ভারতে ইনস্টাগ্রামে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার জগতের উন্মোচন – বিবিসির অনুসন্ধান

মেটা

ছবির উৎস, Reuters

    • Author, দিব্যা আরিয়া
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

সতর্কীকরণ: এই লেখাটিতে নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পয়সা দিয়ে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে - বিবিসি 'আই'-এর এক তদন্তে এই তথ্য জানা গেছে।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দেখা এই বিজ্ঞাপনগুলিতে 'ধর্ষণ ভিডিও' এবং 'শিশুদের ভিডিও'-এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়। এই বিজ্ঞাপনগুলি ইউজারদের টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপের বিভিন্ন চ্যানেলে পৌঁছে দেয়, যেখানে তারা এই ধরনের সামগ্রী মাত্র ৯৯ টাকায় কিনতে পারেন।

ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন তখনই চালানো হয় যখন সেটি প্রাথমিকভাবে অ্যাপের মডারেশন প্রযুক্তির দ্বারা অনুমোদিত হয়।

যখন বিবিসি এই ধরনের একটি বিজ্ঞাপন ইনস্টাগ্রামের কাছে রিপোর্ট করে, সামাজিক মাধ্যম সংস্থাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার জবাব দেয়। তারা জানায়, পোস্টটি তাদের 'কমিউনিটি গাইডলাইন্স' অর্থাৎ সামাজিক নির্দেশিকা লঙ্ঘন করছে না।

পরে যখন বিবিসি ইনস্টাগ্রামের পেরেন্ট কোম্পানি 'মেটা'-র কাছে মন্তব্য চায়, তখন মেটা জানায়, তারা এই ধরনের একাধিক বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে। সেগুলির সাথে যুক্ত একাউন্টগুলিও সাস্পেন্ড করে দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানায়।

মেটার তরফে আরো জানানো হয়, বিবিসির এই তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে তারা আরো কিছু বিজ্ঞাপন সরিয়ে দিয়েছে, আরো কিছু অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করেছে এবং কোম্পানির বিধি লঙ্ঘন করা অন্যান্য কন্টেন্টের একাধিক ইউআরএল ব্লক করে দিয়েছে।

টেলিগ্রাম জানায়, তারা এই বছর, শিশু যৌন নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত ২ লক্ষ ৭৪ হাজারের বেশি গ্রুপ এবং চ্যানেল সরিয়ে দিয়েছে।

বিবিসি লক্ষ্য করেছিল, একজন ইউজার যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বিষয়বস্তুর সন্ধান না করলেও ইনস্টাগ্রামে এই ধরনের কন্টেন্ট পুশ করা হচ্ছে। এটি লক্ষ্য করার পর, বিবিসি ইনস্টাগ্রামে ছদ্মনামে একটি অ্যাকাউন্ট খোলে।

এমনও ভিডিও দেখা গেছে, যেখানে নারীরা অঙ্গ প্রদর্শনকারী পোশাক পরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তার মাধ্যমে খাদ্য, আবহাওয়া এবং ভারতে দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে পোস্ট করছেন।

ভারতে তৈরি করা বিবিসির এই ছদ্মনামের নতুন অ্যাকাউন্টটি, এই প্ল্যাটফর্মে যৌন বিষয়বস্তু তদন্ত করার উদ্দেশ্যে মোট দশজন এমন নারী এবং অনুরূপ মানুষকে ফলো করা শুরু করেছিল।

এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে, ইনস্টাগ্রাম তার ফিডে এমন বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করলো, যেখানে নারীরা ভিডিও কল করার প্রস্তাব দিচ্ছে এবং বিবস্ত্র দম্পতিদের যৌনমিলন দেখানো হচ্ছে।

কিছুদিন পর, ইনস্টাগ্রাম যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে শিশুদের বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করল, টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিংক সহ।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর
ছবির ক্যাপশান, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইনস্টাগ্রাম "একটি অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়ে অর্থ উপার্জন করছে"
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মোট প্রায় ৩০টি ইউনিক বিজ্ঞাপন উঠে এসেছিল যেখানে শিশু যৌন নির্যাতনের প্রচার করা হচ্ছে, যদিও সেগুলির মধ্যে কয়েকটি একাধিক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছিল।

ছদ্মনামের একাউন্টটিকে প্রায় ২০টি এমন বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল যাতে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি ছিল।

শিশু যৌন নির্যাতন আছে, এমন বিষয়বস্তু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি বিতরণ করা ভারতবর্ষে ফৌজদারি অপরাধ। মেটার নীতিতে বলা আছে, বিজ্ঞাপনে এমন কন্টেন্ট দেখানো যাবে না যাতে প্রাপ্তবয়স্কদের নগ্নতা আছে, বা যৌন অঙ্গ দেখা যাচ্ছে, বা শিশুদের যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে বা বিপদের মুখের ফেলা হচ্ছে। বিবিসি এরকম সবকটি বিজ্ঞাপন এবং টেলিগ্রাম চ্যানেল ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেছে।

একটি বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছিলো, একটি ছেলে এবং মেয়ে— যাদের দুজনকেই দেখে মনে হয় তাদের বয়েস ১২ বছর— একে অপরের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত।

আরেকটিতে দেখা গিয়েছিলো একজন পুরুষ, তার হাত একটি মেয়ের শরীর ঘিরে ছিল। টেক্সটে লেখা ছিল, লোকটার বয়েস ৫২ এবং মেয়েটির বয়েস ১২। লেখা ছিল, "আরো দেখতে ক্লিক করুন," যেটি নিয়ে যাচ্ছিলো টেলিগ্রামের একটি লিংকে।

বিবিসি ইনস্টাগ্রামের কাছে এমন একটি বিজ্ঞাপন রিপোর্ট করেছে, যেখানে দেখানো হচ্ছিলো কান্নায় ভেঙে পড়া একটি খুব কমবয়সি মেয়েকে। বিজ্ঞাপনের টেক্সটে ইঙ্গিত করা হচ্ছিল, তাকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে।

২৪ ঘণ্টা পর ইনস্টাগ্রাম উত্তর দেয়। তারা জানায়, তারা সেই বিজ্ঞাপনটি সরায়নি। কারণ, "আমাদের রিভিউ টিম দেখেছে, বিজ্ঞাপনটি আমাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডসের পরিপন্থি নয়।"

মেটা পরে বিবিসিকে বলেছে, "কোনো সিস্টেম নিখুঁত নয়, এবং আমাদের রিভিউ প্রক্রিয়াটি প্রত্যেকটি নীতি লঙ্ঘন শনাক্ত নাও করতে পারে।"

"বিজ্ঞাপন লাইভ হওয়ার পর আমরা সেগুলির উপর সক্রিয় ডিটেকশন প্রযুক্তি চালিয়ে যাচ্ছি। যে কেউ আমাদের কাছে এমন বিজ্ঞাপন রিপোর্ট করতে পারে যা তারা মনে করেন আমাদের নিয়ম ভঙ্গ করছে," মেটা বলেছে।

তারা আরো জানায়, তারা যখন কোনো শিশুর নির্যাতন সম্পর্কে অবগত হন, তারা ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন বা এনসিএমইসি-র কাছে রিপোর্ট করেন। এনসিএমইসি শিশুদের অনলাইন যৌন শোষণের একটি কেন্দ্রীভূত বিশ্বব্যাপী রিপোর্টিং ব্যবস্থা।

শিশু যৌন নির্যাতনের ভিডিও বিক্রি করে থাকে, আমরা টেলিগ্রামের কাছে এমন দুটি চ্যানেলও রিপোর্ট করি।

তাদের মধ্যে একটি চ্যানেল সরিয়ে দেওয়া হয় এবং একটি বার্তা দেওয়া হয়, "এই গ্রুপটি দেখানো যাবে না কারণ এটি টেলিগ্রামের পরিচালনার শর্তাবলি (টার্মস অব সার্ভিস) লঙ্ঘন করেছে।" কিন্তু অন্য চ্যানেলটি বিক্রির জন্য নতুন ভিডিও পোস্ট করে যাচ্ছিলো।

সমালোচকরা আগে এই প্লাটফর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল যে তারা অপরাধমূলক কন্টেন্টের বিতরণ থামানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

দুবাইভিত্তিক সংস্থা টেলিগ্রাম এনসিএমইসি বা ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন কোনোটারই সদস্য না। এই ধরনের মেটিরিয়াল খুঁজে বের করে রিপোর্ট করা এবং সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সংস্থাটিও বেশিরভাগ অনলাইন প্লাটফর্মের সঙ্গে কাজ করে।

টেলিগ্রাম বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা 'অটোমেটেড' এবং 'মানবিক' মডারেশন দুইই ব্যবহার করে শিশু যৌন নির্যাতনের মেটিরিয়াল (সিএএসএম) ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। সুতরাং তারা বলছে, "আমরা আমাদের প্লাটফর্ম থেকে সিএসএমএ-র মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কার্যত নির্মূল করেছি।"

বিজ্ঞাপন মেটার উপার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

জানুয়ারি মাসে মেটা রিপোর্ট করে, ২০২৫ সালে সম্পন্ন হওয়া অর্থবছরে তাদের ২০০ বিলিয়ন ডলার আয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ বিজ্ঞাপন থেকে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইনস্টাগ্রামের আয়ের ৯০ শতাংশের বেশি আসে বিজ্ঞাপন থেকে।

যদিও সাধারণ পোস্টগুলি প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত মেটার প্রযুক্তি সেগুলি যাচাই করে না, মেটা বলছে, তাদের প্লাটফর্মগুলিতে অনুমোদিত হওয়ার আগেই প্রতিটি বিজ্ঞাপন রিভিউ করা হয়।

মেটার পর্যালোচনা ব্যবস্থা মূলত অটোমেটেড প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল এবং তা ছবি, ভিডিও, টেক্সট ও অডিও'র পাশাপাশি বিজ্ঞাপনটি কাদের লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে এবং এর লিংকগুলো ব্যবহারকারীদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা যাচাই করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

এরপর এই সফ্‌টওয়্যারটি বিজ্ঞাপনগুলো প্রত্যাখ্যান বা অনুমোদন করে। অনিশ্চিত থাকলে কর্মীদের দিয়ে পর্যালোচনার জন্য বিষয়টি উচ্চতর পর্যায়ে পাঠিয়ে দেয়।

মার্চ মাসে মেটা ঘোষণা করে, তারা তৃতীয় পক্ষের মানব মডারেটরদের উপর নির্ভরতা কমাচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই-এর) ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তারা আরও জানায়, "বিশেষজ্ঞরা আমাদের এআই সিস্টেমগুলোর ডিজাইন, প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান এবং মূল্যায়ন করবেন"।

বিবিসির দেখা বিজ্ঞাপনগুলির কথা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুরকে জানানো হয়। তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ইনস্টাগ্রাম "একটি অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়ে অর্থ উপার্জন করছে"।

তিনি বলেন, "এটি এতটাই গুরুতর একটি বিষয় যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নিতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট যে-কোনো সমাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিতে পারে।"

বিচারপতি লোকুর আরও বলেন, ইউজারদের আপলোড করা কন্টেন্টের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলোকে দায়বদ্ধ হওয়া থেকে ভারতের আইন সুরক্ষা দিলেও, "প্ল্যাটফর্মটি তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না, কোনোভাবেই পারে না"।

ব্রায়ান বোল্যান্ড, যিনি একসময় ফেসবুকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতেন
ছবির ক্যাপশান, ব্রায়ান বোল্যান্ড, যিনি একসময় ফেসবুকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতেন, বলেছেন, ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে ইউজারদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তাদের সামনে "আরও এক্সট্রিম ও প্রলুব্ধকর" বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়

ফেসবুক-এর (২০২১ সালে নাম পরিবর্তনের আগে 'মেটা' যে নামে পরিচিত ছিল) একজন প্রাক্তন ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিবিসির তদন্তে উঠে আসা তথ্যগুলি তাকে "আতঙ্কিত করেছে, তবে তিনি অবাক হননি"।

ব্রায়ান বোল্যান্ড ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটিতে কাজ করেছেন এবং এর বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিং ব্যাবসা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি জানান, তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন কারণ তার বিশ্বাস ছিল, "কোম্পানিটি ইউজারদের কোথাও গুরুত্ব দিত না"।

তিনি বলেন, ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে ইউজারদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তাদের সামনে "আরও এক্সট্রিম ও প্রলুব্ধকর" বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়।

"বিষয়টি এমন নয় যে অ্যালগরিদমটি মানুষকে পেডোফাইল বানানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। কিন্তু যেহেতু তারা এটিকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করছে না, এবং এটি কেবলই আয় ‌ও ক্লিক বাড়ানোতেই ব্যস্ত, তাই এই সিস্টেমগুলির বিষয়ে যদি কঠোর ও সক্রিয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।"

বোল্যান্ড জানান, ২০০৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি একটি প্রজেক্টের নেতৃত্বে ছিলেন যার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব বিজ্ঞাপন সরানো যা ইউজারদের প্রতারণা করছে। তিনি জানান "সেই সময়ে, ইউজারদের নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতার স্বার্থে,আমাকে কোম্পানির আয়ের একটি বিশাল অংশ ছেঁটে ফেলা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।"

"আমার মনে হয়, সব থেকে দুঃখজনক ও মর্মান্তিক বিষয় এটাই যে, সময়ের সাথে সাথে, আয় এবং ইউজারদের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্যটাই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

তিনি জানান, ২০২৫ সালে তিনি তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেছেন। তিনি আরও বলেন, "যদি বিপুলসংখ্যক মানুষ বলতে শুরু করে 'আমি আর এতে নেই, আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়, ফরগেট ইট' তখনই কেবল কোম্পানি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবে।"

বিবিসি-র কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে মেটা জানিয়েছে, "শিশুদের শোষণ একটি জঘন্য অপরাধ এবং মেটা তাদের অ্যাপগুলিতে এর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছে।"

মেটার বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছিল, মেটা জেনে বুঝে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুরা আছে, এমন বিজ্ঞাপন আগ্রহী ইউজারদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, এটা 'সম্পূর্ণ ভুল'।

কোম্পানিটি নিরাপত্তার থেকে বেশি আয়ের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, ২০২৫ সালে এটি 'সম্ভাব্য সন্দেহজনক আচরণের যথেষ্ট লক্ষণ' পাওয়ার কারণে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ৪০ লক্ষেরও বেশি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করেছে।

মেটা জানায়, "পাকা অপরাধীরা ডিটেকশন এড়িয়ে গেলেও আমাদের বিশেষজ্ঞদের টিম প্রতিনিয়ত আমাদের ডিফেন্স আরো ভালো করার চেষ্টা করছে, প্রিডেটরদের উৎখাত করার নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে, ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের লিংক ব্লক করছে এবং এই তথ্য অন্যান্য সংস্থার সাথে আদান-প্রদান করছে যাতে তারাও এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে পারে।"

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে মেটার বিরুদ্ধে একটি মামলায় মি বোল্যান্ড সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এই বছর। ওই মামলায় নিজেদের প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ইউজারদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ ছিল মেটার বিরুদ্ধে।

আদালত মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার নিউ মেক্সিকোকে দিতে নির্দেশ দেয়। সে সময় কোম্পানির একজন মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, তারা এই রায়ের সঙ্গে একমত নন এবং তারা আপিল করার পরিকল্পনা করছেন।

তেলেঙ্গানা রাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা ব্যুরোর শিখা গোয়েল
ছবির ক্যাপশান, তেলেঙ্গানা রাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা ব্যুরোর শিখা গোয়েল জানিয়েছেন, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলি থেকে বেশিসংখ্যক রিপোর্ট আসে

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির জন্য তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকা শিশু যৌন নির্যাতনের মেটিরিয়াল সংক্রান্ত তথ্য এনসিএমইসির 'সাইবার টিপলাইন'-এ রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক।

এরপর টিপলাইন কর্তৃপক্ষ সেই রিপোর্টটি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়।

২০২৫ সালে ভারত ১৯ লক্ষ রিপোর্ট পেয়েছে। তালিকার শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্ত রিপোর্টের সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষ।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় সাইবার পুলিশ কর্মকর্তাদের অন্যতম এবং তেলেঙ্গানা রাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা ব্যুরোর পরিচালক শিখা গোয়েল জানিয়েছেন, মেটার মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক থেকেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক টিপলাইন রিপোর্ট এসেছে।

তিনি বলেন, "তবে এর মানে এই নয় যে এরাই সবচেয়ে বড়ো প্ল্যাটফর্ম। শিশু যৌন নির্যাতনের মেটেরিয়াল শনাক্ত করার জন্য যদি তাদের ভালো কোনো অ্যালগরিদম থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সংখ্যায় অ্যালার্ট আসবে।"

মুম্বাই-ভিত্তিক এনজিও 'রাতি ফাউন্ডেশন' অনলাইনে ক্ষতির শিকার হয়েছে এমন শিশুদের জন্য একটি হেলপলাইন সেবা পরিচালনা করে। তারা জানিয়েছে, শিশু যৌন নির্যাতনের মেটিরিয়াল নিয়ে তারা যে-সব রিপোর্ট পায়, তার সিংহভাগই আসে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে।

ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে সহায়তার জন্য তারা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করে। তবে সংস্থাটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক সিদ্ধার্থ পিল্লাই বলেন, "অপরাধীরা আমাদের মডারেশন প্রচেষ্টা এড়াতে ইনস্টাগ্রাম থেকে টেলিগ্রামে সহজেই চলে যায় এবং আমরা যেসব কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করি, সেগুলোই তারা বারবার আপলোড করতে থাকে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে শিশু যৌন নির্যাতনের মেটিরিয়াল এমন সব অপরাধী গোষ্ঠীই তৈরি করত যারা মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িত। যদিও অনেক সময় পরিবার ও কমিউনিটির সদস্যরাও এগুলো তৈরি করে থাকে।

ভারতে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে কর্মরত ২৫০টিরও বেশি সংস্থার নেটওয়ার্ক 'জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন'-এর প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিভু বলেন, এই অপরাধের ঘটনাগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে রিপোর্ট করা হয় না এবং পুলিশ এখনও এটি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, এটি সফলভাবে করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আন্তঃসীমান্ত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, "সংগঠিত অপরাধের বিস্তার খুঁজে বের করার জন্য ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের পুরো চক্রটিকেই শনাক্ত করা প্রয়োজন।"