ওমান উপসাগরে আবারও জাহাজে মার্কিন হামলা, ছিলেন ২০ জন ভারতীয় নাবিক

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে ওমান উপসাগরে গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী একটি জাহাজ 'জলবীর' এর ওপরে তারা হামলা চালিয়েছে। এর আগে, বুধবার অন্য একটি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন হামলা হয়েছিল, যাতে মৃত্যু হয় তিন ভারতীয় নাবিকের। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহে তিনটি জাহাজের ওপরে হামলা চালালো মার্কিন বাহিনী।

বুধবারের হামলায় নিহত ওই ভারতীয় নাবিকের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানান কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল।

বৃহস্পতিবারের ঘটনা নিয়ে আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড, সেন্টকম জানিয়েছে যে ওই জাহাজটি ওমান উপসাগর দিয়ে ইরানের তেল বহন করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং জাহাজটি তাদের গড়ে তোলা অবরোধ ভাঙে।

বৃহস্পতিবার, ১১ই জুন, দিনের আরও আগে ভারত দাবি করেছিল যে ওমান উপকূলে শিনাস বন্দরের কাছে ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী তৃতীয় একটি জাহাজের ওপরে হামলা চালানো হয়। জাহাজটিতে ২০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন বলেও জানিয়েছিলো দিল্লি।

দিল্লিতে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুকেশ মঙ্গল জানান যে 'জলবীর' নামের জাহাজে হামলা হয়েছে, যেটিতে ২০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন।

তিনি দাবি করেছিলেন যে গিনি- বিসাউয়ের পতাকাবাহী জাহাজ 'এমটি জলবীর' ওমানের শিনাস বন্দরের কাছে একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় পড়েছে। ওই জাহাজে ২০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন এবং তারা সকলেই সুস্থ আছেন, কারো আহত হওয়ার খবর নেই।

নাবিকদের শিনাস বন্দরে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন অতিরিক্ত সচিব। সংবাদ সম্মেলন চলার সময় পর্যন্ত ছয়জনকে উদ্ধার করা বাকি ছিল বলেও জানান তিনি।

ওমান উপসাগরে এ সপ্তাহে তিনটি জাহাজে হামলা

আমেরিকার 'সেন্টকম'-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওমান উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর নিশানায় আসা এটি তৃতীয় জাহাজ ছিল। এর আগে 'মারিওয়েক্স' এবং 'সেট্টেবেলো' নামের দুটি জাহাজে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপরে ১৩ই এপ্রিল থেকে অবরোধ গড়ে তোলে মার্কিন বাহিনী। তখন থেকেই ইরানের দিকে আসা অথবা ইরান থেকে রওনা হওয়া জাহাজগুলোকে হয় আটকে দেওয়া হচ্ছে, অথবা ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

মার্কিন 'সেন্টকম' দাবি করেছে যে এখনো পর্যন্ত ১৩৪টি জাহাজকে তাদের বাহিনী ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা এও বলেছে যে আটটি জাহাজ তাদের নির্দেশ অমান্য করায় সেগুলোর ওপরে হামলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে অবরোধের মধ্যেই এমন ৪২টি জাহাজকে তারা যেতে দিয়েছে, যেগুলো ত্রাণ ও চিকিৎসা সামগ্রী বহন করছিল।

ইরান অবশ্য দাবি করেছে যে জাহাজ চলাচলের ওই পথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

২১ জন ভারতীয় নাবিক উদ্ধার, তিন জনের মৃত্যু

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী ওমানের সোহার বন্দরের ২০ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৩৭ কিলোমিটার) উত্তর-পূর্বে সেই সময় সফররত 'সেট্টেবেলো'র ইঞ্জিন রুমে আগুন লাগে। ওই জাহাজে তেলজাত পণ্য ছিল বলেও ওই সংস্থা জানিয়েছে।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ভ্যানগার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ওমানের নৌবাহিনীর কাছে ওই জাহাজ বিপদ সংকেত পাঠিয়ে সাহায্য চায়। ওমান নৌবাহিনী তাতে সাড়া দিয়ে উদ্ধারের কাজ শুরু করে।

২১ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তিনজন নিখোঁজ ছিলেন।

পরে জানা যায়, মার্কিন নৌবাহিনীর তরফে নিশানা করা হয়েছিল ওই জাহাজকে। মার্কিন নৌবাহিনী দাবি করে, তাদের নির্দেশ অমান্য করেছিল ওই জাহাজটি।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা ওয়েবসাইট লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওমানের দুকম বন্দরের কাছে নোঙর করা অন্যান্য জাহাজের মধ্যে সেট্টেবেলোও ছিল। শুধু তাই নয়, তার উপর মার্কিন নৌবাহিনীর নজরদারি ছিল বলেও জানা গিয়েছে।

এর আগে, মার্চ ও এপ্রিলে দু'বার চীনে গিয়েছে ওই জাহাজ। এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত লিয়ানইউঙ্গাং বন্দরে কার্গো আনলোড করে এবং ১২ই মে সিঙ্গাপুর থেকে সফর শুরু করে।

এদিকে, ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকেই সংঘাতের আবহে রয়েছে হরমুজ প্রণালি যা বিশ্বের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় থেকেই এই অঞ্চলে একাধিক ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ 'অমান্য' করে সেট্টেবেলো

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের দাবি, ওমান উপসাগর দিয়ে সফররত পালাউয়ের পতাকাবাহী 'সেট্টেবেলো' ইরানের তেল বহন করছিল। জাহাজের উপর সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করে হামলা চালানো হয়েছে কারণ, তাদের দাবি 'সেট্টেবেলো' জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর নির্দেশ মানেনি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-এর দাবি, পালাউয়ের পতাকাবাহী ওই জাহাজটি ইরান থেকে তেল বহন করার সময় অবরোধ লঙ্ঘন করেছে।

পালাউ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত একটা দ্বীপরাষ্ট্র।

সেন্টকমের তরফে একটা বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, "মার্কিন বাহিনীর ক্রমাগত সতর্কবার্তা সত্ত্বেও জাহাজে উপস্থিত নাবিকরা তা উপেক্ষা করেন।"

"এরপর এক মার্কিন বিমান ওই জাহাজের ইঞ্জিনকে লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালানো হয়।"

এর ফলে আগুন লেগে যায় ওই জাহাজে। মার্কিন সেনাবাহিনী এই অভিযানের একটা ভিডিও প্রকাশ করেছে ।

পালাউ-র পতাকাবাহী ওই জাহাজে ২৪জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন বলে খবর। এর মধ্যে ২১জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তিনজন নিখোঁজ ছিলেন। পরে বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বৃহস্পতিবার জানান, নিখোঁজ ওই তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বুধবারের হামলায় কড়া প্রতিক্রিয়া ভারতের

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাহাজটিতে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে দিল্লি।

তবে ভারতের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করা হলেও বুধবারের ওই ঘটনার পরেই দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে ডেকে পাঠায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে এটা নতুন নয়, এর আগেও হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় নাবিকরা রয়েছেন, এমন বাণিজ্যিক জাহাজকে হামলার শিকার হতে হয়েছে।

সোমবার ওমান উপকূলে পালাউ-এর পতাকাবাহী আরেকটা জাহাজের উপরে হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই জাহাজে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের উদ্ধার করা গেলেও বুধবারের ঘটনায় তা সম্ভব হয়নি।

মে মাসেও ওমান উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী একাধিক জাহাজের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ভারত।

তবে, বুধবারের ঘটনায় পালাউ-এর পতাকাবাহী ওই জাহাজে থাকা নাবিকদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এই অঞ্চলে জাহাজের নিরাপত্তা

এই মুহূর্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নতুনভাবে হামলা চালিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইরান শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে "অনেক বেশি সময়" নিচ্ছে এবং "যুক্তরাষ্ট্রকে বোকা বানাচ্ছে"।

এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবারের 'জলবীর' জাহাজটির ওপরে হামলার ঘটনা নিয়ে এই সপ্তাহেই তিনটি জাহাজে হামলা হলো।

কিন্তু সেট্টাবেলো জাহাজের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু বিষয়টাকে আরো গুরুতর করে তুলেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির 'জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স'-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ গীতাঞ্জলি সিন্‌হা রায় মনে করেন বুধবারের ঘটনায় ভারতের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম না থাকলেও সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ বেশ অর্থবহ।

বিবিসি বাংলার রূপসা সেনগুপ্তকে তিনি বলেছেন, "ভারতীয় নাবিকরা রয়েছেন এমন জাহাজের উপর হামলা নতুন নয়। ভারত প্রথম থেকেই বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে দেখেছে এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।"

"তবে সাম্প্রতিকতম ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে তলব করার মতো পদক্ষেপ কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষভাবে অর্থবহ। কারণ ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে, এ জাতীয় ঘটনা আর মেনে নেওয়া হবে না এবং সেই কারণেই বিবৃতির পাশাপাশি দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে তলব করা হয়েছে।"

তার মতে, সংঘাতের আবহে থাকা অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তার উপর এই সেট্টাবেলোতে আক্রমণ আরো উদ্বেগ বাড়াবে।