প্রিন্স ফিলিপ: বিবিসি কেন এত ব্যাপকভাবে রাজপরিবারের মৃত্যুর সংবাদ কভার করে?

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসির ওয়েবসাইটে এবং নিউজ বুলেটিন জুড়ে আজ একটি মাত্র খবরই প্রাধান্য পাচ্ছে - সেটি হল প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যুর খবর। খুবই গভীরভাবে তার জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হচ্ছে খবরে। হালকা মেজাজের কোন খবর শোনাও যাচ্ছে না বা কোথাও ছাপানোও হচ্ছে না চটুল ধরনের কোন সংবাদ।
সংবাদপাঠ করছেন যারা তাদের কণ্ঠেও একটা ভাবগম্ভীর শোকের ছায়া স্পষ্ট।
এর কারণ হল ব্রিটিশ রাজপরিবারের একজন শীর্ষ সদস্যের প্রয়াণ। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের যে চারজন সদস্য মারা গেলে খবর প্রচারের ধারা পুরো বদলে যায় বিবিসিতে, তাদের একজন হলেন প্রিন্স ফিলিপ, ডিউক অফ এডিনবারা।
এই পর্যায়ভুক্ত রাজ পরিবারের বাকি তিনজন হলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, তার ছেলে এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস (প্রিন্স অফ ওয়েলস) এবং প্রিন্স চার্লসের ছেলে -সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম (ডিউক অফ কেম্ব্রিজ)।
হয়ত অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, অন্যান্য সংবাদ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিবিসি এধরনের মৃত্যুর খবরকে কেন এত সিরিয়াসলি নেয়, কেন এত গুরুত্ব দিয়ে এদের মৃত্যুর খবর প্রচার করে?
বিবিসির জন্য রাজপরিবারের এই সদস্যদের মৃত্যু কেন এত বিশাল একটা ব্যাপার?

ছবির উৎস, Getty Images
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটেনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সিংহাসনের আসীন রাজ পরিবারের সদস্য। তিনি সিংহাসনে আছেন ৬৯ বছর ধরে। তিনি যুক্তরাজ্য এবং আরও ১৫টি দেশের রাষ্ট্র প্রধান।
তিনি কমনওয়েলথেরও প্রধান। ৫৪টি স্বাধীন দেশ রয়েছে এই কমনওয়েলথ গোষ্ঠীতে। এই দেশগুলোর বেশিরভাগই ছিল সাবেক ব্রিটিশ শাসনাধীন। ব্রিটিশ জনগণ এবং ব্রিটেনের বাইরেও বহু দেশের মানুষের কাছে রানির গুরুত্ব অপরিসীম।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের একজন সদস্য মারা গেলে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলো সেদিকে বড়ভাবে নজর রাখে। তাই বিবিসির একটা চেষ্টা থাকে রাজ পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর সংবাদ যথাযথ ও সঠিকভাবে প্রচার করার। আর পেছনে একটা কারণও রয়েছে।
বিবিসির অর্থায়ন ব্রিটিশ সরকারের তহবিল থেকে আসে না। ব্রিটেনের জনগণ লাইসেন্স ফি হিসাবে যে করের অর্থ প্রদান করে তার থেকেই বিবিসির অর্থায়ন হয়। এভাবে অর্থ তহবিল পাওয়ার কারণে বিবিসি তার সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে।
ব্রিটিশ জনগণ যারা বিবিসির অনুষ্ঠান দেখার জন্য লাইসেন্স ফি দিচ্ছেন তারা চান তাদের সেই লাইসেন্সের মূল্যায়ন প্রতিফলিত হবে বিবিসির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। রাজ পরিবারের প্রতি ব্রিটেনের জনগণের আগ্রহ বহু বছর ধরে একইরকম রয়েছে।
যখন রানি এলিজাবেথের মা - যিনি মানুষের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন রানি মাতা বা কুইন মাদার হিসাবে, তিনি মারা যান ২০০২ সালে, তখন প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনস্টারে শায়িত তাঁর মরদেহে তিন দিন ধরে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল এক লক্ষাধিক মানুষ।
তাঁর কফিন নিয়ে উইন্ডসর পর্যন্ত অন্ত্যেষ্টি শোভাযাত্রার পথে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আনুমানিক ১০ লক্ষের বেশি মানুষ। টিভিতে তাঁর শেষ যাত্রার অনুষ্ঠান দেখেছিলেন এক কোটি মানুষ। রানি মাতাকে সমাহিত করা হয় উইন্ডসরে। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোও বিস্তারিতভাবে তাঁর অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠান প্রচার করেছিল।
আরও পড়তে পারেন:
ব্রিটিশ রাজ পরিবারের খবর নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদ মাধ্যম সাধারণভাবে আগ্রহী এবং দেখা গেছে ব্রিটিশ রাজ পরিবারে বড় কোন খবর হলে তা বিশ্ব জুড়ে ১০০ কোটির বেশি দর্শক আকৃষ্ট করে।
"ব্রিটিশ রাজ পরিবারের খবর যেভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে, অনেক সময় অনেক তারকার খবরও সেভাবে গুরুত্ব পায় না," বলছেন বিবিসির রাজ পরিবার বিষয়ক সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড। "এর কারণ নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। অনেকে এখনও রাজ পরিবারের জীবনকে রূপকথার গল্পের মত মনে করেন এবং সেগুলো উপভোগ করেন, যদিও তারা মনের ভেতরে জানেন যে আধুনিক দুনিয়ায় তাদের রূপকথার জীবন নিতান্তই অবাস্তব।"
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসও রাজ পরিবারে এধরনের বড় খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে।
"ব্রিটিশ রাজপরিবারের শীর্ষ সদস্যদের মৃত্যুর খবরে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ রয়েছে। বিশ্ব ব্যাপী আমাদের কোটি কোটি শ্রোতা, দর্শক, ও পাঠক এধরনের মৃত্যুর পর সার্বিক খবরাখবর জানতে আমাদের ওপরেই নির্ভর করেন," বলছেন ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বিভিন্ন ভাষা বিভাগের নিউজ কন্ট্রোলার তারিক কাফালা।

রাজপরিবারের ঊর্ধ্বতন সদস্যের মৃত্যু বিবিসি কীভাবে রিপোর্ট করে?


বিবিসির শ্রোতা দর্শকরা হয়ত এই খবর অন্য সংবাদ মাধ্যমে দেখবেন বিবিসি খবর দেবার আগেই। কারণ বিবিসি এধরনের খবর সবার আগে দেবার জন্য তাড়াহুড়ো করে না, বিবিসি তার সংবাদ প্রচারে কোনরকম ভুলভ্রান্তি এড়াতে খবর নিশ্চিত করার জন্য সময় নেয়।
বিবিসির ঘোষণা অনেকটা সরকারি ঘোষণার মত মনে হতে পারে। অন্যান্য সংবাদ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিবিসির খবরের ধরনও আলাদা থাকে। গুরুগম্ভীর ও সংযত। বিবিসি মৃত্যুর ঘোষণার পর কিছুক্ষণ পর্যন্ত অন্যান্য খবর প্রচারে বিরত থাকে এবং হালকা ও চটুল ধরনের খবর বিবিসির ওয়েবসাইটে থাকলে তা সরিয়েও নেয়।
রেডিও এবং টিভিতেও হালকা ধরনের খবর প্রচারে বিরত থাকে এবং বিবিসির সব বিভাগেই এটিকে শীর্ষ সংবাদ হিসাবে রাখা হয়।

কিন্তু প্রিন্স ফিলিপকে এই কাতারে কেন ফেলা হয়?

ছবির উৎস, AFP/Getty Images
প্রিন্স ফিলিপ কখনওই ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। রানির পর সিংহাসন পাবেন প্রিন্স চার্লস। প্রিন্স ফিলিপের কখনও রাজা উপাধিও ছিল না।
কারণ ব্রিটেনে রাজাকে যিনি বিয়ে করেন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে 'রানি' উপাধি ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু রানি যাকে বিয়ে করেন তিনি কখনও 'রাজা' উপাধি ব্যবহার করতে পারেন না। 'রাজা' উপাধি একমাত্র সিংহাসনে আসীন পুরুষ উত্তরাধিকারের জন্য।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২০শে নভেম্বর রানি এলিজাবেথকে বিয়ে করার পর থেকে প্রিন্স ফিলিপ রানির সার্বক্ষণিক সহচর থেকেছেন। ব্রিটিশ রাজপরিবারে কোন রাজদম্পতির এত দীর্ঘ বিবাহিত জীবন কাটানোর ইতিহাস নেই। প্রিন্স ফিলিপের মূল দায়িত্ব ছিল রানিকে সহযোগিতা করা।
রানি ও প্রিন্স ফিলিপ এমনই জুটি হয়ে উঠেছিলেন যে রানি তার প্রতিটি ভাষণ শুরু করতেন এই বলে "আমার স্বামী এবং আমি..."।
"তিনি এত বছর ধরে আমার জন্য এককথায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থেকেছেন," তাদের সুবর্ণ জয়ন্তীতে রানি বলেছিলেন, "এবং আমি ও আমার পরিবার, সেই সাথে এই দেশ এবং আরও বহু দেশ তাঁর কাছে অনেক বেশি ঋণী, যে ঋণ তিনি কখনও দাবি করেননি, আর কেউ কখনও জানবেও না এর পরিমাপ কতটা।"
বিবিসির জনি ডায়মন্ড বলেছন, "ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ব্যাপ্তি প্রকৃত অর্থে বিশ্বব্যাপী। তিনি রানির পাশে পাশে, অনেক সময় একাই রাজ পরিবারের প্রতিনিধি হিসাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
"তিনি সত্যিকার অর্থেই বিশ্ব মঞ্চে একজন তারকা"








