ডেঙ্গু: এবছর এখনো পর্যন্ত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে, দেখা যাচ্ছে নতুন উপসর্গ

মুগদা জেনারেল হাসপাতালেওয়ার্ডের সামনের খোলা জায়গায়ও ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়
ছবির ক্যাপশান, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ওয়ার্ডের সামনের খোলা জায়গায়ও ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়
    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে আজ বুধবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাত জনের মৃত্যুর ফলে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বর্তমান বছরে একশ' ছাড়িয়েছে। এদের অর্ধেকেরই মৃত্যু হয়েছে চলতি অক্টোবর মাসে।

এদিকে এই রোগটির যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা জানাচ্ছেন যে, এবছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কিছু নতুন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এসব উপসর্গের সাথে প্রথাগত ডেঙ্গুর উপসর্গের তেমন মিল নেই।

মুগদা হাসপাতালের পরিচালক ডা. নিয়াতুজ্জামান বলছেন, এসব নতুন উপসর্গের কারণে অনেক রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তা ঠিক বুঝতে না পেরে হাসপাতালে আসতে দেরি করেছেন। যার কারণে চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ায় তাদের অবস্থা জটিল হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, যেসব উপসর্গ দেখা যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মাথা ব্যথা ইত্যাদি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবারই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ৮৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

এ নিয়ে চলতি মাসের এই উনিশ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় বারো হাজার ডেঙ্গু রোগী।

গত কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি হঠাৎ করে এতটাই খারাপ হয়েছে যে হাসপাতালে রোগী ভর্তি প্রতিদিনই বাড়ছে।

এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল।

আরও পড়তে পারেন:

মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের এক চতুর্থাংশ শিশু
ছবির ক্যাপশান, মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের এক চতুর্থাংশ শিশু

'বুঝতে পারি নাই ডেঙ্গুটা হইছে'

মুগদা জেনারেল হাসপাতালে শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা ওয়ার্ড।

সেখানে গিয়ে দেখলাম, ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দাতে অনেকেই শয্যার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন।

তবে তাদের সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত নন। শিশু ওয়ার্ডের দুটি কক্ষকে ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সেখানেই তিনদিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে রয়েছেন সুরমি আক্তার। জানালেন, টানা নয় দিন ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছে তার সন্তান।

তবে মেয়েটি যে ডেঙ্গুতে ভূগছে, সেটি বুঝতে তার বেশ খানিকটা সময় লেগে গিয়েছে।

তিনি বললেন, "না আসলে প্রথমে আমরা বুঝতে পারি নাই ডেঙ্গুটা হইছে। প্রথম তো অনেক জ্বর আসছে। পরে আমরা হসপিটালে গিয়ে টেস্ট করিয়ে বুঝতে পারছি যে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে, পজিটিভ।"

তিনি জানান, বেশ কিছু দিন আগে তার পরিবারের আরো এক সদস্য ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল। তবে সাত দিনের মধ্যে তিনি ভাল হয়ে যান।

ওয়ার্ডের সামনের খালি জায়গাতেও রোগী

ঢাকার খুবই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত মুগদা জেনারেল হাসপাতাল। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতাল মূলত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে চিকিৎসা দেয়।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চাপ বাড়ছে, তাই ভবনের দশম ফ্লোরটি শুধুমাত্র ডেঙ্গু রোগীদের জন্যই রাখা হয়েছে।

মূল ওয়ার্ডের বাইরের খোলা জায়গা, যেটি মূলত প্রথাগত কোন ওয়ার্ড নয়, ডেঙ্গুর কারণে রোগীর আসা এই হাসপাতালে অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে, ওয়ার্ডের বাইরের সেই খোলা জায়গাটিকেও ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মূল ওয়ার্ডে ঢোকার আগে, লিফট থেকে পা বাড়ালেই ডেঙ্গু রোগীর শয্যা চোখে পড়ছে।

এবছর ডেঙ্গুর কিছু নতুন উপসর্গের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ছবির ক্যাপশান, এবছর ডেঙ্গুর কিছু নতুন উপসর্গের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

একটিমাত্র ফোমের উপর চাদর আর বালিশ, পাশে স্যালাইন ঝোলানোর একটা লম্বা ট্যান্ড, এমন আয়োজনেই শতাধিক ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করা হচ্ছে।

ওয়ার্ডে নারী-পুরুষ সবাই রয়েছেন। কেউ বেড পেয়েছেন, আবার কাউকে মেঝেতে ফোমের উপর অস্থায়ী শয্যায় থাকতে হচ্ছে।

এখানেই কয়েকদিন ধরে একটি শয্যায় মেয়েকে চিকিৎসা দিচ্ছেন মোসাম্মত নার্গিস।

মিজ নার্গিস বলেন, ''ওর প্রথমে জ্বর হইছে। আমি মুগদা মেডিকেলে নিয়ে আসছি। পরীক্ষা দিসে। আমি পরীক্ষা করি নাই। আমি ভাবসি ভাইরাস জ্বর, তিনদিন নাপা খাওয়াইলেই চলে যাবে। পরে যখন দেখি জ্বর কমতেছে না তখন ওই পরীক্ষাগুলো করে ফেলছি। ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।''

'রাস্তা-ঘাট থেকেই হইছে'

হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এদের অনেকের সাথেই কথা হয় আমার।

তবে এদের অনেকেই জানেন না যে ঠিক কিভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তারা।

বেশিরভাগেরই ধারণা, বাড়ির বাইরে থাকা অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছেন তারা।

অনুফা আক্তার বলেন, তার বাড়িতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

''সম্ভবত হয়তো রাস্তা-ঘাট থেকেই হইছে। কারণ আমাদের বাসায় আমরা সবসময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই, কয়েল ব্যবহার করি।''

তিনি বলেন, "বাসায় আরো বাচ্চা-কাচ্চা আছে। (বাসায়) হলে তো ওদেরও হতো। যেহেতু ওদের হয় নাই, তাইলে আমার তো রাস্তা-ঘাট থেকেই হইছে।"

অক্টোবরে বাড়ছে বেশি

সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গি বা প্রচলিত ভাষায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

তবে এবারে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সংক্রমণের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী দেখা যাচ্ছে।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ডা. নিয়াতুজ্জামান। তিনিও এই তথ্য নিশ্চিত করে জানালেন, গত মাসের পর থেকেই হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।

সরকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বাড়তি চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়ার পর একটি ফ্লোরকে শুধুমাত্র ডেঙ্গু রোগীদের জন্যই বরাদ্দ করা হয়েছে বলে তিনি জানালেন।

আরও পড়তে পারেন:

ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকেই জানেন না যে ঠিক কিভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তারা
ছবির ক্যাপশান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকেই জানেন না যে ঠিক কিভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তারা

ডা. নিয়াতুজ্জামান জানালেন, আরো একটি ফ্লোরকে তৈরি রাখা হয়েছে অতিরিক্ত ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলানোর জন্য। তিনি বলেন, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ৫০০ শয্যার হলেও বর্তমানে রোগী রয়েছে ৭০০ জন।

আর এদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাই ১৪০ জনের মতো।

ডা. নিয়াতুজ্জামান বলেন, "সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমার স্থিতি ছিল হান্ড্রেড এর নিচে। কিন্তু অক্টোবরের শুরু থেকেই এটা ১২০-১২৫ উঠে। যেটা এখনো কন্টিনিউ করতেছে," জানালেন ডা. নিয়াতুজ্জামান।

"১২৫-১৩০ এইরকম রোগী এখন প্রতিদিন স্থিতিশীল। মানে ভর্তি হচ্ছে, ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গড়ে আমার প্রতিদিন ১২০-১৩০ জন রোগী থাকছে।"

মুগদা হাসপাতালের এই পরিচালক জানান, তার হাসপাতালে থাকা ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে এক চতুর্থাংশই শিশু।

এই অবস্থাটাও এবার নতুন বলে জানাচ্ছেন তিনি। এর আগে এতো বেশি মাত্রায় শিশুদের আক্রান্ত হতে দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, "কালকে পর্যন্ত ২৭ জন শিশু রোগী আমার ভর্তি ছিল। প্রায় ওয়ান ফোর্থের মতো শিশুরোগী আমার ডেঙ্গু ওয়ার্ডে আছে।"

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: