এডিটার'স মেইলবক্স: বাক স্বাধীনতা, জিয়ার খেতাব আর ভ্যাক্সিন নিয়ে প্রশ্ন

ছবির উৎস, EPA/Monirul Alam
- Author, সাবির মুস্তাফা
- Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
সম্প্রতি ঢাকার একটি আদালতে লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায় হবার পর, অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, এই রায়ের মাধ্যমে কি বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা এবং বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্র শক্তিশালী হবে?
সে বিষয়ে দু'একটি চিঠি দিয়ে আজ শুরু করছি। প্রথমে লিখেছেন রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে মুশফিকুর রহমান ওলিউল্লাহ:
''দীর্ঘ ছয় বছর পর জঙ্গি হামলায় নিহত ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় হয়েছে । ব্লগার ও লেখকদের জন্য এ রায় অবশ্যই সন্তোষজনক । কোনো ব্লগার বা লেখকের কোনো লেখা যদি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত । আবার আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া মারাত্মক অপরাধ । আসলে ব্লগার ও লেখকসহ প্রতিটি নাগরিকেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা যেমন উচিত, তেমনি কারো ধর্মানুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে সে কথাও মাথায় রাখতে হবে।''
আপনার সাথে অনেকেই একমত হবেন মি. ওলিউল্লাহ, যে প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে আপনি সেখানে একটি কিন্তু ব্যবহার করেছেন যেটা আমার মতে অনেক সমস্যার জন্য দায়ী। কারণ, এই কিন্তুকে ব্যবহার করেই এই হত্যাকাণ্ড গুলো ঘটানো হয়।

ছবির উৎস, wildpixel
এ বিষয়ে আরো লিখেছেন ঢাকার ধানমন্ডি থেকে শামীম উদ্দিন শ্যামল:
''বাংলাদেশে লেখক-প্রকাশকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ কতটা? এই শিরোনামে বিবিসি প্রবাহ টিভির অনুষ্ঠানটি দেখলাম। অনুষ্ঠানটির আমন্ত্রিত আলোচকের কথাগুলো ভাল লাগলো। আলোচকের মতো আমারও মন্তব্য, বাংলাদেশে শুধু ব্লগার, মুক্তমনা লেখক কিংবা নাস্তিকদের হত্যা না হয় জঙ্গিরা করলো, কিন্তু স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনের জন্য কিংবা সরকারি দলের অন্যায় অন্যায্য কাজে বাধা দানকারী ব্যক্তিদেরও তো হত্যা করা হচ্ছে।
''বাংলাদেশে যখন যে সরকার এসেছে সবাই এই কাজটি করেছে বলেই আমরা এখনো মুক্ত মত প্রকাশে স্বাধীন নির্ভীক হতে পারিনি। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভয়-আতঙ্কের জায়গায় থেকে গেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আরো ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে।''
এ'কথা ঠিক, দেশের সরকার যদি ব্যক্তি এবং বাক স্বাধীনতা রক্ষার করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে বিভিন্ন অজুহাতে মানুষের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ, কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর সুনাম ক্ষুণ্ণ ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে যদি আপনি নাগরিকের বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে উগ্রবাদীরা সেই কারণ দেখিয়েই হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

ছবির উৎস, Reuters
এবারে করোনা ভাইরাসের টিকা নিয়ে কয়েকটি চিঠি, প্রথমে লিখেছেন সাভার সরকারি কলেজ থেকে মনিরুল হক রনি:
''সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর্মী বা নার্সদের টিকা গ্রহণের যে সুযোগ দিয়েছেন, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অসাধু চক্রর স্বাস্থ্যকর্মী সেজে ভুয়া নিবন্ধন করে টিকা নেয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। আবার টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের সংবাদ আমাদেরকে যেমন ব্যথিত করে, তেমনি যারা টিকা নিতে আগ্রহী অথচ বয়সসীমার কারণে নিতে পারছে না, তাদের বিষয়টিও আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে।
''আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শহরের নিম্নবিত্তদের ও গ্রামের মানুষদের টিকা গ্রহণ ও নিবন্ধন করা থেকে পিছিয়ে থাকার ব্যাপারটা আমাদের কাছে শুভকর নয়। পুরো ব্যাপারটির মধ্যে সরকারের সমন্বয়হীনতা ও প্রচার প্রচারণার ঘাটতি আছে বলে মনে হয়।''
আপনি যে অভিযোগগুলোর কথা বলছেন মি. হক, তার অর্ধেকও যদি সত্য হয় তাহলে তো সরকারের নিশ্চয়ই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত। তবে সরকারের উচিত হবে, যারা সব চেয়ে ঝুঁকির মুখে আছেন, তাদের প্রথমে টিকা দেয়া। কার আগ্রহ বেশি সেটা বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। বয়স, অন্যান্য রোগের ঝুঁকি, পেশার ধরণ ইত্যাদি বিবেচনা করেই টিকা দেয়া উচিত।
পরের চিঠি লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:
''করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও এক দফা ছুটি বাড়ানো হয়েছে। অন্য দিকে এই মুহূর্তে চল্লিশ বছর বয়সের কম কোনো নাগরিক যেহেতু করোনা ভ্যাক্সিন পাচ্ছেন না, তাই শিক্ষার্থীরাও এখনই ভ্যাক্সিন পাচ্ছেন না। তাহলে ছুটি কি আরও বাড়বে, এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। আমার মনে হয়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের করোনার ভ্যাক্সিন দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিৎ।''
বিষয়টি ভিন্ন ভাবে দেখা যায় মি. সরদার। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কম এবং আক্রান্ত হলেও তাদের ওপর ভাইরাসের প্রভাব খুব কঠোর হয় না। সেজন্য ভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে কোন দেশেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না। সরকারের ভয় হচ্ছে, স্কুল-কলেজ খুলে দিলে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সংক্রমণ হবে এবং তারা বাসায় ফিরে বাবা-মা বা দাদা-দাদী, নানা-নানীকে সংক্রমিত করবে। ভয়টা সেখানেই।

ছবির উৎস, SOPA Images/Getty
আরো লিখেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকামে মাহমুদ চৌধুরী:
''বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা নেয়ার পরেও যেখানে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, সেখানে টিকার কার্যকারিতা কতটুকু, সে বিষয়ে কিন্তু প্রশ্নই রয়েই যায়। টিকা নেয়ার পরেও যদি হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্ক থেকে মুক্তি না মেলে তাহলে টিকা নেয়ার বিষয়টা ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত হতে পারে?
''তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে, টিকা নেয়ার পরেও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে নতুন করে আবার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে? তাছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে টিকা নেয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রতিনিয়ত যেখানে খবর প্রচার করা হচ্ছে, সেখানে বিবিসির বাংলার কাছ থেকে অনুসন্ধানী কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না যা খুবই হতাশাজনক।''
টিকা নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতেই পারে মি. চৌধুরী, তবে বেশির ভাগ মানুষের সেটা হয় না। শুধু টিকা না, অনেক এ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও সেটা হয়। এটা অস্বাভাবিক বা গোপন কিছু না। তবে টিকা নেবার পরে মাস্ক পরার উপদেশ সব দেশেই, সব টিকার ক্ষেত্রেই দেয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা নিশ্চিত যে টিকা নেবার পর মানুষ অসুস্থ হবে না, কিন্তু তার কাছ থেকে যে অন্য কেউ সংক্রমিত হবে না, সেটা এখনো নিশ্চিত না। টিকা নেবার পর মাস্ক পরার উপদেশ দেয়া হচ্ছে মূলত অন্যদেরকে রক্ষা করার জন্য।
এবার চলতি খবরের বাইরের একটি বিষয় নিয়ে চিঠি, লিখেছেন রংপুরের কাউনিয়া থেকে বিলকিস আক্তার:
''বর্তমান সময়ে আমরা নারীরা আরও বেশি উজ্জ্বল। দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদের স্পিকার এখন মহিলা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নারীরাও রয়েছেন। বহু এনজিও এবং ব্যবসায়ী এখন নারী। তারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছেন। কিন্তু এত অর্জনের পরও আমাকে দুটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতেই হচ্ছে।
''প্রথমত, নারী শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপ ভাবে বাড়েনি। আমি গ্রামের মেয়ে, সে উপলব্ধি থেকেই বলতে পারি, গ্রামাঞ্চলের অবস্থা বেশ নাজুক। দ্বিতীয়ত, নারী নির্যাতন হয়ে উঠছে নানামুখী। কখনো যৌতুকজনিত নির্যাতন, কখনো ফতোয়াজনিত নির্যাতন, কখনো সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতন। এগুলো বন্ধ করার জন্য আইনও তো আছে দেশে। শুধু চাই সে আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ।''
আপনার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে বলে আমার মনে হয় না মিস আক্তার। বাংলাদেশে নারীদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তারপরও সমাজ এখনো পুরুষতান্ত্রিকই রয়ে গেছে। যার ফলে নারীরা বিভিন্ন পর্যায়ে বৈষম্য এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি, তবে সেটা দীর্ঘ মেয়াদী ব্যাপার। আপনি যেটা বলছেন, এই মুহূর্তে দরকার হচ্ছে প্রচলিত আইনের নিয়মিত প্রয়োগ, যাতে যারা নারী নির্যাতন করবে বা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করবে, তারা পার না পেয়ে যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের মিডিয়াতে বড় খবর ছিল, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব প্রত্যাহারের জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বা জামুকার সুপারিশ। সে বিষয়ে আজও চিঠি রয়েছে, লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:
''একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ বিষয়টিকে আমার কাছে বেশ স্পর্শকাতর বলেই মনে হচ্ছে। কারণ ইতোপূর্বে জিয়ার নাম সংশ্লিষ্ট কোন জায়গার বা স্থাপনার নাম পরিবর্তন হলেও তার খেতাব কেড়ে নেয়ার মত এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি বলেই জানি। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তার অবদান আছে, এটা তো স্বীকার করতেই হচ্ছে। আজকে জিয়ার ব্যাপারে যেটা ঘটছে, কাল আরেকজনের ব্যাপারে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, এমন নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারেন? এই সংস্কৃতি চালু হয়ে যাওয়াটা কি বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছেনা?''

ছবির উৎস, FARJANA K. GODHULY
এ বিষয়ে আরো লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:
''জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিল করার সিদ্ধান্ত মাত্র কয়েক জন ব্যক্তির হিংসাত্মক রাজনীতির ব্যাপার, হয়তোবা সমগ্র জাতির নয়। এতে করে সার্বিক দেশ তথা মুক্তি যোদ্ধাদের কলঙ্কিত করা হলো। এইসব ক্ষমতার অপব্যবহার কখনও দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না বলেই আমি মনে করছি। গায়ের জোরে এইসব করে কী লাভ?''
জামুকার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতি অবশ্যই থাকতে পারে মি. সাঈদ এবং মি. ইসলাম। বিশেষ করে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত বলে আওয়ামী লীগ মনে করে, তাদের সব চিহ্ন মুছে ফেলার প্রয়াসও থাকতে পারে। সরকার যদি জামুকার সুপারিশ মেনে নেয় তাহলে অবশ্যই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে তাদের প্রতিপক্ষ কাজে লাগাতে পারে।
প্রতিপক্ষর সব অর্জন মুছে ফেলার রাজনীতি একবার শুরু হলে সেটা থামানো খুবই কঠিন। তবে বিষয়টি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে আমার দেখবো, এই প্রক্রিয়া জামুকা শুরু করছে না, সেটা শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালের পর থেকেই, যখন শেখ মুজিবের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, এই প্রক্রিয়া বন্ধ করবে কে?
এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে একটি চিঠি, লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে রতন কুমার পাল:
''গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাতে ইতিহাসের সাক্ষী অনুষ্ঠানটি শুনলাম, যেখানে ফ্রান্সের বিদ্যালয়ে মহিলাদের হিজাব পরা নিয়ে আলোচনা হল। কিন্তু আপনাদের অনুষ্ঠানে পুলওয়ামায় সন্ত্রাসবাদী হামলায় মৃত ভারতের বীর সেনাদের কথা কি উপস্থাপন করা যেত না? যা দুই বছর পূর্বে ওই দিনই ঘটেছিল।''
আমরা সব ঘটনার বার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবেদন প্রচার করি না মি. পাল। পুলওয়ামার ঘটনা ভারতীয় মিডিয়াতে নিশ্চয়ই বড় করে দেখা হয়েছিল।

ছবির উৎস, Reuters/Anushree Fadnavis
ভারতের আরেকটি ঘটনার রিপোর্ট নিয়ে কিছু প্রশ্ন করে লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:
''বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পাতায় ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ''রাম মন্দিরে কারা চাঁদা দেননি, নাৎসি কায়দায় তাদের চিনে রাখছে আরএসএস'" শীর্ষক খবরটি পড়লাম। অভিযোগটি বেশ উদ্বেগজনক ও আতঙ্কের। তবে একটি বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি, বিজেপি, আরএসএস, শিব সেনা, বজরং বা অন্য ধর্মের কোন সংগঠন নিয়ে বিবিসি কোন সংবাদ পরিবেশন করলে তাদেরকে হিন্দুত্ববাদী বা উগ্রবাদী বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ ধরনের একই ঘটনা ঘটলে মুসলিম সংগঠনের ক্ষেত্রে জঙ্গি শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
''আমি যতটুকু জানি, যারা ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোন অপকর্মে লিপ্ত হয়, সাধারণত তাদেরকেই জঙ্গি বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন এ ধর্মীয় বৈষম্য কেন?''
ভাল প্রশ্ন করেছেন মি. রহমান, তবে প্রশ্নের প্রেক্ষাপটের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। যেমন, বাগদাদের বাজারে ইসলামিক স্টেট-এর বোমা হামলায় দু-তিন'শ নিরীহ মানুষের মৃত্যু আর মন্দির নির্মাণের জন্য চাঁদা তুলতে গিয়ে কেরালায় বিজেপির হুমকি-ধামকী, দুটোই অপকর্ম, কিন্তু দুটো ঘটনা কি এক মানদণ্ডে বিচার করা সম্ভব?
তাছাড়া, সব মুসলিম সংগঠনকে আমরা জঙ্গি বলে বর্ণনা করি না। যেমন, জামাতে ইসলামী, খেলাফতে মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, অথবা ভারতের মুসলিম সংগঠনগুলোকে আমরা শুধু ইসলামপন্থী দল বলেই বর্ণনা করি। তেমনি বিজেপি বা আরএসএস বা শিব সেনাকে হিন্দুত্ববাদী বলে বর্ণনা করা হয় আর বজরং দলকে উগ্রবাদী বলা হয়।
তবে যেসব সংগঠন গোপনে সশস্ত্র কার্যক্রম চালায়, যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করে, তাদের আমরা জঙ্গি বলে থাকি।
পরের চিঠি লিখেছেন মানিকগঞ্জ সদর থেকে মোহাম্মদ শামীম আহমেদ:
''সম্প্রতি লক্ষ্য করছি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ''আদালত" এর ক্ষেত্রে 'আপনি' সম্বোধন করা হয়। যেমন, আদালত বলেছেন, আদালত মন্তব্য করেছেন, আদালত তার রায়ে উল্লেখ করেছেন ইত্যাদি। তাছাড়া, আদালতের পূর্বে 'বিজ্ঞ' শব্দটিও জুড়ে দেয়া হয়। আদালত একটি প্রতিষ্ঠান, কোন ব্যক্তি নয়। সুতরাং, কোন অর্থে 'আপনি' বলা হয় বা বলা উচিত কি না? এ'ব্যাপারে বিবিসি বাংলার অভিমত কী?''
আমি আপনার সাথে একমত মি. আহমেদ। আদালত যেহেতু একটি প্রতিষ্ঠান, সেটাকে কেন আপনি বলে সম্বোধন করা হবে তা আমার বোধগম্য নয়। হয়তো বিচারকের ব্যক্তিত্বর সাথে আদালতকে এক করে দেখা হয়, যে কারণে আদালতকে বিজ্ঞ এবং আপনি বলা হয়। তবে সেটা আইনজীবীদের মধ্যে প্রচলিত হওয়া এক কথা, মিডিয়াতেও একই পরিভাষা ব্যবহার করা ঠিক বলে আমার মনে হয়না।
ভাষার ব্যবহার নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন, করেছেন খুলনার দিঘলিয়া থেকে মুহাম্মদ মুজাহিদ:
''আমি অনেক দিন যাবত খেয়াল করতেছি যে, বিবিসি বাংলার সাংবাদিকগন রবিবার কে "রোববার " বলে। কিন্তু কেন এটা বলে? জানালে উপকৃত হব।''
রবিবার নিয়ে আমাদের কোন নির্দিষ্ট নীতি নেই মি. মুজাহিদ। রোববার শব্দটিও যেহেতু প্রচলিত তাই আমরা দুটোই ব্যবহার করি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে রবিবার বলে থাকি।
পরের চিঠি লিখেছেন রাজশাহীর দুর্গাপুর থেকে মোহাম্মদ ফাতিউর রহমান রাকিব:
''আমি এখন রাজশাহীতে অবস্থান করি। সন্ধ্যার পর যখন বাজারে যাই বা হাঁটাহাঁটি করতে বের হই, যখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে, তখন বিভিন্ন দোকানে, রাস্তার মোড়ে, ধ্বনিত হতে থাকে বিবিসি বাংলার প্রচার। সবাই কান পেতে শুনে বিবিসি বাংলা। আমি এই দৃশ্য দেখি আর ভাবি, বিবিসি আগেও বাংলার মানুষের প্রিয় ছিল, আছে, ভবিষ্যতে থাকবে।''
ধন্যবাদ মি. রহমান। রাস্তার মোড়ে বা দোকানে যে এখনো বিবিসি বাংলার সান্ধ্য অনুষ্ঠান অনেকে মিলে শুনছেন, সেটা শুনে অত্যন্ত ভাল লাগলো।
বহুদিন পর লিখেছেন আমেরিকা প্রবাসী শ্রোতা সিসিম হাবিব, যিনি ভার্জিনিয়া রাজ্যের বাসিন্দা। আজ শেষ করছি সেই প্রবীণ শ্রোতা সিসিম হাবিবের চিঠির একাংশ দিয়ে:
''আজ থেকে ৪৯ বছর আগে বিবিসির কর্মকর্তাগণ ও অগণিত শ্রোতার কাছে আমার নাম বিশেষ পরিচিত ছিল। প্রতি সপ্তাহেই আমি চিঠি লিখতাম ও অত্যন্ত আগ্রহ নিয়েই বিবিসি থেকে আমার লিখা পড়া হতো। তখন আমি কিশোরী ছিলাম। আজ আমি বার্দ্ধক্যে এসে পা রেখেছি। জীবনের টানাপোড়ন-এ মাঝখানে কিছু সময় অনুষ্ঠান শোনা হয়নি। কিন্তু এখন আবার নিয়মিত আমার দৈনন্দিন কাজের অন্যতম একটি হয়ে উঠেছে।
চার পাঁচ বছর বয়স থেকেই বিবিসির শব্দ মাথায় গেঁড়ে বসেছে,যখন আমার বাবা মা নিয়মিত বিবিসির প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানই শুনতেন, যে সময় রেডিওই একমাত্র যান্ত্রিক মিডিয়া ছিল। যখন নিজে বিচার বুদ্ধি অর্জন করলাম, বুঝলাম বিবিসির প্রচারিত অনুষ্ঠান, বিশেষ করে সংবাদ বেশ নির্ভরযোগ্য, বানোয়াট কাহিনী নয়। আপনাদের প্রশংসা এতটুকু কাগজে লিখে শেষ করা যাবেনা যদি অতলান্তিক মহাসাগর সমান কালি খরচ করেও লিখি।''
আপনাকে ধন্যবাদ সিসিম হাবিব, এত বছর পর আবার চিঠি লেখার জন্য। আমাদের অনুষ্ঠানে অনেক পরিবর্তন আপনি দেখতে পেয়েছেন, আশা করি ভবিষ্যতে আপনার অভিমত আমাদের জানাবেন।
এবার কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:
প্রিয়ণজিৎ কুমার ঘোষাল, বেহালা, কলকাতা।
মোহাম্মদ শিমুল বিল্লাল বাপ্পী, কপিলমুনি, খুলনা ।
দীপক চক্রবর্তী, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।
মুতাছিম নয়ন, পাইকগাছা, খুলনা।
আরিফুল ইসলাম, পাইকগাছা, খুলনা।
আবু সাঈদ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, পীরগাছা, রংপুর।
জহিন মুমতাহিনাহ, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা।
মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, কাউনিয়া, বরিশাল।











