বৃষ্টি-পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত পার্বত্য অঞ্চল, সাজেকে আটকে আছে কয়েকশ পর্যটক

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

ছবির উৎস, RATAN

ছবির ক্যাপশান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

গাড়িতে করে নেওয়া হবে মাচালং বাজারে, সেখান থেকে পার হতে হবে নৌকায়। পরে বাঘাইহাট, গবাখালি ও দিঘিনালা বাজারেও তিন দফায় নৌকায় উঠতে হবে। অর্থাৎ কিছু পথ গাড়িতে আর কিছু পথ নৌকায় পার হয়ে খাগড়াছড়ি যেতে হবে।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে রাস্তায় পানি উঠে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায়, পর্যটন স্পট সাজেকে আটকে পড়া পাঁচশ পর্যটককে এভাবেই কয়েক দফায় সেখান থেকে উদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রথম দফায় একশ জনের মতো পর্যটক সাজেক থেকে রওয়ানা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানা যায়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাজেকে তিনদিন ধরে আটকে থাকা পর্যটক এবং সেখানে থাকা স্থানীয়রা কী পরিস্থিতিতে আছেন, এ বিষয়ে স্থানীয় রিসোর্ট মালিক এবং আটকে পড়া পর্যটকদের সঙ্গে কথা হয়েছে বিবিসি বাংলার।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে অন্তত ৩৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলেও জানা গেছে।

পাহাড় ধসের কারণে রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির সড়ক পথে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানিয়েছেন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকে।

"সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ের মাটি কম বেশি ধসে পড়েছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে সড়ক যোগাযোগ ঠিক রাখার চেষ্টা করছে প্রশাসন, তবে যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে তাতে বড়ো ধস হয় কিনা, এমন শঙ্কা রয়েছে," বিবিসি বাংলাকে জানান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ফাতেমা জান্নাত মুমু।

এদিকে টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড় ধসে তিন দিনে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাহাড় ধসে মৃত্যুর এসব ঘটনায় প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। যদিও এমন ঘটনা এড়াতে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি শুরুর আগে থেকেই নানা তৎপরতা চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

তারা বলছে, স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরে যেতে মাইকিং করাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

এদিকে, অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের ষোলশহরে রেল লাইন পানিতে তলিয়ে থাকায়, এখনও পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে

ছবির উৎস, RATAN

ছবির ক্যাপশান, বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে

রাঙামাটিতে বেড়েছে পাহাড়ধস

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনদিনের ভারী বৃষ্টিতে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে সড়কে বেশকিছু ছোট পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

এসব ঘটনায় এখনও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও, রাঙামাটির সঙ্গে সড়কপথে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ফাতেমা জান্নাত মুমু।

তিনি বলছেন, গত দুই দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার রাঙামাটিতে বৃষ্টির দাপট অনেকটাই বেড়েছে। মুষলধারে বৃষ্টি, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটিতে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এদিকে, জেলা প্রশাসন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত প্রায় আটশ জন আশ্রয় নেওয়ার কথা জানালেও পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় দ্রুতই সেই সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।

"এখন পর্যন্ত চার হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। বৃষ্টি এভাবে চলতে থাকলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে," বলে জানান মিজ মুমু।

এদিকে, রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নে নদী পারাপারের সময় ভেসে যাওয়া দলমনি চাকমা নামে এক ব্যক্তির মরদেহ বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।

এছাড়া, বাঘাইছড়ি–মারিশ্যা–দিঘীনালা সড়কের তিন কিলোমিটার এলাকায় রাস্তা ধসে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানানো হয়।

১১৪টি আশ্রয় কেন্দ্র শুকনো খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী।

"সাজেকে যাওয়ার পথে সড়ক ধসে গেছে, পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে নৌকা দিয়ে পর্যটকদের সাজেক থেকে উদ্ধার করা হবে," বলেও জানান তিনি।

রাঙামাটির-বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে

ছবির উৎস, MUMU

ছবির ক্যাপশান, রাঙামাটির-বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে

সাজেকে আটকে আছেন পর্যটকরা

টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে দেশের পার্বত্য তিন জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে অন্তত চারটি পয়েন্টে সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় পর্যটন স্পট সাজেকের সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে সেখানে আটকে পড়েছেন অন্তত পাঁচশ জন পর্যটক।

সাজেকে আটকে পড়া পর্যটক ফেনীর বাসিন্দা নাইমুল হাসান বিবিসি বাংলাকে জানান, "চারদিন আগে সাজেক ঘুরতে আসছিলাম, এখন আর বের হতে পারছি না। এখন পর্যন্ত থাকা কিংবা খাবার নিয়ে সমস্যা হয়নি। তবে এভাবে চলতে থাকলে কী হবে, টেনশন হচ্ছে।"

পাহাড়ি এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে বলে জানা গেছে। সাজেকের রিসোর্ট মালিক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব বলছেন, "যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে তাতে বন্যা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে বলেই মনে হচ্ছে।"

তিনি বলেন, জরুরি প্রয়োজন রয়েছে এমন পর্যটকদের সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সবাইকে একসাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

"কেউ যদি যেতে না চান বা যেতে না পারেন, সে এখানেই থাকতে পারবেন। দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর যে-সব পর্যটক আটকে গেছেন, তাদের কাছ থেকে থাকা বাবদ কোনো ভাড়া না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিসোর্ট মালিক সমিতি," বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।

তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সাজেকে খাবার পানির সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও জানান মি. ওয়াহাব।

"খাবার এবং পানির সরবরাহ এখন পর্যন্ত ঠিক আছে, অন্তত সাতদিন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না- তবে পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকলে ভিন্ন কিছু ভাবতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এদিকে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের জন্য প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত।

"দিঘীনালা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা পানিতে নিমজ্জিত, তিন থেকে চার ফুট পানি রয়েছে। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রেডক্রিসেন্ট এবং সিভিল প্রশাসনের সবাই তৎপর আছে, পর্যটকদের উদ্ধারে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বুধবার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আট জনের মৃত্যু হয়

ছবির উৎস, Obidul Hoque Chowdhury

ছবির ক্যাপশান, বুধবার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আট জনের মৃত্যু হয়

পাহাড়ধসে মৃত্যু বাড়ছে

টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। গত তিন দিনে জেলাগুলোতে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বুধবার পাহাড় ধসে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটজন এবং চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যুর পর, বৃহস্পতিবারও বান্দরবানের লামা উপজেলায় পৃথক দুটি পাহাড় ধসের ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন এবং কক্সবাজারের চকোরিয়ায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

তিনদিনের ব্যবধানে পাহাড়ধসের ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সময়মতো কেন সরানো হলো না এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগেই নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এসব জেলার প্রশাসকরা।

তারা বলছেন, ভারী বৃষ্টি এবং পাহাড় ধস হতে পারে এমন পূর্বাভাস পাওয়ার পর থেকেই পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে জানান, মানুষকে সচেতন করা, মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানোসহ নানা পদক্ষেপ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা বসতভিটা ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র উঠতে রাজি হন না বলেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি।

"আমাদের ২২০টা আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে, সবাইকে অ্যালার্ট করা হয়েছে, লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কিন্তু অনেক নৃগোষ্ঠীগত এলাকার মানুষের বসবাস যেহেতু পাহাড়ের ঢালে, আপনি চাইলেও তাদেরকে সমতলে আনতে পারবেন না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

পাহাড়ের ঢালে বা পাদদেশে বসবাস করা অনেককে আশ্রয় কেন্দ্রে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় বলপ্রয়োগ করেও অতীতে অনেক সময় কাজ হয়নি বলে জানান, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমরা মাইকিং করছি, মানুষকে জানাচ্ছি, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু অনেকে দেখা গেছে দিনের বেলায় আশ্রয় কেন্দ্রে আসছে আবার রাতে বাড়িতে চলে গেছে, তাকে তো আমি বেঁধে রাখতে পারবো না," বলেন তিনি।