লঞ্চে আগুন, ভিকটিমকে দোষারোপ আর নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সাবির মুস্তাফা
- Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
বছরের শেষ এডিটার'স মেইলবক্স-এ বিশেষ কোন আয়োজন নেই, প্রতি সপ্তাহের মত আপনাদের চিঠির জবাব দিয়েই ২০২১ খ্রিষ্টাব্দকে বিদায় দিয়ে ২০২২ সালকে স্বাগত জানাব।
বিগত কয়েক দিনে পাঠকদের মধ্যে আলোচনার বড় বিষয় ছিল বাংলাদেশের ঝালকাঠিতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৪০ জনের মৃত্যু। কক্সবাজারে নারী ধর্ষণের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে।
তবে আজ শুরু করছি ভ্যাক্সিনের আবিষ্কার নিয়ে একটি প্রশ্ন দিয়ে, লিখেছেন বগুড়ার শেরপুর থেকে সম্পদ কুমার পোদ্দার:
''বিশ্বের বিভিন্ন সংকট বা ক্রান্তিকালে বিভিন্ন প্রথিতযশা মনীষীগণ অবদান রাখেন। তাঁরা নিজ নিজ মেধা, গবেষণা, পরিশ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে অনেক কিছু আবিষ্কার করে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। আমরা তাঁদেরকে উদ্ভাবক, আবিষ্কারক বা বিজ্ঞানী বলে সম্মানিত করে থাকি। যেমন পেনিসিলিনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। জলাতঙ্কের টিকার আবিষ্কারক লুই পাস্তুর।
''করোনা সংক্রামকের মহামারি বা অতিমারির হাত থেকে বাঁচাতে আবিষ্কার হয়েছে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডের্না, ফাইজার সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কোম্পানির ভ্যাকসিন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই করোনা ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক কে বা কারা? তাছাড়া বলা তো যায়না, বিসিএস পরীক্ষায় যদি এমন প্রশ্ন আসে তাহলে ছাত্ররা কী উত্তর দিবেন?''

ছবির উৎস, Anadolu Agency
আমি যত দূর জানি মিঃ পোদ্দার, করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন পুরোপুরি নতুন আবিষ্কার না। এই ভ্যাক্সিন তৈরি হয়েছে পুরনো পদ্ধতির ওপর ভর করে বা নতুন ধরনের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যার ফলে কোন একক ব্যক্তি বা কোম্পানিকে করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের কৃতিত্ব হয়তো দেয়া যায় না।
তবে, ফাইজারের ভ্যাক্সিন যেহেতু নতুন আরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, তাই জার্মানির বায়োনটেক কোম্পানির বিজ্ঞানী দম্পতি, ড. উর শাহিন এবং ড. ওজলেম টুরেসি, এই দুইজনকে এক ধরনের পথিকৃৎ হিসেবে দেখা হয়। তবে আবিষ্কারক না। তাদের সম্পর্কে জানতে এই ভিডিও দেখে নিন।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, NurPhoto
নারীর 'আজন্ম পাপ'
গোটা বছর জুড়ে বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তা ছিল একটি আলোচিত বিষয়, যেটা নিয়ে লিখেছেন সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গাজী মোমিন উদ্দিন:
''সামাজিক রক্ষণশীলতা শুধু পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে নয়। সমস্ত জায়গায় এর প্রভাব লক্ষণীয়। বিশেষ করে পোশাক ও খাবার গ্রহণের রুচি নিয়ে মানুষ বেশি কথা বলে। শিক্ষিত নারীদের সচেতনতা ও অর্জিত শিক্ষা কাজে লাগিয়ে সামাজিক হওয়া নিয়েও কথা বলেন কেউ কেউ।
''নারীরা ঘরে বন্দী থাকবে, বাইরে যাবে না, গেলেও ভীষণভাবে কাপড়ে আচ্ছাদিত হয়ে যাবেন, এমনটি চান কেউ কেউ। তাহলে সামাজিক সুরক্ষা কবে নিশ্চিত হবে? প্রগতিশীলতার স্পর্শ পাওয়াই যেন নারীদের আজন্ম পাপ।
''আমরা চাই নারী হিসেবে নয়, তারা মানুষ হিসেবে সর্বত্র পুরুষের মত বিচরণ করবে ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিবে। এমন পরিস্থিতি কবে আসবে সেটাই ভাবছি।''

ছবির উৎস, Future Publishing
আমার মতে আপনি মূল সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন মিঃ মোমিন উদ্দিন। সমাজে পুরুষের মত নারীও বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং চিন্তা-ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
সেই প্রভাব অনেক নারীর পোশাক-আশাক, চাল-চলনের ওপর পড়বে, সেটাও স্বাভাবিক, ঠিক যেমন হয়েছে পুরুষের ক্ষেত্রে।
পুরুষ যেমন নিরাপদে তার জীবন যাপন করতে পারেন, নারীরও সেই অধিকার আছে। কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নারীর সেই অধিকার সমুন্নত রাখা। তাকে নিরাপত্তা দেবার নামে কোন গণ্ডির মধ্যে আবধ্য করা হবে ব্যর্থতার লক্ষণ।
যৌন শিক্ষা নিয়ে বিবিসির 'মাতামাতি'
সমাজে আধুনিকতার স্পর্শ অনেককেই চিন্তিত করে তোলে, যেহেতু বাংলাদেশ এখনো মূলত একটি রক্ষণশীল সমাজ। যেমন ধরুন যৌন বিষয়ক শিক্ষা। বাংলাদেশে আগামী বছর থেকেই প্রাইমারি ও হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের যৌন বিষয়ক শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছে।

যৌন বিষয়ক শিক্ষা গুরুপূর্ণ বিষয় হলেও, বিবিসির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন রংপুরের পার্বতীপুর দোলাপাড়া উপশহর থেকে মোহাম্মদ লিয়াকত আলী:
''আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করছি, বিবিসি বাংলা যৌনতা বা লিভ টুগেদার বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহর সাথে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। যে বিষয়গুলো বাংলাদেশে ভাবাই যায়না, সে বিষয়গুলো নিয়ে বিবিসি বাংলা মাতামাতি করে।
''আমি জানতে চাই বিবিসির যারা পাঠক, তারা কি এরকম প্রতিবেদন পড়তে আগ্রহী? বিবিসির জরিপ কী বলে? বিবিসি কি এদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়?''
বিবিসি বাংলা বাংলাদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে কেন মিঃ আলী? গত ৮০ বছর ধরে আমাদের অনুষ্ঠানে বাঙালি সংস্কৃতি, জীবন-যাত্রা, সাহিত্য ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে।
আপনি যেটাকে পশ্চিমা সংস্কৃতি বলছেন, যেমন যৌন শিক্ষা, পরিবর্তনশীল সামাজিক মূল্যবোধ, নতুন করে পারিবারিক চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি, এগুলোকে আমরা বৈশ্বিক মূল্যবোধ হিসেবেই দেখি।
যে বিষয়গুলো আপনার মতে 'ভাবাই যায় না', সেগুলো সম্পর্কে জানার প্রবল আগ্রহ আমাদের পাঠকদের মধ্যে আছে। যেমন ধরুন, লিভ টুগেদার নিয়ে যে প্রতিবেদন নভেম্বর মাসে প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটা এক লক্ষরও বেশি পাঠক পড়েছেন, এবং তারা গড়ে দেড় মিনিটের বেশি সময় ধরে পড়েছেন।
আরো পড়ুন:

সোহেল তাজ
এবার আমদের পরিবেশনায় একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে মন্তব্য করেছেন বরিশালের কাউনিয়া থেকে মোহাম্মদ সাইদুর রহমান:
''বিবিসি বাংলার পরিক্রমা অনুষ্ঠানে আকবর হোসেনের সাথে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ-এর সাক্ষাৎকার খুব ভাল লেগেছে। সোহেল তাজ বর্তমানে সমাজের নানাবিধ সামাজিক সমস্যা নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করছেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।
''এদেশে ক্ষমতা পেয়ে অনেকে তা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, ক্ষমতা কেউ স্বেচ্ছায় ছাড়তে চায় না। সোহেল তাজ সেক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম এবং স্বেচ্ছায় তার পদত্যাগ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দেশের প্রতি তার যে আনুগত্য ও ভালবাসা, তা নতুন প্রজন্মের জন্য অবশ্যই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।''
আপনার মত অনেকেই আগ্রহের সাথে তানজিম আহমেদ সোহেল-এর সাক্ষাৎকারের ভিডিও আমাদের ওয়েবসাইট এবং ইউ টিউব চ্যানেলে দেখছেন মিঃ রহমান। ভিডিওটি এখানে শেয়ার করা হল।
অনেকেই এই তরুণ রাজনীতিককে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছে। হয়তো বাংলাদেশের তরুণ সমাজ রাজনীতিতে এমন নতুন নেতা খুঁজছে যাদের আদর্শগত অবস্থান থেকে তারা প্রেরণা নিতে পারবে।

ছবির উৎস, ARIFUR RAHMAN
লঞ্চ দুর্ঘটনা, পুনরায়
চলতি সপ্তাহে সব চেয়ে বড় - এবং মর্মান্তিক, খবর ছিল ঝালকাঠিতে লঞ্চে আগুন, ৪০ জন যাত্রীর মৃত্যু। সে বিষয়ে কয়েকটি চিঠি এসেছে, প্রথমে লিখেছেন ঝালকাঠির তালগাছিয়া থেকে শহীদুল ইসলাম:
''গত ২৩শে ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ নামে একটি লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষের প্রাণহানি হয় যা অনেকের মনেই দাগ কাটে। শুধু আমাদের ঝালকাঠিই নয়, গোটা দক্ষিনাঞ্চলবাসী এমন বিভীষিকাময় রাত কখনো দেখেনি।
''লঞ্চের স্টাফদের গাফেলতির কারণে এতো মানুষের প্রাণহানি হয়। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসার পর থেকেই বারবার যখন ইঞ্জিনে বিকট শব্দ এবং কালো ধোঁয়া হতে থাকে তারপরেও তারা সতর্ক হয়নি, এমনকি লঞ্চ তীরে এনে নোঙ্গর না করেই তারা পালিয়ে যায়।
''উক্ত লঞ্চে লাইফ জ্যাকেটও পর্যাপ্ত ছিল না, যার কারণে এতো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত যেন এর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।''

ছবির উৎস, ARIFUR RAHMAN
আপনি যে অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে বোঝা যায় কী পর্যায়ের গাফিলতি সেখানে ছিল। লঞ্চের কর্মীরা যাত্রীদের প্রতি তাদের দায়িত্বের কথা ভুলে পালিয়ে গেছেন, এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা খুবই দু:খজনক হবে।
কিন্তু মালিক পক্ষও কি দায় এড়াতে পারে? লঞ্চে কি পর্যাপ্ত পরিমাণ অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম ছিল? আগুন বা অন্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কী করতে হবে, জরুরি অবস্থায় যাত্রীদের কীভাবে সাহায্য করতে হবে, সে বিষয়ে কি লঞ্চের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল? বা নিয়মিত ড্রিল করা হয়?
যদি না হয়, তাহলে তার জন্য মালিক পক্ষ দায়ী।
নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষর দায়
তবে শুধু মালিক পক্ষই না, নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষর দায়ভারের কথাও বলছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:
''ফিটনেস বিহীন এই লঞ্চটিকে যারা চালানোর অনুমতি দিয়েছিল তারাও এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে আমার মনে হয়। লঞ্চে ছিল না পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম এবং লাইফ জ্যাকেট।
''কাজেই লঞ্চের মালিকের পাশাপাশি যারা এ লঞ্চটিকে চালানোর অনুমতি দিয়েছে এবং লঞ্চের স্টাফ সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এদের টনক কোনোদিনও নড়বে না।''

ছবির উৎস, Getty Images
কর্তৃপক্ষর কাজ কী?
একই বিষয়ে লিখেছেন ঢাকার ধানমন্ডি থেকে শামীম উদ্দিন শ্যামল:
''অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লেগে অন্তত ৪০জনের মৃত্যু হবার পর সেই পুরাতন অভিযোগগুলোই ঘুরে ফিরে আসছে। কোন দুর্ঘটনা ঘটার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধরণের ত্রুটির কথা সামনে আসে। তাহলে তদারকির দায়িত্বে যে কর্তৃপক্ষ থাকে, তাদের কাজ কী?
''দুঃখের বিষয় হল লঞ্চ হোক কিংবা বিল্ডিং হোক, অগ্নিকান্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু হবার পরই শুধু এই বিষয়গুলো উঠে আসে। এই সব বিষয়ে যদি তদারকির মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা পূর্বেই নেয়া যেত তাহলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা থেকে বাঁচা যেতো।''

ছবির উৎস, Getty Images
আরো লিখেছেন পটুয়াখালীর মৌকরন থেকে শাহীন তালুকদার:
''নৌযান দুর্ঘটনার পর শুনি তদন্ত, ক্ষতি পূরণ, গ্রেফতার, অদক্ষ চালক, নকশায় ত্রুটি, মেয়াদ উত্তীর্ণ ইনজিন, ফিটনেস ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি। সেবার মান নিম্নমানের, অথচ ভাড়া বাড়ানো হয় হু হু করে। জীবন রক্ষাকারী দ্রব্যর স্বল্পতা, আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ও ট্রেনিং নাই। এসব বিষয় জরুরি ভিত্তিতে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি নয় কি?''
আপনাদের মতামতের জন্য ধন্যবাদ মুকুল সরদার, শামীম উদ্দিন শ্যামল আর শাহীন তালুকদার। আপনাদের কথা একটি দিকে ইঙ্গিত করছে আর তা হল, এখানে নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষর বিরাট গাফিলতি আছে।
যথাযথ ব্যবস্থাপনা থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হত বা দুর্ঘটনা হলেও যাত্রীদের এভাবে প্রাণ হারাতে হত না। এখানে জবাবদিহিতার অভাব আছে।

ছবির উৎস, কাসেম হাসান
গোটা গণ পরিবহনে ভোগান্তি
শুধু নৌ পথই না, বাংলাদেশে স্থল পথও সাধারণ যাত্রীদের জন্য নিরাপদ না।
কয়েক দিন আগে ঢাকা শহরের কেন্দ্রে দিনে-দুপুরে একটি ঘটনা সেটাই সবাইকে আবার মনে করিয়ে দিল। লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:
''যাত্রীবাহী একটি বাস সড়কের ডিভাইডার ভেঙে পাশের লেনের মাইক্রোবাসের উপর উঠে যাওয়া, যানজটের কারণে রেলক্রসিংয়ে আটকে থাকা বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা, কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় চলে এক সময় যাত্রী সহ লঞ্চের ভস্মীভূত হবার দৃশ্যগুলো আমাদের সামগ্রিক পরিবহন খাতের একটা চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিদিন যারা গণ পরিবহন ব্যবহার করেন, শুধু তারাই জানেন কি ভোগান্তি পোহাতে হয়।''
অর্থনৈতিক ভাবে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এত উন্নয়ন সত্ত্বেও গণ পরিবহনের মত এত প্রয়োজনীয় একটি খাতে এখনো কেন এরকম বিশৃঙ্খলা এবং অরাজকতা চলছে, সেটা একটা বড় রহস্য মিঃ সাঈদ।
হয়তো এখানে আসলে কোন রহস্য নেই। পরিবহন খাতের মালিক পক্ষের সাথে সরকারের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করলেই হয়তো বোঝা যায় কেন এই অরাজকতা চলতে দেয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, coldsnowstorm
আবার ফিরছি কক্সবাজারের ঘটনায়। সেই ঘটনার জের ধরে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কেউ আবার ভিকটিম নারীকেই দোষী সাজানোর চেষ্টা করেছেন (যেটা বাংলাদেশে ধর্ষণের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়)
'দুশ্চরিত্র' তকমা দিয়ে ধর্ষণ ঢাকা?
পরের চিঠিতে সেরকম একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, লিখেছেন রংপুরের লালবাগ থেকে মোহাম্মদ মহসীন আলী:
''সাম্প্রতিক কালে একজন নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ যেভাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, তাতে আমরা হতবাক হলাম। কারণ উক্ত মামলায় অভিযুক্ত একজন আসামী পুলিশের খাতায় ডজন খানেক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কী করে প্রকাশ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটাতে পারে তা আমাদেরকে বিস্মিত করেছে।
''অপরদিকে যে নারী আট মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে হোটেল-মোটেলে মাসের পর মাস অবস্থান করতে পারে সেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকাটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ রকম একজন নারীকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, চাঁদাবাজি বা ভাগ বাটোয়ারা জনিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কিনা তা ভেবে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে বলে আমি মনে করি।''
শুরুতেই যেটা বলছিলাম মিঃ আলী, ভিকটিম নারীকে দোষী সাজানোর চেষ্টা প্রায় করা হয়, এবং সেটা করার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে তার চরিত্র প্রশ্নের মুখে ফেলা।
ব্যাপারটা এমন ভাবে তুলে ধরা হয় যেন, ভিকটিম নারীকে 'দুশ্চরিত্র' হিসেবে দেখানো গেলে আসল ঘটনা, অর্থাৎ ধর্ষণের ঘটনাটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে।
কিন্তু না, এখানে মূল অভিযোগ ধর্ষণ এবং পুলিশের উচিত হবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো। ভিকটিম নারী কী করতেন, কতবার কক্সবাজার এসেছেন, কোন হোটেলে থেকেছেন, কার সাথে ভাগ-বাটোয়ারা ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি মুখ্য বিষয় না।
সমাজের চোখে উনি 'দুশ্চরিত্র' হলেও তাকে ধর্ষণ করা যায় না, এই মৌলিক বিষয়টি পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
কক্সবাজার বয়কট
কক্সবাজারের ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, তা নিশ্চিত করার পথ কী? দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক বলছেন, পুরো শহর বয়কট করা একটি পথ:
'' কক্সবাজার দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। গত ২৫শে ডিসেম্বর আকবর হোসেন এর সঞ্চালনায় শনিবারের বিশেষ আলোচনা পর্বটি আমাকে স্তম্ভিত করেছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো নিয়ে আলোচনা থেকে জানতে পারলাম, থাইল্যান্ড কিংবা কোলকাতার থেকেও বাংলাদেশে পর্যটকদের ব্যয় দ্বিগুণ।
''তাই এদেশে ভ্রমণে আসতে বিদেশীরা দিনদিন উৎসাহ হারাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে আমার অভিমত হল - আসুন আমরা ছয় মাসের জন্য কেউ সেখানে যাবো না, কেউ না। তাহলেও যদি পরিস্থিতির খানিকটা সমাধান হয়।
''একবারের জন্য হলেও পরিবারের নিরাপত্তার ইস্যুতে কক্সবাজার বয়কট করুন। তখন দেখবেন, কক্সবাজারের হোটেল মালিক নিজে হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা দিবে। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে ওদের স্টাফরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কক্সবাজার প্রশাসনকে ওরা বাধ্য করবে, দায়িত্ব পালনের জন্য।''
আপনার প্রস্তাবটা বেশ ইন্টারেস্টিং মিঃ ইসলাম, কিন্তু এটা কি আদৌ বাস্তবসম্মত? এ'ধরনের বয়কট সাধারণত সফল হয় না কারণ সাধারণ মানুষ সংঘবদ্ধ ভাবে কাজ করে না। সবার নিজ নিজ পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী চলে, তাদের নিজেদের প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত নেন।
তবে কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজন যদি আন্দোলন করে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন বিবিসির লক্ষ্য?
এবারে আমাদের রেডিও অনুষ্ঠান নিয়ে একটি প্রশ্ন, লিখেছেন সাতক্ষীরার তালা মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে সুতপা রাহা টুম্পা:
''সাতাশে ডিসেম্বর রাতে ফোন-ইন অনুষ্ঠানে লিভার সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ডাক্তারি পরামর্শমূলক অনুষ্ঠান শুনেছি। অনুষ্ঠানটি অবশ্যই মানুষের জন্য উপকারী কিন্তু বিবিসির মত সংবাদ মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানটির প্রচার কি বিবিসি বাংলা বিভাগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে যায়? উল্লেখ্য বাংলাদেশ বেতারের ঢাকাসহ আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি এই ধরনের অনুষ্ঠানের ব্যাপক আয়োজন করে থাকে।''
আমরা অনেক কিছুই করি যেগুলো স্থানীয় গণমাধ্যমও করে থাকে মিস রাহা। আবার, আমরা অনেক কিছু করি যেটা স্থানীয় গণমাধ্যম করবে না। মূল কথা হচ্ছে, আমরা যা করছি তা কি জনস্বার্থে করছি?
স্বাস্থ্য বিষয়ক ফোন-ইন জনস্বার্থমূলক একটি অনুষ্ঠান এবং সে বিবেচনায় বিবিসি বাংলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে অবশ্যই সামঞ্জস্য আছে।
সাতক্ষীরার আরেকটি চিঠি দিয়ে শেষ করছি, লিখেছেন দক্ষিণ নলতা থেকে রহমত আলি মোড়ল:
''সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরে সুপেয় পানির অভাব ও বাস্তবতার উপর বিবিসির ওয়েবসাইটে একটা নিউজ দেখলাম। পড়লাম, কিন্তু করণীয় ও সম্ভাবনার উপর কিছু দেখলাম না। তাই প্রশ্ন জাগল রিপোর্টের আরও কি কোন পর্ব আছে?''
দু:খিত মিঃ আলী, সুপেয় পানির অভাব নিয়ে প্রতিবেদনের আর কোন পর্ব নেই। তবে ভবিষ্যতে থাকবে না, তেমন না।
আপনি হয়তো দেখেছেন, উপকূল অঞ্চলে জয়বায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে যেমন পাঁচটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, একই সাথে এই প্রভাব মোকাবেলার জন্য নতুন কী করা হচ্ছে, তা নিয়েও চারটি প্রতিবেদন ছিল।
এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার:
শামীমা আক্তার লিপি, তালা, সাতক্ষীরা।
এহসান আহমেদ সাবির, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
আশিষ মন্ডল, শালিখা, মাগুরা।
রুমানা আক্তার শিউলি, সাতক্ষীরা সিটি কলেজ।
বুদ্ধিমন্ত কর্তনীয়া, কদমবাড়ি,মাদারীপুর।
মোহাম্মদ আব্বাস হোসেন, চরপোটকা, ভোলা।
আরিফুল ইসলাম, পাইকগাছা,খুলনা।
আহসান হাবিব রাজু, গুড়িয়াদহ, লালমনিরহাট।
মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।
মুহাম্মদ মাসুদুল হক মাশুক, চরফ্যাশন, ভোলা।
ফয়সাল আহমেদ সিপন, ঘোড়াদাইড়, গোপালগঞ্জ।
দীপক চক্রবর্তী, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।










