কলকাতা বিমানবন্দরের ভিতরে ১৩৬ বছর পুরনো মসজিদ সরানো নিয়ে বিতর্ক

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে অবস্থিত একটি পুরনো মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদটি সরানো হবে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, ওই মসজিদে যাওয়ার রাস্তা খারাপ হওয়ার জন্য সেটি সারানো প্রয়োজন। সেই সারাইয়ের জন্যই বন্ধ করা হয়েছে রাস্তা।

প্রথমে সোমবার ১৩ই জুলাই পর্যন্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিমানবন্দরের ভিতরে এই মসজিদে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এই মসজিদের উপস্থিতি নিয়ে ব্যুরো অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন বা বিসিএএস-এর আপত্তি রয়েছে বলে সম্প্রতি জানা গিয়েছিল।

সরকারি সংস্থাটির এক সিনিয়র অফিসার জানিয়েছেন, "সারাই সম্পূর্ণ হলেও সুরক্ষাজনিত কারণে এই মসজিদটি বন্ধই রাখা হচ্ছে।"

বিমানবন্দরের ভিতরে এই মসজিদের অবস্থান নিয়ে আগে একাধিক বার সরব হয়েছিলেন বিজেপি নেতা মন্ত্রীরা।

তাদের দাবি ছিল, এই মসজিদটি এখানে থাকার কারণে বিমান ওঠা নামায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন এখানে ৫০ থেকে ৬০ জন নামাজ পড়তে আসেন ফলে বিমান বন্দরের মতো উচ্চ সুরক্ষা বলয়ে থাকা এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মেচেদায় একটি সভা করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা কাউকেই ধর্ম পালনে বাঁধা দিচ্ছি না। কিন্তু কলকাতা বিমানবন্দরের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাই এভাবে মসজিদ খুলে রাখা যায়না।"

তবে বিতর্ক দানা বেঁধেছে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের কথায়। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, "সরকারি জমিতে কোনও মসজিদ হবেনা।"

এই মন্তব্যের পরে অনেকেই উল্লেখ করেছেন যে এই মসজিদটির ইতিহাস সম্প্রসারিত কলকাতা বিমানবন্দরের থেকেও পুরোনো।

বিমানবন্দরের ভিতর মসজিদের ইতিহাস

কলকাতা বিমানবন্দরের ভিতরে যে মসজিদটি অবস্থিত সেটির নাম বাঁকরা মসজিদ।

কেউ কেউ এটিকে গৌরীপুর জামা মসজিদ নামেও ডাকেন। সাধরণত প্রতি দিন পাঁচ বার নামাজ পড়া হয় এখানে। নিরাপত্তারক্ষীদের আধার কার্ড দেখিয়ে ঢোকেন নামাজ পড়তে আসা মানুষরা।

সাধরণত প্রতি নামাজে ৫০ থেকে ৬০ জনের জমায়েত হয় বলে জানা যায়।

১৯৫০ সালে কলকাতা এয়ারপোর্টের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সময়ে এই মসজিদের আশেপাশে যে গ্রামাঞ্চল ছিল, সেখানকার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে মসজিদটি সরানো হয় নি।

জানা যায়, এই মসজিদটি ১৩৬ বছরের পুরোনো।

এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি জন্ম থেকেই এই মসজিদে আসছি এবং নামাজ পড়ছি। বাপ-দাদাদের থেকে শুনেছি যে এই মসজিদে ১৮৭০ সাল থেকেই নামাজ পড়া হতো। গত শনিবার আমাদের নামাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।"

তিনি জানালেন, মাঝেমধ্যে আবহাওয়া জনিত কারণে মসজিদ বন্ধ থাকলেও সেটা এক ঘণ্টা বা আধ ঘণ্টার মধ্যে খুলে যেত।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই মসজিদে যাওয়ার জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা ছিল। নামাজ পড়তে আসা মানুষরা সেই বাসেই বিমানবন্দরের ট্যাক্সিওয়ে ধরে যেতেন। নামাজ পড়া হয়ে গেলে তারা এই বাসেই ফিরে আসতেন। কারা ঢুকছেন ও বের হচ্ছেন নজর রাখতেন নিরাপত্তারক্ষীরা।

মসজিদ সরানোর দাবি

তবে এই মসজিদটি সরানোর দাবি নতুন নয়। বিমানবন্দরের এক প্রাক্তন অধিকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ৯০-এর দশক থেকেই মসজিদটি সরানো নিয়ে কথা চলছে।

তিনি জানান, মসজিদটির জন্য বিমানবন্দরে ইন্স্ট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম বসাতে সমস্যা হচ্ছিল।

২০২৫ সালে ডিসেম্বর মাসে ভারতের সংসদের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভায় সংসদ সদস্য শমীক ভট্টাচার্য এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিমান চলাচল মন্ত্রীকে তিনি প্রশ্ন করেন যে এই মসজিদটি সরানোর বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে কিনা। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে মসজিদটি থাকার কারণে রানওয়েটি পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সেই প্রশ্নের উত্তরে বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী বলেন, কলকাতা বিমানবন্দরে একটি প্রাইমারি ও একটি সেকেন্ডারি রানওয়ে আছে। প্রাইমারি রানওয়েটিই মূলত ব্যবহৃত হয়, কিন্তু কোনও কারণে সেটি বন্ধ থাকলে সেকেন্ডারি রানওয়েটি ব্যবহার করা হয়। এই মুহূর্তে মসজিদটি রানওয়ে থেকে ৮৮ মিটার দূরে আছে।

এই উত্তরে অবশ্য শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন তিনি সন্তুষ্ট নন এবং সরানোর উদ্যোগ নিয়ে কোনও জবাব দেননি মন্ত্রী।

তবে সম্প্রতি ভারতের ব্যুরো অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়াকে এই মসজিদটির উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানা গিয়েছে।

এর পরেই মসজিদটি সরাতে উদ্যোগী হয়েছে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া।

মসজিদ সরানো নিয়ে বিরোধিতা

এই মসজিদটি অন্যত্র সরানোর বিরোধিতা করেছিলেন সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের গ্রন্থাগার বিষয়ক মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী।

সম্প্রতি তিনি মিডিয়াকে জানিয়েছেন, "এমন কোনও উদাহরণ নেই যেখানে শৃঙ্খলা ভেঙে এয়ারপোর্টের ভিতর কোনও কাজ করেছেন নামাজ পড়তে আসা মানুষ। এয়ারপোর্টের ডিরেক্টরকে ও এয়ারপোর্ট থানার ওসিকে আমি তিন বার ফোন করলেও তারা আমার ফোন ধরেননি।"

"এটা গায়ের জোরে হচ্ছে, এটা ঠিক নয়," বলেন তিনি।

তিনি বলেন, "আপনি ইসলামিক সংগঠনগুলিকে জানান যে কী সমস্যা হচ্ছে। নিদেনপক্ষে আমাকে জানান। কিন্তু সেসব কিছুই বলা হয়নি।"

এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা বলেন, "বিরোধীদের কাজই বিরোধ করা। মসজিদটি সরানো হবে এবং স্থানীয় মুসলমানদেরও এটা বুঝতে হবে যে এই কাজ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।"

বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষের মন্তব্য, "কোনও ধর্মের বিরোধ আমরা করছি না। যাত্রী সুরক্ষা হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সব যাত্রীরই। মসজিদের জায়গায় অন্য কোনও ধর্মস্থান হলেও সরানো হতো।"

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী এমপি ও রাজ্যসভার সদস্য বাবুল সুপ্রিয় বলেন, "এয়ারপোর্টের ভিতরে মন্দির, মসজিদ, চার্চ যাই অসুবিধা সৃষ্টি করুক না কেন, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে একমাত্র এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া।"