কোভিড আক্রান্ত পিতাকে বাঁচাতে একটি ভারতীয় পরিবারের লড়াই

অনুপ সাক্সেনা
ছবির ক্যাপশান, অনুপ সাক্সেনা
    • Author, বিকাশ পাণ্ডে
    • Role, বিবিসি নিউজ, দিল্লি
  • Published

লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের মতই ৫৯ বছর বয়স্ক অনুপ সাক্সেনাও এপ্রিল মাসের শেষ দিকে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

এক পর্যায়ে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে তাকে হাসপাতালে পাঠানো জরুরি হয়ে পড়লো।

তিনি থাকতেন ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদ শহরে।

কিন্তু হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। মে মাসের প্রথম দিক নাগাদ হাসপাতালে বেড আর অক্সিজেনের সংকট চরমে ওঠে, যদিও রাজ্যের কর্মকর্তারা বলছেন, বেড বা অক্সিজেনের কোন স্বল্পতা নেই।

এর পরের কয়েকদিনে সাক্সেনা পরিবারের ক্ষেত্রে যা ঘটলো - তাকে বলা যায় ভারতে একেকটি কোভিড আক্রান্ত পরিবারের সহায়তা পাবার জন্য যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে হচ্ছে তার একটি উদাহরণ। সারা ভারত জুড়ে হাজার হাজার পরিবারের বেলায়ও ঠিক এটাই ঘটছে।

সাক্সেনা পরিবারকে কিসের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে - তা এখানে তুলে ধরা হলো।

বৃহস্পতিবার ২৯ এপ্রিল

গাজিয়াবাদের একটি কোভিড টেস্ট সেন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গাজিয়াবাদের একটি কোভিড টেস্ট সেন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন

সেদিনই অনুপ সাক্সেনার উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর দেখা দিল। ডাক্তার তাকে বললেন কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে। সাক্সেনা পরিবার বাড়ি থেকে নমুনা নিয়ে যাবে এমন আশায় ল্যাবের সাথে যোগাযোগ করলো। কিন্তু কোন ল্যাবই রাজি হলো না। তারা বললো, - এই সেবা দেবার মত লোকবল তাদের নেই।

অনুপ সাক্সেনাকে এর পর তার পরিবার নিয়ে গেল একটি সরকারি হাসপাতালে।

সেখানে দেখা গেল বিরাট লম্বা লাইন। অনুপ সাক্সেনার ছেলে তুষার চাইছিলেন কোনভাবে লাইন এড়ানো যায় কিনা । কিন্তু তার আগে যারা লাইনে ছিলেন তারা সবাই গুরুতর অসুস্থ।

দু ঘন্টা পর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ই অনুপ অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

তার পরিবার সিদ্ধান্ত নিল, তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

রোববার ১লা মে

সকাল ১০টা: শ্বাসকষ্ট

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

অনুপ শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার পরিবারকে বললেন, তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তার পরিবার একটা নেবুলাইজারের ব্যবস্থা করলো।

এটা একটা ছোট যন্ত্র - যার মাধ্যমে রোগীদের শ্বাসনালী খোলা রাখার জন্য একটা ওষুধ গলার ভেতরে স্প্রে করা যায়।

কিছু সময়ের জন্য এতে কাজ হলো।

কিন্তু সাক্সেনার শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ ক্রমাগত কমতে লাগলো।

তখন সকাল ১০টা। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন, অনুপকে হাসপাতালে ভর্তি করতে।

তার পরিবার একটি এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে লাগলো।

কিন্তু কোন এ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেল না । তাদের পরিবারের কোন গাড়িও নেই। তাদের এক সম্পর্কীয় ভাই থাকতেন পার্শ্ববর্তী হাপুর জেলায় - গাজিয়াবাদ থেকে ১৭ মাইল দূরে। সেই ভাইকে বলা হলো তার গাড়ি নিয়ে গাজিয়াবাদে আসতে।

তিনি আকাশ নগরে অনুপের বাড়িতে পৌছালেন দুপুর দুটো নাগাদ। কিন্তু তখনও হাসপাতালের কোন বেড পাওয়া যায়নি।

যখন বিকেল চারটা বেজে গেল, তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি গুরুদুয়ারা বা শিখ মন্দিরে যেখানে বিনামূল্যে বিপদাপন্ন পরিবারগুলোকে অক্সিজেন সেবা দেয়া হচ্ছে। এটির নাম গুরুদুয়ারা শ্রী গুরু সিং সভা। এখানে অনুপকে একটি সিলিণ্ডার থেকে অক্সিজেন দেয়া হলো।

Short presentational grey line

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা: হাসপাতালে একটি বেডের খোঁজে

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

গুরুদুয়ারাতে অক্সিজেন দেবার পর অনুপের দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ স্থিতিশীল অবস্থায় এলো। কিন্তু সেখানকার স্বেচ্ছাসেবকরা বললেন, তারা কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাখতে পারবেন না - তাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

তুষার তাদের কাছে অনুরোধ করতে লাগলেন, তার বাবাকে মন্দিরে রাখার জন্য। কিন্তু মনে মনে তিনি ঠিকই বুঝতে পারছিলেন যে তাকে কোন একটা হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা করতেই হবে।

অনুপকে তখন রাষ্ট্রীয়- মালিকানাধীন এমএমজি হাসপাতালে নিয়ে গেল তার পরিবার।

সেখানে এক ঘন্টা বসে থাকার পর স্পষ্ট হয়ে গেল যে - খুব শিগগীর এখানে কোন বেড পাওয়া যাবে না।

Short presentational grey line
সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

রাত ৮টা: অক্সিজেনের সন্ধান

রাত যখন আটটা বেজেছে, সাক্সেনা পরিবার তখনো এমএমজি হাসপাতালে। তুষার বাড়িতে থাকা তার ভাইকে ফোন করলেন। বললেন, লাল কুয়াঁ এলাকায় একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট আছে - সেখানে গিয়ে একটা সিলিণ্ডারের খোঁজ করতে।

তার ভাই সেখানে গিয়ে দেখলেন, সেখানেও দীর্ঘ লাইন। তিনি লাইনে দাঁড়ালেন, অপেক্ষা করতে লাগলেন তার পালা আসার।

তার কাছে হাসপাতাল থেকে কয়েক মিনিট পর পর তুষারের ফোন আসতে লাগলো। তুষারের মনে হচ্ছিল, একটা অক্সিজেন সিলিণ্ডার বা হাসপাতালের বেড- এ দুটোর কোন একটা পাওয়া না গেলে তার বাবার পক্ষে রাত পার করাও সম্ভব হবে না।

Short presentational grey line

রাত ৮:৩০: হাসপাতালের আশা ছেড়ে দিলো পরিবার

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

তুষার তার বাবাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। তার পর বেরুলেন ২৫টি ছোট অক্সিজেন ক্যান কিনতে -যাতে অনুপকে শ্বাস নিতে সাহায্য করা যায়।

এই ক্যানগুলো তাকে নিয়মিত .বিরতিতে অল্প পরিমাণ অক্সিজেন দিতে পারবে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবে না। এক একটি ক্যানের দাম ২,৫০০ রুপি - যদিও সাধারণ সময়ে এর দাম ১,০০০ রুপিরও কম।

সাক্সেনাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা অনেক টাকা কিন্তু এখন তাদের এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

তুষার সেই ক্যানের অক্সিজেন দিয়ে তার বাবার অবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করতে লাগলেন, আর অপেক্ষা করতে লাগলেন তার ভাইয়ের জন্য - কখন সে একটা সিলিণ্ডার নিয়ে বাড়ি পৌঁছাবে।

রাত একটায় তার ভাই ফিরে এলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই।

কারণ লাইন এত দীর্ঘ ছিল যে তার পালা আসার আগেই দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

উপায়ান্তর না দেখে তারা অনুপকে ক্যান থেকেই অক্সিজেন দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তার অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়ে এলো।

রোববার ২ মে

সকাল ১০টা : হাসপাতাল বেডের সন্ধান আবার শুরু হলো

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

ডাক্তার আবার বললেন, অনুপকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

অনুপকে এবার গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হলো গার্গী হাসপাতালে - তাদের বাড়ির সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল।

হাসপাতালের একজন কর্মী জানালেন, এখানে কোন বেড খালি নেই , অনুপকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

Short presentational grey line
সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

তার পরিবার তখন তাকে সর্বোদিয়া নামে আরেকটি হাসপাতালে নিয়ে গেল।

কিন্তু সেখানেও কোন বেড খালি নেই।

এর মধ্যে অনুপ সাক্সেনার আবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে, এবং তিনি চাইছেন তাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হোক।

কিন্তু তার পরিবার এখনই হাল ছাড়তে রাজি নয়।

Short presentational grey line
সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

দুপুর বারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে তারা পৌঁছালেন সন্তোষ হাসপাতালে।

এ নিয়ে সকাল থেকে তার তিনটি হাসপাতালে বেড পাবার চেষ্ট করে ফেলেছেন।

এখানে সাক্সেনা পরিবারকে বলা হলো বাইরে অপেক্ষা করতে।

সন্তোষ হাসপাতালের সদর দরজা ঘিরে আছে নিরাপত্তা প্রহরী। মনে হচ্ছিল - যেন একটা জেলখানা।

এখানে তারা ১০ মিনিট অপেক্ষা করলেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন - আরেকটি হাসপাতালে গিয়ে চেষ্টা করা হোক।

তুষার তখন ভাবছেন, কোন হাসপাতালে গিয়ে তার বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। কিন্তু যখন তার মা বাড়ি থেকে ফোন করছেন, তাকে তিনি বললেন, তারা হাসপাতালে একটি বেড পেয়ে গিয়েছেন এবং সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

Short presentational grey line
সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

চতুর্থ হাসপাতালে তারা পৌঁছালেন দুপুর ১২:৩০ মিনিটে।

বাইরে প্রহরারত রক্ষী বললো, যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন রোগী ছাড়া পাচ্ছে, বা মারা যাচ্ছে - ততক্ষণ অনুপকে অপেক্ষা করতে হবে।

তুষার বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তার বাবার হাসপাতালে একটা বেড পাওয়া নির্ভর করছে অন্য আরেকজনের মারা যাবার ওপর।

এর মধ্যে আবার শুরু হলো অনুপের শ্বাসকষ্ট। অক্সিজেনের ছোট ক্যানে আর কাজ হচ্ছে না।

Short presentational grey line

আবার সহায়তা মিললো মন্দিরে

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

তার অবস্থা ক্রমান্বয়ে আরো খারাপ হচ্ছে দেখতে পেয়ে পরিবার ঠিক করলো, আর সময় নষ্ট করার দরকার নেই। তাকে গুরুদুয়ারায় নিয়ে যাওয়া হবে - এ পর্যন্ত একমাত্র জায়গা যেখানে তারা কিছু সাহায্য পেয়েছেন।

গুরুদুয়ারাতে নিয়ে অনুপকে একটা সিলিণ্ডার থেকে অক্সিজেন দেয়া হলো। এবং তার দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কিছু বাড়তে শুরু করলো।

Short presentational grey line

অক্সিজেনের সন্ধান চলছেই

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

তুষার যখন তার বাবাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেকটায় ছুটছেন - তখন তার ভাইকে বলা হয়েছিল স্থানীয়ভাবে একটা অক্সিজেনের সিলিণ্ডার কিনতে।

কিন্তু গাজিয়াবাদে দেখা গেল সব জায়গাতেই বিরাট লম্বা লাইন।

একজন তাকে বললো, নিকটবর্তী বুলন্দশাহর জেলায় একটি প্ল্যান্ট আছে, তারা অক্সিজেন বিক্রি করছে। সেটা এক ঘন্টা দূরের পথ। তুষারের ভাই সেখানে যাবার জন্য রওনা দিলেন। কিন্তু তিনি যখন পৌঁছালেন ততক্ষণে সেই প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি আবার গাজিয়াবাদে ফিরে এলেন। তার পর কালোবাজার থেকে একটা ছোট পাঁচ লিটারের অক্সিজেন সিলিণ্ডার কিনলেন।

Short presentational grey line

বিকেল ৫:৩০ - গাড়িতে শেষ যাত্রা

সাক্সেনা পরিবারের যাত্রা

ডাক্তার যখন অনুপকে হাসপাতালে নিতে বলেছিলেন, তার পর প্রায় আট ঘন্টা পার হয়ে গেছে। অনুপ এখনো গুরুদুয়ারাতে।

তার মেয়ে থাকেন ৭৫ মাইল দূরে আলিগড় শহরে। তিনি খবর দিলেন - একটা প্রাইভেট হাসপাতালে একটা খালি বেডের সন্ধান পাওয়া গেছে, অনুপকে যেন এখনি সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

অনুপকে নিয়ে গাড়িতে যাত্রা শুরু হলো সন্ধ্যা ৬টার দিকে। অনুপকে তখন সেই ছোট অক্সিজেন সিলিণ্ডার দিয়ে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে।

তারা আলিগড়ের হাসপাতালে পৌঁছালেন রাত সাড়ে আটটার দিকে। তক্ষুণি অনুপকে ইনটেনসিভ কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হলো।

সেখানে কর্মরত ডাক্তার বললেন, অনুপের অবস্থা সংকটজনক, তার বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

সোমবার ৩ মে

ভোর ৪টা: অনুপ হেরে গেলেন

হাসপাতালে নেবার পর সাক্সেনা পরিবার আশা করতে লাগলেন - এবার যদি একটা যাদুকরী কিছু ঘটে যায়।

কিন্তু আট ঘণ্টা পর ডাক্তার বললেন, অনুপের পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।

তুষারের মনে হলো, এর চেয়ে বেশি আর কিইবা তিনি করতে পারতেন।

আরো ৬ ঘন্টা পর সকাল ১০টায় ডাক্তার সাক্সেনা পরিবারকে বললেন অনুপকে শেষ বিদায় জানাতে।

এক ঘন্টা পর- সকাল ১১টায় অনুপ মারা গেলেন।

তুষার বলছেন, তিনি চান আর কাউকে যেন এ দৃশ্য দেখতে না হয় যে তার বাবা বা মা ডাঙায় তোলা মাছের মত শ্বাস নেবার জন্য ছটফট করছেন।

তার মতে, কোভিড নয় বরং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তার বাবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

কিন্তু তাদের হাতে এখন শোক করারও সময় নেই। কারণ অনুপের স্ত্রীর অবস্থাও ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।

তাদের আবার গাজিয়াবাদে ফিরতে হবে।

ম্যাপ তৈরি করেছেন: পল সার্জেন্ট, লিলি হুইন, জেরি ফ্লেচার, ও জয় রক্সাস।