হাইওয়ে: মহাসড়কে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে যাত্রীরা, অপরাধ কেন বাড়ছে

বাস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ কাটছে না।
    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো যাত্রীদের চলাচলের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে উঠছে যাতে সবশেষ যুক্ত হয়েছে টাঙ্গাইলে বাসে দুধর্ষ ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা।

এর আগেও বাসে এমন ডাকাতি, যৌন নিপীড়ন, অজ্ঞান করে লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দৃশ্যত এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি ।

নিরাপত্তা বলতে শুধুমাত্র টিকেট কাউন্টারে সিসিটিভি ফুটেজ এবং টহল দেয়ার ওপরেই জোর দিচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ।

তবে যাত্রীরা বলছেন তারা মহাসড়কে নিরাপত্তায় কোন তল্লাশি চৌকি বা নজরদারি দেখেন না।

গার্মেন্টস কর্মী সেলিনা বেগম (ছদ্মনাম) নিয়মিত তার কাজের প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর মহাসড়কে চলাচল করেন। কাজ শেষে ফিরতে ফিরতে তার অনেক সময় রাত হয়ে যায়।

কিন্তু মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে তার একমাত্র মাধ্যম বাস এবং এই পরিবহনকে তিনি এতদিন নিরাপদ ভাবতেন।

তবে টাঙ্গাইলের সর্বশেষ ঘটনাটির খবর সংবাদমাধ্যমে দেখার পর মহাসড়কে একা চলাচলের ক্ষেত্রে রীতিমতো ভয় পাচ্ছেন তিনি।

উদ্বেগের স্বরে তিনি বলেন, "এই ঘটনা তো আমার সাথেও হতে পারে এরকম একটা আতঙ্ক নিয়ে গাড়িতে উঠা লাগে। যতোই সাবধান হয়ে চলি লাভ কী? রাস্তায় তো নিরাপত্তা নাই। সিটিং গাড়ি বলে বাসগুলো রাস্তায় থামায় থামায় লোক নেয়। বিপদ তো হয় তখন। আমরা শ্রমিক মানুষ, আমাদের তো কোম্পানি গাড়ি দেয় না। রিজিকের জন্যই এতো দূরে বাসে গিয়ে কাজ করা লাগে। সরকার ব্যবস্থা না নিলে আমরা কেউই নিরাপদ না।"

নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সম্প্রতি মহাসড়কে নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের খবর শিরোনাম হয়েছে।

আরও পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে মহাসড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য হাইওয়ে পুলিশ ইউনিট গঠন করা হলেও মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও অপরাধ দৃশ্যত কমেনি বলেই দেখা যাচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসে সড়ক-মহাসড়কে বিভিন্ন যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় সাহায্য চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন এসেছে ১২৭০টি।

কিন্তু সেখানে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের ধারণা বাস্তবে যানবাহনে লুটপাট ও ডাকাতির সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এসব ঘটনা প্রতিরোধে চেকপোস্টে তল্লাশি বা পুলিশের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনা না যাত্রীদের।

এমন অবস্থায় রাত গভীর হলে মহাসড়কে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তারা।

তবে হাইওয়ে পুলিশের মুখপাত্র মো. সামসুল আলম এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।

"এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেগুলো ঘটে যায়, সেগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়। হাইওয়ে পুলিশ আমরা টহল দেই। মহাসড়কে যেন নাশকতা না হয় সে ব্যাপারে আমরা আগাম তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেই। যতো ঘটনাই ঘটেছে সবগুলোয় আমরা আসামী ধরসি," বলেন তিনি।

পুলিশ কর্মকর্তা সামসুল আলম আরও জানান মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য তারা টিকেট কাউন্টারে সিসিটিভি বসানো নিশ্চিত করা এবং মহাসড়কে টহল দেয়ার কাজ নিয়মিত করেন।

বাংলাদেশের সংশোধিত সড়ক আইনে গণপরিবহনে দৃশ্যমান জায়গায় চালক ও হেলপারের ফোন নম্বর, বাসের লাইসেন্স নম্বর প্রদর্শন করতে বলা হলেও, এই নির্দেশনা পালন হয় না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাতের বেলা সড়কে চলাচলে অনিরাপদ বোধ করেন যাত্রীরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাতের বেলা সড়কে চলাচলে অনিরাপদ বোধ করেন যাত্রীরা।

এছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা সরকারকে যেসব সুপারিশ দিয়েছিলেন সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

যেমন, চালকদের মাসিক বেতন কাঠামোর মধ্যে নিয়োগ দেয়া ও কর্ম-ঘণ্টা ঠিক করে দেয়া। যে উদ্যোগ নিতে হবে বাসের মালিকদের।

কেননা চালকরা চুক্তিভিত্তিক কাজ করে গেলে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতা ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

এছাড়া একেক বাস একেক চালকের হাতে থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। এবং চালকরা দীর্ঘসময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তারা সহজেই মাদকাসক্ত হন, ফলে অপ্রকৃতিস্থ থাকার ঝুঁকি থাকে বলে তারা অভিযোগ করছেন।

প্রতিটি বাসে ট্র্যাকার বসানোর সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যেন বাস স্টপের বাইরে থেকে যাত্রী তোলা হলে বা রুট বদলালে, বাস অহেতুক থেমে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।

সেইসাথে পুরো মহাসড়ক সিসিটিভির আওতায় আনা যেন কোন যানের চলাচল সন্দেহজনক মনে বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়।

এই সচেতনতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন শুধুমাত্র পুলিশের টহল দিয়ে সারা দেশের ২৫০০ কিলোমিটার সড়কে নিরাপত্তা দেয়া রীতিমতো অসম্ভব হতে পারে।

টাঙ্গাইলের ঘটনায় ডাকাতরা বাসটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আড়াই ঘণ্টা বিভিন্ন সড়কে ঘোরালেও সেটা হাইওয়ে পুলিশের নজরে আসেনি। স্থানীয়রাই বাসটি পড়ে থাকতে দেখে সবাইকে উদ্ধার করেন।

যাত্রী কল্যাণ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যবস্থাপনা, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে না পারা সেইসাথে হাইওয়েতে নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশের সমন্বয়হীনতা দূর করা না গলে মহাসড়কে নিরাপত্তা বিধান কঠিন হয়ে পড়বে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: