সমালোচনা উপেক্ষা করে জার্মান চ্যান্সেলারের বিতর্কিত চীন সফর

বেইজিংএ জার্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শোলৎজ এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, জার্মান চ্যান্সেলার বলেছেন, সরাসরি সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি স্পষ্ট বলেছেন বিতর্কিত বিষয়গুলো তিনি অগ্রাহ্য করবেন না
    • Author, জেনি হিল
    • Role, বিবিসি বার্লিন সংবাদদাতা
  • Published

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জার্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শোলৎজের সঙ্গে বৈঠকের পর জার্মানির সঙ্গে  সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।

বেইজিংয়ে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের পর মি. শি বলেছেন “পরিবর্তিত এবং অস্থির এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে” দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

মি. শোলৎজ দুই দেশের মধ্যে “সমতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও প্রতিদানের সম্পর্ক গড়ে তোলার” কথা বলেন।

মি. শোলৎজ চীনকে আরও অনুরোধ করেন ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের ওপর রাশিয়ার আক্রমণ বন্ধ করতে তিনি যেন মস্কোর ওপর তার প্রভাব খাটান।

তিন বছর পর জি-সেভেন গোষ্ঠির তিনিই প্রথম নেতা যিনি বেইজিং সফরে গেলেন।

কিন্তু মি. শি তৃতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় নিজেকে বহাল করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই মি. শোলৎজের বেইজিং সফরের সিদ্ধান্ত নিয়ে জার্মানির ভেতর এবং ইউরোপের অন্যত্র বিতর্ক আর সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বার্লিনের সরকারের মধ্যে এই সফর নিয়ে নজিরবিহীন ও তিক্ত বিতণ্ডা চলছে।

হামবুর্গ বন্দরে চীনা লগ্নি নিয়ে উদ্বেগ

জার্মানির হামবুর্গ বন্দর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জার্মানির হামবুর্গ বন্দরে একটি শিপিং টার্মিনাল চীনের কাছে বিক্রি করার চুক্তি নিয়ে জার্মান সরকারে বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে।

খবর প্রকাশ হয়েছে যে, চীনের একটি কোম্পানি হামবুর্গ বন্দরের একটি শিপিং টার্মিনালে অর্থ লগ্নি করতে চাইছে। সরকারের ছয়জন মন্ত্রী এই খবরে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, এই চুক্তি হলে জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চীনের বড় ধরনের প্রভাব তৈরি হবে। জার্মানির নিরাপত্তা বিভাগও এ বিষয়ে সতর্ক হবার আহ্বান জানিয়েছে।  

কিন্তু জার্মান চ্যান্সেলার এই চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে কার্যত অনড়। বলা হচ্ছে তিনি চুক্তির একটা কাঠামো দিয়েছেন যাতে এই বিনিয়োগের অঙ্ক এবং বন্দরের যে অংশ চীনকে দেয়া হবে তার আকার কমিয়ে ২৪.৯% এ নামিয়ে এনেছেন, যাতে চীনের প্রভাব কম থাকে।  

কিন্তু কেন এই চুক্তির ব্যাপারে মি. শোলৎজ এতটা বদ্ধপরিকর সে ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়।

মি. শোলৎজ একসময় হামবুর্গের মেয়র হিসাবে কাজ করেছেন এবং নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। তার যুক্তি হল এই চুক্তির ফলে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিনিয়োগ আসবে।

তবে অনেক বিশ্লেষকের সন্দেহ এই চুক্তিটি সম্পাদনের ব্যাপারে মি. শোলৎজ যেভাবে চাপ দিয়েছেন তার পেছনে একটা কারণ হল তিনি শি জিনপিংএর জন্য একটা ‘উপহার’ ছাড়া খালি হাতে বেইজিংএ যেতে চাননি।

আর সে কারণেই অনেকে বিস্ময় এবং উষ্মা প্রকাশ করছেন।    

আরও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলার তার সঙ্গে করে জার্মানির বড় বড় ব্যবসায়ীদের চীনে নিয়ে যাবার কারণে।

‘বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন’

শি জিনপিং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসে মি. শি আরও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা সুসংহত করার পর পশ্চিমে উদ্বেগ বেড়েছে

তার পূর্বসুরী আঙ্গেলা মেরকেল কিন্তু একই ধারাতেই কাজ করতেন। তার নীতি ছিল “বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন” অর্জন। তিনি বিশ্বাস করতেন চীন এবং রাশিয়ার মত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারলে তা রাজনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত ও উন্নত করবে।

তবে জার্মান চ্যান্সেলার এমন একটা সময় চীন সফরে গেলেন যখন কিছুদিন আগেই চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট শি তার ক্ষমতা আরও সুসংহত করেছেন এবং তাইওয়ানকে ঘিরে তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

মি. শোলৎজের জোট সরকারের শরিক দল গ্রিন পার্টির চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান রয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগেই গ্রিন পার্টির এমপি জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যানালিনা বেয়ারবক বেশ কঠোর ভাষায় মি. শোলৎজকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে চীনের ব্যাপারে জার্মানির কৌশলের পুনর্বিন্যাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন।    

দলের পক্ষ থেকে মি. শোলৎজকে আরও মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে যে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতার বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণের কথা।

কিন্তু ওলাফ শোলৎজ এসব জটিল সমীকরণ সম্পর্কে অবহিত থাকলেও চীনের সঙ্গে তার দেশের গভীর সম্পর্কের দিকটাও তাকে ভাবতে হচ্ছে।

জার্মান গাড়ি তৈরি প্রতিষ্ঠান ডেমলার চীনে তাদের লোকবল বাড়াচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জার্মান গাড়ি তৈরি প্রতিষ্ঠান ডেমলার চীনে তাদের লোকবল বাড়াচ্ছে

চীনের ওপর নির্ভরতা

জার্মানিতে দশ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান চীনের সাথে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। যেমন একটা উদাহরণ হল ডেমলার গাড়ি। এই গাড়ি কোম্পানি তাদের উৎপাদিত গাড়ির এক তৃতীয়াংশই বিক্রি করে চীনে।

এ বছরের প্রথম ছয় মাসে জার্মান ব্যবসায়ীরা আগের যে কোন সময়ের তুলনায় চীনে বিভিন্ন খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে।  

মি. শোলৎজ বেইজিংএ ১২ ঘণ্টার কম সময় কাটিয়েছেন। সফরের আগে তিনি বলেছিলেন এই সময়ের মধ্যে তিনি দেখতে চেয়েছেন চীনের সঙ্গে কতটা সহযোগিতা সম্ভব। কারণ তিনি মনে করেন “বিশ্বের চীনকে প্রয়োজন”।

“চীন যদি বদলায়, তাহলে চীনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও বদল ঘটা উচিত,” তিনি বলেন।