জুলাই চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে ঢাবি শিক্ষকদের তালিকা করলো কারা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য
ছবির ক্যাপশান, ঢাবির দুই প্রো-ভিসিই দাবি করেছেন, এই তালিকাগুলোর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সম্পর্ক নেই
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ১০ মিনিট

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক জুলাইয়ের চেতনা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে যে তালিকার ভিত্তিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি কারা করেছে তা কেউ জানে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক কিছুদিন আগে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফোরাম নামের একটি ব্যানারে শিক্ষকদের নামের তালিকা সংক্রান্ত প্রায় দুইশ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট উপাচার্যের কাছে জমা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি গ্রহণ করার দাবি জানান।

পরে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গত ২৮শে জুলাই সিন্ডিকেট বৈঠকে সেটি উত্থাপন করলে ওই কমিটি গঠন করা হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের ২৩১ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাদের নামের তালিকা সিন্ডিকেটে দেওয়া হয়েছে।

তবে যারা নীল বা গোলাপী শিক্ষকদের কোনো দলই সমর্থন করেন না তাদের নামও রয়েছে এই তালিকায়।

এরই মধ্যে, যেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের নাম ও বিভাগ সংবলিত মোট দুইটি তালিকার কথা জানা গেছে।

এর একটিতে ২৩১ জন এবং আরেকটিতে ১২৫ জন শিক্ষকের নাম ও বিভাগ রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো ঢাবি শিক্ষকদের এই তালিকা কারা, কেন করেছেন? ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিক্ষকদের ব্যানারে কারা রয়েছেন?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

একইসঙ্গে, কীভাবে, কিসের ভিত্তিতে শিক্ষকদের এই তালিকাটি করা হয়েছে?

এদিকে, এই কমিটিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রো-ভিসিই দাবি করেছেন, এই তালিকাগুলোর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আল মুজাদ্দেদি আলফেছানি এবং প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বিবিসি বাংলাকে জানান, ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিক্ষকের ব্যানারে ঢাবির যে শিক্ষকরা উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন সেটিই সিন্ডিকেট বৈঠকে জমা দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় কতজন শিক্ষকের নাম রয়েছে তা জানেন না দাবি করে প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক আলফেছানি বলেন, "২৩১ বা কি এক্সাক্ট আমি বলতে পারবো না। বাট এইখানে বিভিন্ন ধরনের যেসব শিক্ষকরা ওইসময় মনে করা হয়েছে বা তাদের ছবিসহ যে ডকুমেন্টগুলি দিয়েছে ওই সংখ্যাটা কত আমি সঠিক বলতে পারবো না। কারণ উপাচার্যের হাতে ছিল ডকুমেন্টগুলি।"

অন্যদিকে, ঢাবির আরেক প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন তালিকা করেনি বলে দাবি করেছেন। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক সালাম বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মে যা করার যদি কেউ অন্যায় করে থাকেন তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব। যদি অন্যায় না করেন তাহলে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না।"

শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করার দাবি উঠেছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সিন্ডিকেট বৈঠকে কতজন শিক্ষকের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রো-ভিসি

শিক্ষকের দুই তালিকা করলো কারা?

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের নীল দলের সাথে সম্পৃক্ত এমন ৬৮ শিক্ষককে এরই মধ্যে একাডেমিক কার্যক্রম অর্থাৎ পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

চব্বিশের তেসরা অগাস্ট জুলাই বিরোধী মিছিলে অংশগ্রহণের অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীরা অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগে অভিযোগ জমা দিয়েছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০২৪ সালের ১৫ই জুলাই থেকে পাঁচই অগাস্ট পর্যন্ত ক্যাম্পাসে সংঘটিত বেআইনি ও সহিংস ঘটনা অনুসন্ধানে তথ্যানুসন্ধান কমিটি করেছে।

এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

জুলাইয়ে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারও করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এমন প্রেক্ষাপটে, গত ২৭শে জুলাই, সোমবার ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক ফোরামের ব্যানারে ২৩১ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেওয়া হয় উপাচার্য বরাবর।

পরদিনই সিন্ডিকেট বৈঠকে এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ওই সিন্ডিকেট বৈঠকের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর জানায়, "জুলাইয়ের চেতনা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।"

একইসঙ্গে, যাচাই-বাছাইয়ের পর এই ব্যাপারে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

ওই সিন্ডিকেট বৈঠকেই বিভিন্ন অভিযোগে সাদেকা হালিমসহ তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া, আরো চার শিক্ষককে ঢাবির সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে, ২৮শে জুলাই অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট বৈঠকে ২০০৯ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত হওয়া নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল অনিয়ম পর্যালোচনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য কমিটি গঠন করে ঢাবি কর্তৃপক্ষ।

২৮শে জুলাই অনুষ্ঠিত ওই সিন্ডিকেট বৈঠকে "লিস্ট অফ টপ ব্লু টিচার্স" নামে ২৩১ জন নীল দলের শিক্ষকের নামের তালিকা দেওয়া হয়।

ওই তালিকাতে শিক্ষকদের নাম এবং বিভাগ বা ইন্সটিটিউটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের আমলে যেসব শিক্ষক উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অথবা সিন্ডিকেট সদস্য এবং ডিন ছিলেন অর্থাৎ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এমন শিক্ষকদের নাম রয়েছে তালিকায়।

এছাড়া প্রশাসনিক পদে না থাকলেও বিভাগ অনুযায়ী কেবল নীল দল সমর্থন করেন এমন শিক্ষকদের নামও রয়েছে।

২৩১ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রতিটি অনুষদের প্রায় সব বিভাগেরই শিক্ষকদের নাম রয়েছে।

তবে, এই ২৩১ জন শিক্ষকই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেন শিক্ষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো দলের সাথেই নেই এমন শিক্ষকের নামও রয়েছে এই তালিকায়।

যদিও, কতজন শিক্ষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে সেটি দুই প্রো-ভিসি, একইসঙ্গে সিন্ডিকেট সদস্য ও কমিটির সদস্য এই দুজনই জানেন না বলে দাবি করেছেন।

প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক আলফেছানি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মাননীয় উপাচার্য এটা সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করলেন। তখন আমরা বললাম এই যে ডকুমেন্টগুলো দিল এটার সত্যতা কতটুকু এটা যাচাই-বাছাই করতে হবে। সেটা যাচাই-বাছাই করার জন্য উপাচার্য, দুই প্রো-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান এই চারজনে মিলে একটা কমিটি করা হয়েছে। সেই যাচাই-বাছাই কমিটি দেখবে আদৌ তারা দোষী নাকি নির্দোষ?শুধু এটুকুই।"

কোন শিক্ষকরা তালিকাটি করেছে তাদের পরিচয় সম্পর্কেও জানেন না বলে দুইজনই দাবি করেছেন।

প্রো-ভিসি(শিক্ষা) অধ্যাপক সালাম একইসঙ্গে ঢাবির সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়কও।

তালিকাটি কারা করেছে এমন প্রশ্নে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদককে "আপনারা ফাইন্ড আউট করেন" বলে উল্লেখ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২৩১ শিক্ষকের তালিকা করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এখন পর্যন্ত কোন লিস্ট করি নাই বা আমাদের তৈরি নিজস্ব কোন লিস্ট নেই। যেসব লিস্টের কথা বলছেন সেটা কারা দিছে আপনারা ফাইন্ড আউট করেন।"

ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকদের ব্যানারে কোন শিক্ষকরা ছিলেন সেটি জানেন না দাবি করে অধ্যাপক আলফেছানি বলেন, "না, যে শিক্ষকদের নাম দিয়েছে দাবিটা উপাচার্য মহোদয়ের হাতে দিয়েছে, এক্সাক্টলি আমি বলতে পারবো না যে ওইখানে কার কার স্বাক্ষর আছে।"

একইসঙ্গে, এই বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই উল্লেখ করে দুই প্রো-ভিসি ও তদন্ত কমিটির এই দুই সদস্যই জানান, এখনো তদন্ত কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি।

"কিন্তু এই কমিটি বা যারা এইটা ওভারসি করবে তাদের এখন পর্যন্ত সিন্ডিকেটের পরে কোন মিটিং হয়নি। এখনো এটা নিয়ে তারা বসেন নাই" বলেন অধ্যাপক সালাম।

উল্লেখ্য, ২৮শে জুলাই সিন্ডিকেট বৈঠকের পরদিনই আবার ১২৫ শিক্ষকের আরেকটি তালিকার কথা শোনা গেছে।

আগের ২৩১ শিক্ষকের তালিকা থেকে ১০৬ জনকে বাদ দিয়ে যে এই তালিকাটি করা হয়েছে, তালিকা দুইটি হাতে নিয়ে মেলালে সেটি খুবই স্পষ্ট হয়ে যায়।

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন নীল দলের এমন অনেক শিক্ষক আবার ১২৫ জনের তালিকাতে নেই।

এদিকে, ঢাবি শিক্ষকদের দুইটি তালিকার কথা উল্লেখ করলে অধ্যাপক আলফেছানি বলেন, "স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি বলা হয়, লিখিত একটি ডকুমেন্ট যদি থাকে, একবার বলা হচ্ছে ২৩১, আবার বলা হচ্ছে ১২৫। তাহলে সংখ্যা তো কমার কথা না বা বাড়ার কথা না, একটা ফিক্সড সংখ্যা থাকবে।"

"আমার মনে হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পত্রপত্রিকায় যে তালিকা গিয়েছে এই তালিকাটা কিভাবে গিয়েছে, কারা দিয়েছে আমি জানি না। বাট আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে একটা, সেই অভিযোগের ব্যাপারে আমরা সার্বিক বিষয়টা খতিয়ে দেখছি" বলেন ঢাবির প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক আলফেছানি।

যাচাই-বাছাই কমিটি কোন তালিকা ধরে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এমন প্রশ্নে কমিটির আরেক সদস্য এবং প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম জানান, মিটিং এ বসলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

"আমরা এখনো মিটিং এই বসিনি। মিটিং এ বসলে তারপর আমরা বলতে পারবো কোন তালিকা ধরে কী করবো" বলেন অধ্যাপক সালাম।

তবে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে বেশ কয়েকবার কল করলেও রিসিভ করেননি তিনি।

কার্জন হল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাদা দল ও জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক শিক্ষকদের দুই দলই জানেন না শিক্ষকদের তালিকা কারা করেছে

শিক্ষকদের দলগুলো কী বলছে?

এদিকে, বিএনপি সমর্থিত সাদা দল ও জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক শিক্ষকদের এই দুই দলই, শিক্ষকদের তালিকা কারা করেছে সেটি জানেন না বলে দাবি করেছেন।

জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং আরবি বিভাগের অধ্যাপক যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক দাবি করেন, তাদের সংগঠনটি শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করেনি।

বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক হক বলেন, "একটি শিক্ষক সংগঠন হিসেবে এই তালিকার সাথে আমরা সংযুক্ত নই। ইউটিএল, আমরা সেটার সাথে সম্পৃক্ত না বা উপাচার্যের কাছে যারা এই তালিকা জমা দিয়েছেন আমাদের গ্রুপে যারা আছেন তারা কেউ যাননি।"

তবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যদি "যে কোন ধরনের ব্যবস্থা যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে সেটি যেন ন্যায্যতার ভিত্তিতে হয় এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রচলিত নিয়ম-নীতি আছে সেগুলোকে যেন মেইনটেইন করা হয়" সে বিষয়ে ইউটিএল বিভিন্ন সময়ে উপাচার্যের কাছে দাবি জানিয়েছে বলে জানান তিনি।

ফ্যাসিস্টবিরোধী শিক্ষক ফোরামে কারা আছেন তাদের চেনেন না ও জানেন না বলে অধ্যাপক হক দাবি করেন।

অন্যদিকে, বিএনপি সমর্থিত সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান একইসঙ্গে যাচাই-বাছাই কমিটি ও সিন্ডিকেটেরও সদস্য।

এছাড়া, সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়কই হলেন প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম।

পহেলা অগাস্ট তাদের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষকদের পৃথক পৃথক যে তালিকা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে সেটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানিয়েছে সাদা দলের নেতারা।

এতে বলা হয়েছে, "আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সংখ্যক শিক্ষকের পৃথক পৃথক তালিকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে মর্মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের নাম জড়িয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।"

একইসঙ্গে, জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর যে সকল শিক্ষক, গোষ্ঠী ও সংগঠন অবস্থান গ্রহণ করেছিল তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবিও জানানো হয়েছে।

এদিকে, ২৩১ শিক্ষকের তালিকা ও সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটে নেওয়া সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে সেসময় সবচেয়ে সক্রিয় থাকা শিক্ষকদের আরেকটি সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

দোসরা অগাস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষকদের এই সংগঠন বলেছে, "ঢালাও তালিকা প্রণয়ন, অভিযোগ প্রমাণের আগেই তা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করে সামাজিক হেনস্থা কিংবা ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সম্পাদিত সকল নিয়োগের বিরুদ্ধে ঢালাও তদন্তের ঘোষণা- এসব উদ্যোগ 'উইচ-হান্টিং' সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।"

এই সংগঠনটি বলছে, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী শিক্ষকদের রাজনৈতিক মত পোষণ ও প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত, কেবল রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা সমর্থন কোনো অপরাধ নয়। ফলে 'জুলাইবিরোধী মনোভাব' নিজে থেকে কোনো আইনি অভিযোগ হতে পারে না।"

শিক্ষকদের জবাবদিহির প্রশ্নে এই সংগঠনটি কোনোভাবেই খাটো করে দেখে না এবং শিক্ষক হিসেবে নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও উল্লেখ করেছে তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, "আমরা দৃড়ভাবে প্রত্যাশা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিহিংসা নয় বরং আইন, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তকেই তার সকল সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখবে।"

তবে আওয়ামী লীগপন্থি নীল দলের কমিটির আহ্বায়ক জিনাত হুদাকে ফোন করলেও রিসিভ করেননি তিনি। দুই তালিকায় তার নামও রয়েছে।

একইসঙ্গে, নীল দলের কো-কনভেনর ও গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দে। দুই তালিকাতেই নাম রয়েছে এই শিক্ষকের।

বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দে বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন শিক্ষকই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। এখন আমরাও এমন কোন কিছু করিনি যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্টের পরিপন্থি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।"

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত বা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে কোনো তালিকা প্রণীত হলে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতা, নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতির আলোকে বিবেচনা করা। কোনো শিক্ষককে গুটিকয়েক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে হয়রানি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর” বলে মনে করেন তিনি।

এই অধ্যাপক দাবি করেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখা শিক্ষকদের প্রতি এমন আচরণ কতটা দায়িত্বশীল ও ন্যায়সংগত, তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে। শেষ পর্যন্ত এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়ভার কে বহন করবে, সেটিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিবেচনায় নিতে হবে।”

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সময়ের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সময়ের ছবি

তালিকায় নাম রয়েছে এমন শিক্ষকরা যা বলছেন

নীল দলের শিক্ষকদের ২৩১ এবং ১২৫ দুইটি তালিকাতেই নাম রয়েছে এমন কয়েকজন শিক্ষকের সাথে বিবিসি বাংলা কথা বলেছে। তাদেরই একজন ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান।

অধ্যাপক রহমান আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুই দফায় সাত বছরের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

চব্বিশের ১২ই অগাস্ট ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেন ঢাবির এই শিক্ষক।

গত দুই বছর যাবত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে তাকে বিরত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে প্রথমে গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি অধ্যাপক রহমানের কোন বক্তব্য না নিয়েই অভিযোগ গঠন করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে পরবর্তীতে তদন্ত কমিটিকে লিখিতভাবে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন অধ্যাপক রহমান।

অধ্যাপক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে তেসরা অগাস্ট গণভবনের এক বৈঠকে এবং বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধাচারণ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অধ্যাপক রহমান দাবি করেন, যে বক্তব্যের কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এমন কোন বক্তব্যই দেননি।

বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক রহমান বলেন, অভিযুক্ত এবং অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণ করে যে কোন শাস্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিতে পারে।

নিয়মবহির্ভূত আচরণ, শৃঙ্খলা পরিপন্থী বিষয় বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নৈতিক স্খলন হলে সেটি খতিয়ে দেখার এখতিয়ার প্রশাসনের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

"কিন্তু ঢালাওভাবে সেটি যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে এবং মতপ্রকাশের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার প্রথম যে ভাবনাটি মুক্ত চিন্তা, সেই মুক্ত চিন্তা বড় রকমের শঙ্কার মধ্যে পড়বে, এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই" বলেন অধ্যাপক মশিউর রহমান।

অধ্যাপক রহমান বলছেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থি বা জামায়াতে ইসলামী এমন দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রঙের নামে শিক্ষকদের দলের নামকরণ করা হয়নি। বরং শিক্ষকদের বিভিন্ন নির্বাচনকালীন সময়ে ভোট দেওয়ার সুবিধার জন্য সাদা, নীল, গোলাপী এরকম রঙের নামকরণে শিক্ষকদের দলের নামকরণ করা হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে অধ্যাপক মশিউর রহমান বলেন, নীল দল যারা করেন তারা সবাই আওয়ামী লীগ করেন এমন বিষয় নয়।

কিন্তু শিক্ষকদের এই তালিকা সাদা দল করেনি বলে যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে সিন্ডিকেটেই বিষয়টি সুরাহা হয়ে যেত।

অন্যদিকে, দুই তালিকাতেই নাম থাকা আরেকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক জানান, গণমাধ্যমেই শিক্ষকদের ২৩১ ও ১২৫ দুই তালিকার কথা জেনেছেন। কিন্তু শিক্ষক রাজনীতির সাথে জড়িত নন তিনি।

"আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না যে ১২ ঘণ্টার মধ্যে কিভাবে ২৩১ জনের তালিকা ১২৫ জনের তালিকায় পরিণত হলো, আমাদের কোনো ধারণা নেই" বলেন এই শিক্ষক।

তবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।

সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভাগের শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দেয়নি, এমনকি শিক্ষক হিসেবেও বিভাগীয় সকল ধরনের কার্যক্রমে রয়েছেন ঢাবির এই শিক্ষক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষক বলেন, "শিক্ষক হিসেবে আমার যা যা কার্যক্রম করার কথা সবই এখন পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে চলছে। আমি কোথাও কোন ধরনের বিধি-নিষেধের সম্মুখীন হইনি বা কোনো নোটিশ বা তদন্ত কমিটির ডাক এসব কিছুই পাইনি। ফলে তালিকায় নাম দেখে আমি খুবই অবাক হয়েছি।"

এই শিক্ষক বলছেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃষ্টি করতে হলে, জ্ঞান চর্চা করতে হলে বিপরীত প্রান্তের মতামত সম্পর্কে জানতে হবে, সেই মতামত প্রকাশ করতে দিতে হবে।"

"এভাবে যদি আপনি কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন কিংবা এভাবে উদাহরণ তৈরি করেন যে, ভিন্নমত পোষণ করার শাস্তি এতো ভয়ংকর, তাহলে এখানে আর কথা বলবে। কোন একটা জায়গায় যদি ডায়লগ বন্ধ সেখানে আসলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয় না, জ্ঞান চর্চা হয় না, সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় থাকার আর কোন অর্থবহতা থাকবে না" বলেন ঢাবির এই শিক্ষক।

আওয়ামী লীগের সময়ে ঢাবির সাবেক উপাচার্য ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, তালিকা ও কমিটি হওয়ার কথা শুনেছেন বলে জানান। তবে তিনি কোন কথা বলতে চাননি।