যেসব ঘটনায় আলোচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

নানা ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/ShaheAlamBnp

ছবির ক্যাপশান, সম্প্রতি একাধিক ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বেশ কিছু ঘটনায় সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন।

মূলত নিজের এলাকা বগুড়ায় দুটি উপজেলার তিনটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার শিকার হন মীর শাহে আলম।

আবার ওই বিতর্কের মধ্যেই নিজ এলাকায় স্কুলের নাম প্রতিমন্ত্রীর নামে করতে স্কুল কমিটির প্রস্তাব এবং একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায়ও বিতর্কের মুখে পড়েছেন তিনি।

সম্প্রতি তার এলাকায় নতুন তিন ইউনিয়নের একটির নাম 'মীরবাড়ী ইউনিয়ন' এবং অপর দুটির নাম 'সীমান্ত ইউনিয়ন' ও 'দিগন্ত ইউনিয়ন' করা হলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদেও তুলে ধরেছেন একজন এমপি।

বিশেষ করে, দুটি ইউনিয়ন তার দুই সন্তানের নামে রেখেছেন এমন অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি তিনি নিজে প্রত্যাখ্যান করলেও বিতর্কের কারণে শেষ পর্যন্ত দুই ইউনিয়নের নাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক একটি চিঠি আজই জেলা প্রশাসনের হাতে এসে পৌঁছাবে।

মীর শাহে আলম বগুড়া-২ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি এবং সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী। সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে ও পরে প্রেস রিলিজ দিয়ে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সংবাদ মাধ্যমে তিনি কোনো কথা বলবেন না বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন তার দফতরের একজন কর্মকর্তা।

এদিকে, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও অভিলাষ চরিতার্থ করার দায়ে সরকারের কাছ থেকে শাস্তি পাওয়ার নজির নেই বলেই বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

মীর শাহে আলম

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/ShaheAlamBnp

ছবির ক্যাপশান, বগুড়া-২ আসন থেকে এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন মীর শাহে আলম

ইউনিয়নের নাম, প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকায় নতুন দুটি ইউনিয়নের নাম তার দুই ছেলের নামে করার অভিযোগ গত ১৫ই জুন জাতীয় সংসদে তুলেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

মি. মাসুদ বলেন, "স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এলাকার দুটি উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন হয়েছে। সেখানে ওনার পরিবার বা মীর বংশের নামে একটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে। ওনার দুই সন্তানের নামে দুইটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে"।

পরে ওইদিনই সংসদে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিয়ে প্রতিমন্ত্রী মি. আলম দাবি করেন, নতুন ইউনিয়নের নামের সাথে তার সন্তানদের নাম 'মির‍াক্যালি' মিলে গেছে।

তিনি বলেন, "স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই বাছাই করে গণশুনানি করে সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলা সীমান্তে, সেই কারণে সৈয়দপুরের সাথে নাম মিল করে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করেছে সীমান্ত ইউনিয়ন"।

তিনি আরো বলেন, "আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। যেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে দিগন্ত ইউনিয়ন"।

"মিরাক্যালি আমার সন্তানদের নামের সাথে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকতো সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার, তাহলে তো আমি প্রশাসনকে বলতাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত রাখার। কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে তো মীর নাই," বলেছেন মি. আলম।

কিন্তু এ ব্যাখ্যার পরেও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেও নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি দলের জন্য 'বিব্রতকর' হয়ে উঠছিল বলেও বিবিসি বাংলাকে বলেছেন দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য। তিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই এই ইউনিয়ন দুটির নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।

"যেহেতু নাম নিয়ে বিতর্ক হয়েছে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী নাম পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন আইন অনুযায়ী নতুন করে গণশুনানি করে সবার মতামত নিয়ে উপজেলা প্রশাসন নতুন নাম ঠিক করে জেলা প্রশাসনকে জানানোর পদক্ষেপ নেবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিতর্কের কারণে ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক

সাংবাদিক কারাগারে, প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

এদিকে, প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার পর স্থানীয় একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের নামে মামলা করেছেন স্থানীয় আরেকজন সাংবাদিক এবং তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে।

এই মামলায় স্থানীয় মোট ছয়জন সাংবাদিককে আসামি করার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

এই ঘটনা নিয়ে সমলোচনা তৈরি হলে শুক্রবার রাতেই প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, এ ধরনের মামলার বিষয়ে তার কোনো অনুমোদন বা নির্দেশনা নেই।

ওই বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বা তার পক্ষে দাবি করে কেউ যেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো মামলা, বিবৃতি বা অন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন। এ ধরনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর কোনো অনুমোদন বা নির্দেশনা নেই"।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ

সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার একটি স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রায় ৫০ বছরের পুরনো একটি স্কুলের নাম পরিবর্তন করে প্রতিমন্ত্রীর নামে নামকরণে প্রস্তাব করলে- এটিও নতুন বিতর্ক তৈরি করে।

তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বগুড়ার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী তার নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন।

ওই চিঠিতে তিনি তার নামে থাকা দশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে বলেন, "এর বাইরে তার বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যেন গ্রহণ বা অনুমোদন না করা হয়"।

অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে একের পর এক বিতর্ক দলের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলের নেতারা কেউ কেউ মনে করেন, এটি দল ও সরকারকে বিব্রত করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, এটি আবারো প্রমাণ করেছে যে সরকারি দলের এমপিরা চাইলে নিজের এলাকায় "যা খুশি তাই করতে পারেন"।

"ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার চেষ্টার কারণে সরকারের কাছ থেকে শাস্তি পাওয়ার উদাহরণ তো খুব একটা দেখা যায় না এদেশে। সে কারণে এগুলো ঘটতেই থাকে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।