সড়ক দুর্ঘটনা: ট্রাক চাপায় গর্ভবতী মায়ের প্রাণ গেলেও যেভাবে জন্ম হল গর্ভের শিশুটির

নবজাতক শিশুটি

ছবির উৎস, Sharif Uddin

ছবির ক্যাপশান, হাত ভেঙে গেছে নবজাতক শিশুটির।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

সাবধানতা: প্রতিবেদনটি আপনাকে বিচলিত করতে পারে।

ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে এক সড়ক দুর্ঘটনার সময় জন্ম নিয়েছে এক শিশু। শনিবার বিকেলে দ্রুতগামী একটি ট্রাকের চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান স্বামী, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তাদের এক মেয়ে। কিন্তু দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সময় অন্তঃসত্ত্বা নারী জন্ম দিয়ে গেছেন একটি কন্যা শিশুর।

ঘটনার মর্মান্তিকতা সাড়া ফেলেছে সারা দেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

যেভাবে জন্ম হল শিশুটির

শনিবার বিকেল তিনটার দিকে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কোর্ট ভবন এলাকার ঘটনা: স্বামী জাহাঙ্গীর আলম ও ছয় বছর-বয়সী মেয়ের সাথে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে যাচ্ছিলেন ন'মাসের অন্তঃসত্ত্বা ত্রিশালের রায়মনি গ্রামের রত্না বেগম।

অনাগত সন্তানের শারীরিক অবস্থা কেমন আছে তা জানতে কাছেই একটি ক্লিনিকে আলট্রাসাউন্ড করাতে যাচ্ছিলেন তারা।

কিন্তু রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগামী একটি ট্রাকের নিচে চাপা পড়েন পরিবারের সবাই। ঘটনাস্থলেই সকলের মৃত্যু হলেও এই দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছে কয়েক মুহূর্ত আগ পর্যন্ত মাতৃগর্ভে থাকা শিশুটি।

ঘটনার পরপরই সেখানে উদ্ধারকাজে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ত্রিশাল ফায়ার স্টেশনের সাব অফিসার মোঃ রিয়াজ উদ্দিন।

হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে শিশুটিকে।

ছবির উৎস, Sharif Uddin

ছবির ক্যাপশান, হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে শিশুটিকে।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "আমরা গিয়ে দেখি রাস্তায় দুটো লাশ পড়ে আছে। একজন নারী ও একজন পুরুষ। যাদের মুখ একদম বিকৃত হয়ে গেছে। ট্রাকের সামনের দিকের চাকার নিচে পড়েছেন ভদ্রলোক। গর্ভবতী নারীর শরীরের বাম দিকের এক পাশ দিয়ে ট্রাকের পেছনের চাকাটা চলে গেছে। চাকার চাপে পেট ফেটে নাড়িভুঁড়িসহ বাচ্চাটা বের হয়ে এসেছে।

"ত্রিশালে রোজই দু-একটা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু এরকম ভয়াবহ ঘটনা আমার চাকুরি-জীবনে দেখিনি। এটা যেন একটা অলৌকিক ঘটনা। আমরা পরে মরদেহ দুটি বডিব্যাগে ভরে পুলিশের হাতে তুলে দেই।"

উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই ঘটনাস্থলের কাছে থাকা মানুষজন নবজাতক ও ছয় বছর-বয়সী কন্যা শিশুটিকে কাছেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

সেখানে চিকিৎসকেরা ছয় বছর-বয়সী শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করে। পুলিশ এসে রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ দুটি নিয়ে যায় থানায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন জানিয়েছেন, "দুর্ঘটনার পর আশপাশের লোকজন যখন কাছে গেল তারা দেখতে পেল তিনটা বডি পড়ে রয়েছে। তারা একদম নতুন জন্ম নেয়া বাচ্চার কান্নাও শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু হট্টগোলের মধ্যে কোথা থেকে কান্নাটা আসছে সেটা বুঝতে পারেনি। পরে তারা দেখে যে মহিলার বোরখার নিচে একটা বাচ্চা। সাথে সাথে কেউ বোঝেনি যে বাচ্চাটা পেট ফেটে বের হয়েছে।"

তিনি জানিয়েছেন ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় এবং অনেক প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেই দুর্ঘটনাটি ঘটার কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তিনজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মৃত জাহাঙ্গীর আলমের চাচাতো ভাই শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন শনিবার রাতেই মৃতদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মর্মান্তিক ঘটনাটি সাড়া ব্যপক ফেলেছে। (ফাইল ফটো)

কেমন আছে নবজাতক শিশুটি?

ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক নারী শিশুটিকে কাপড়ে মুড়ে প্রাথমিক যত্ন দিতে সহায়তা করেন।

তাকে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পর বোঝা যায় যে নবজাতক শিশুটিও আহত হয়েছে। শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন পরে শিশুটিকে ময়মনসিংহ সদরের বেসরকারি লাবীব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

হাসপাতালটির শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, "নবজাতক শিশুটির হাতের কনুই-এর উপরে যে মোটা হাড্ডি থাকে সেখানে ফ্র্যাকচার হয়েছে। তার কলার বোন ভেঙে গেছে। ভাঙা জায়গায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। তবে কোন ধরনের ইন্টারনাল ইনজুরি আমরা পাইনি।

"শিশুটির ওজন তিন কেজির চেয়ে সামান্য বেশি। সে মাশাল্লাহ সুস্থ আছে। কিন্তু যেভাবে সাংবাদিকসহ মানুষজন ভিড় করছে, তাতে নবজাতক তো, কোন ইনফেকশন হয়ে যায় কিনা সেটা নিয়ে আমরা কিছুটা শঙ্কিত।"

মৃত জাহাঙ্গীর আলম ও রত্না বেগমের ১০ বছরের কম বয়সী আরও দুটো সন্তান রয়েছেন। পুরো ঘটনায় বিহ্বল শিশু দুটি তাদের ছোট্ট বোনকে হাসপাতালে দেখতে এসেছে।

এখন শিশুটির দেখভাল করছেন হাসপাতালটির মালিকের স্ত্রী ও সেখানে কর্মরত কয়েকজন নার্স। তাছাড়া হাসপাতালটিতে সন্তান জন্ম দেয়া কয়েকজন প্রসূতি শিশুটিকে ভাগ করে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন, বলছিলেন ডা. কামরুজ্জামান।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর কারণে শিশুটির নাম রাখা হয়নি এখনো। শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন, "আমরা ওই পর্যন্ত ভাবতেও পারিনি। আমার ভাই নিজে এক সময় পেশায় গাড়ির চালক ছিল। ত্রিশাল এলাকায় খুব নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটতে দেখে বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার পর সে গাড়ি চালানোর কাজ ছেড়ে দেয়। ওদের এইভাবে মৃত্যু আমরা ভাবতেও পারছি না।"

এখন শিশুটির দায়িত্ব কে নেবে তা নিয়ে রোববার উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, অটিস্টিক শিশুর জন্মের জন্য কি বাবা-মা দায়ী?