপ, তা সঠিক নয়।
উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, চীন ও ইটালি দেশব্যাপী কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করেছে যা লাখ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরণের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।