ভারতের দেওবন্দ: সন্ত্রাস দমন শাখা খোলা হবে, কিন্তু মুসলমানরা বলছে সিদ্ধান্ত 'অপমানজনক'

দারুল উলুম দেওবন্দ
ছবির ক্যাপশান, দারুল উলুম দেওবন্দ
Published

ভারতের যে শহরে বিশ্বখ্যাত ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র দারুল-উলুম রয়েছে, সেই দেওবন্দে উত্তরপ্রদেশের সন্ত্রাস দমন স্কোয়াডের একটি কেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার।

মুখ্যমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা শলভ মনি ত্রিপাঠি এই তথ্য টুইট করেছেন, যেখানে তিনি 'তালেবানি বর্বরতা' কথাটি ব্যবহার করেছেন।

তবে তালেবানের সাথে দেওবন্দের আদৌ কোন সম্পর্ক আছে কি না, সেটা তিনি ব্যাখ্যা করেন নি।

মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেনস্ পার্সোনেল ল বোর্ডের চেয়ারপার্সন এই সিদ্ধান্তকে দারুল উলুমের মতো একটা সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য 'অপমানজনক' বলে বর্ণনা করেছেন।

আরও পড়তে পারেন:

উত্তরপ্রদেশের সন্ত্রাস দমন শাখার এক সদস্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উত্তর প্রদেশের সন্ত্রাস দমন শাখার শাখা খোলা হবে দেওবন্দে

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মিডিয়া উপদেষ্টা শলভ মনি ত্রিপাঠির টুইটের শুরুটাই ছিল এরকম, "তালেবানি বর্বরতার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ থেকে একটি সংবাদ। দেওবন্দে কমান্ডো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যোগীজি।"

মি. আদিত্যনাথকে তার সমর্থকরা যোগীজি অথবা মহারাজজী বলে সম্বোধন করেন।

মি. ত্রিপাঠি জানিয়েছেন, "এই কেন্দ্রটি যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির মতো করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এই কমান্ডো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য সারা রাজ্য থেকে সন্ত্রাস দমন শাখা বা এ টি এসের বাছাই করা বেশ কিছু অফিসারকে নিয়ে আসা হবে।"

কমান্ডো পরিবৃত উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ওপর নজর রাখতেই দেওবন্দে সন্ত্রাস দমন শাখা খুলছে যোগী আদিত্যনাথ সরকার

কেন দেওবন্দে সন্ত্রাস দমন শাখা?

উত্তরপ্রদেশ বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠি বলছেন, "পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের এমন বেশ কিছু অঞ্চল আছে, যেখান থেকে সন্ত্রাসী কাজকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি অথবা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, এমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

"এই প্রেক্ষাপটে উত্তর প্রদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে দেওবন্দে সন্ত্রাস দমন শাখার একটি নতুন কেন্দ্র খোলা হবে," বলছিলেন রাকেশ ত্রিপাঠি।

তার মতে, এর ফলে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ওপরে নজর রাখা আর তথ্য পেলেই সেগুলিকে ব্যর্থ করার কাজে সুবিধা হবে।

দারুল উলুম এ নিয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চায় নি।

দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্ররা
ছবির ক্যাপশান, দারুল উলুম বলছে সন্ত্রাস দমন শাখা বা গোয়েন্দা দপ্তর খুললে তারা ইসলামি শিক্ষায় বেশি মন দিতে পারবে

তবে এই ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি সূত্র বলছে যত বেশী এ টি এস অথবা গোয়েন্দা দপ্তর খোলা হবে - ততই তারা সুরক্ষিত বোধ করবেন এবং তাদের যে মূল কাজ - অর্থাৎ ইসলামি শিক্ষাদান - তাতে মনোনিবেশ করতে পারবেন।

'তালেবান' 'দেওবন্দ' একই টুইটে কেন?

মুসলমান সমাজের একটা অংশ মনে করছে 'তালেবানি বর্বরতা' এবং 'দেওবন্দে এ টি এস কেন্দ্র খোলা' - এই দুটি শব্দ-বন্ধ একই টুইটে থাকার অর্থ নজরদারি হবে দারুল উলুমের ওপরেই।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেনস্ পার্সোনেল ল বোর্ডের চেয়ারপার্সন শাহিস্তা আম্বার মনে করেন দারুল উলুমের মতো একটা সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের কাছে এটা অপমানজনক।

মিসেস আম্বারের কথায়, "একটা সম্মানজনক সংস্থাকে অপমান করা হচ্ছে। কী কারণে ওখানে এ টি এস কেন্দ্র খোলা হচ্ছে?

''কারও ওপরে যদি সন্দেহ হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো সরকার নিতেই পারে - প্রমাণ যোগাড় করতে পারে।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেনস ল বোর্ডের প্রধান শাহিস্তা আম্বার
ছবির ক্যাপশান, শাহিস্তা আম্বার বলছেন, দারুল উলুমের মতো একটা সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের কাছে এটা অত্যন্ত ''অপমানজনক"

"এতদিনেও তো ওখানকার কারও বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ দিতে পারে নি সরকার! এটা এক অর্থে কারও স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ। এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় সিদ্ধান্ত," বলছিলেন শাহিস্তা আম্বার।

মুসলমানদের কি দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে?

তিনি আরও প্রশ্ন তুলছিলেন যে মুসলমানদের আর কত দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে?

"ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই, বিশেষত দেওবন্দিদের তেহরিক-এ-রেশমি রুমাল আন্দোলনের মাধ্যমেও কিছু কম আত্মত্যাগ করেন নি মুসলমানরা।

"তারা ঘোষণা করেছিল ব্রিটিশদের গোলামি তারা করবে না। ফাঁসিতে চড়তেও তারা রাজী ছিল - কিন্তু গোলামী সহ্য করবে না বলে দিয়েছিল।

''এখানে সবাই ভারতবাসী আর দেশ ভক্ত। আমাদের কাছে দেশভক্তির প্রমাণ যেন বারবার না চাওয়া হয়," জানাচ্ছিলেন শাহিস্তা আম্বার।

উত্তরপ্রদেশের সাহারাণপুরের দেওবন্দে দারুল উলুম
ছবির ক্যাপশান, দারুল উলুম গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন 'লাল রুমাল আন্দোলন'

১৯১৩ সাল থেকে ১৯২০ অবধি চলা তেহরিক-এ রেশমি রুমাল আন্দোলন শুরু করেন শায়খ উল হিন্দ মৌলানা মাহমুদ হাসান। সিল্কের রুমালে লিখে অন্য দেওবন্দি নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ রাখা হত ব্রিটিশ বিরোধী এই সশস্ত্র আন্দোলনের সময়ে।

হিন্দু ভোট একজোট করার চেষ্টা?

আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে।

ভোটের আগে যোগী আদিত্যনাথ সরকার সম্প্রতি বারে বারে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।

এই প্রেক্ষিতেই, ভোটের ঠিক আগে সবথেকে পরিচিত ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রের শহরে সন্ত্রাস দমন স্কোয়াডের দপ্তর খোলার মাধ্যমে যোগী আদিত্যনাথ একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

তারা বলছেন 'তালিবান', 'দেওবন্দ', 'সন্ত্রাস' ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত - এবং যোগী আদিত্যনাথ তা কড়া হাতে দমন করছেন।

এটা বিজেপির হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক আরও জোটবদ্ধ করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর