পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকা অ্যান্ডি বার্নহাম কে?

অ্যান্ডি বার্নহাম দুইজন পুলিশ কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পেছনে মানুষের ভিড় ছবি তুলছে। তিনি চশমা এবং গাঢ় রঙের শার্ট পরেছেন।

ছবির উৎস, Reuters

    • Author, বেকি মর্টন
    • Role, রাজনৈতিক প্রতিবেদক
    • Author, জেমস গ্রেগরি
    • Role, রাজনৈতিক প্রতিবেদক
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

অ্যান্ডি বার্নহাম এর আগে লেবার পার্টির নেতা হওয়ার চেষ্টা করেছেন; দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুবারই ব্যর্থ হয়েছেন।

তবে এবার হয়তো 'তৃতীয়বারেই সাফল্য' আসতে পারে, কারণ স্যার কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগ এবং মেকারফিল্ডের নতুন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক লেবার এমপি তাঁর পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছেন, যা বার্নহামের জন্য প্রধানমন্ত্রীত্বের পথ তৈরি করছে।

বার্নহাম নিশ্চিত করেছেন তিনি নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এবং তাঁর সম্ভাবনা আরও জোরদার হয়েছে স্যার কিয়েরের সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-এর সমর্থনে, যিনি নিজেও এ পদে লড়ার কথা ভাবছিলেন।

ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছানোর পথে বার্নহামের প্রথম বড় বাধা কেটে যায় গত সপ্তাহে, যখন তিনি মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ী হন। সেখানে রিফর্ম ইউকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেও লেবারের চেয়ে ৯,০০০-এরও বেশি ভোটে পিছিয়ে ছিল।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র লেবারের ভোট ভাগ ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ৪৫% থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৫৫ শতাংশে নিয়ে যান।

২০০১ সালের পর পুনরায় লেবার এমপি হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সোমবার বিকেলে শপথ নেবেন।

কিন্তু কীভাবে তিনি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দৌড়ে অগ্রগামী হয়ে উঠলেন?

এপ্রিল মাসে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অ্যাশটন-আন্ডার-লাইন-এ একটি ব্রেকফাস্ট ক্লাব পরিদর্শনে স্কুল ইউনিফর্ম পরা দুই শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় স্যার কিয়ের স্টারমার অ্যান্ডি বার্নহামের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এপ্রিল মাসে অ্যাশটন-আন্ডার-লাইন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে দেখা যায় বার্নহামকে

এভারটন সমর্থক ও ইন্ডি সংগীতপ্রেমী

১৯৭০ সালে লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহাম চেশায়ারের ওয়ারিংটনের কাছের শান্ত কমিউটার এলাকা কালচেথে বড় হন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তাঁর বাবা ছিলেন বিটি-র একজন প্রকৌশলী এবং মা ছিলেন জিপি রিসেপশনিস্ট। দুজনেই ছিলেন দৃঢ় লেবার সমর্থক, এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁর রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি হয়।

বার্নহাম বলেছেন, ১৪ বছর বয়সে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা পান তিনি, বিবিসির টিভি নাটক বয়েজ ফ্রম দ্যা ব্যাকস্টাফ দেখে, যা লিভারপুলের বেকার জীবন নিয়ে নির্মিত।

আজীবন এভারটন সমর্থক বার্নহামকে তাঁর বন্ধুরা মনে করেন প্রতিযোগিতামূলক ও খেলাপাগল এক শিশু হিসেবে, যিনি ল্যাঙ্কাশায়ার স্কুলবালকদের ক্রিকেট দলে দ্রুতগতির বোলার ছিলেন।

স্কুলে, স্থানীয় রোমান ক্যাথলিক কমপ্রিহেনসিভে, তাঁর ইংরেজি শিক্ষক স্মরণ করেন কীভাবে তিনি মক নির্বাচনে লেবার প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন।

বার্নহাম এবং তাঁর দুই ভাই তাঁদের পরিবারের মধ্যে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, যেখানে অ্যান্ডি কেমব্রিজে ইংরেজি পড়েন।

নিজের বই হেড নর্থ-এ বার্নহাম লেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি "নিজেকে সম্পূর্ণভাবে খাপ খাওয়াতে পারেননি" এবং নিজেকে "একজন ভানকারী" বলে মনে হতো।

তবে সংগীতপ্রেমী বার্নহাম, যিনি দ্য স্মিথস এবং দ্য স্টোন রোজেস-এর মতো উত্তরাঞ্চলের ইন্ডি ব্যান্ডের ভক্ত, তিনি বলেন, ম্যানচেস্টারের সংগীতের প্রতি তাঁর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তাঁকে "একটি পরিচয় এবং সুবিধা" এনে দিয়েছিল।

২০০৯ সালে ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত লেবার এমপি বনাম লবি সাংবাদিকদের বার্ষিক ফুটবল ম্যাচে অ্যান্ডি বার্নহাম গোলের দিকে শট নিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফুটবলে আগ্রহী বার্নহাম নিয়মিত অংশ নিতেন লেবার এমপিদের বনাম রাজনৈতিক সাংবাদিকদের বার্ষিক ম্যাচে

এমপি থেকে গ্রেটার ম্যানচেস্টর মেয়র

স্নাতক শেষে তিনি সাংবাদিকতায় কাজ শুরু করেন। ট্যাঙ্ক ওয়ার্ল্ড এবং প্যাসেন্জার ওয়ার্ল্ড ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন ট্রেড ম্যাগাজিনে কাজ করেন।

বিশের কোঠার শুরুতে তিনি রাজনীতিতে প্রথম সুযোগ পান, ডালউইচ অ্যান্ড ওয়েস্ট নরউডের তৎকালীন এমপি টেসা জোয়েলের গবেষক হিসেবে কাজ করে।

পরবর্তীতে ওয়েস্টমিনস্টার রাজনীতির প্রতি তাঁর সমালোচনামূলক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও, তিনি দ্রুত এগিয়ে যান।

প্রথমে সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্রিস স্মিথের বিশেষ উপদেষ্টা হন, এরপর ২০০১ সালে নিজের শহর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লেই থেকে এমপি নির্বাচিত হন।

ব্লেয়ারের অধীনে জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করে, পরে গর্ডন ব্রাউনের আমলে অর্থমন্ত্রী, পরে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।

সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়ামন্ত্রী থাকার সময় ১৯৮৯ সালের হিলসবোরো দুর্ঘটনার ২০তম বার্ষিকীর স্মরণসভায় তিনি প্রতিবাদের মুখে পড়েন। সে দুর্ঘটনায় ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক নিহত হয়েছিলেন।

এই ঘটনার পর তিনি ক্যাবিনেটে বিষয়টি উত্থাপন করেন, যা ওই ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় দফার তদন্ত শুরুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

২০১৪ সালে অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামে বক্তৃতার পর দর্শকদের করতালির মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহাম এক জনের সঙ্গে করমর্দন করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৪ সালে অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামে হিলসবোরো দুর্ঘটনার ২৫তম বার্ষিকীতে তিনি বক্তৃতা দেন

২০১০ সালে, সাধারণ নির্বাচনে লেবারের পরাজয়ের পর গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করলে বার্নহাম দলের নেতা হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন।

২০১৫ সালে আবার চেষ্টা করেন, এবার জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন।

সমালোচকেরাএমন একজন ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন, যার মতামত সফলতার সুযোগ বাড়াতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গণভোটে তিনি রিমেইন সমর্থক ছিলেন এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেন।

তবে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ বিষয়ে যুক্তি থাকলেও মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের সময় তিনি এটি প্রচার করবেন না-কারণ এলাকাটি ব্রেক্সিটের পক্ষে শক্তভাবে ভোট দিয়েছিল।

তিনি করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, যদিও তাঁকে দলের ব্লেয়ারপন্থী মধ্য-ডানপন্থী হিসেবে দেখা হতো।

সময়ের সঙ্গে তাঁর অবস্থান বাম দিকে সরে যায়, তিনি পানি ও জ্বালানি খাত রাষ্ট্রায়ত্ত করার পক্ষে অবস্থান নেন।

২০১৬ সালে করবিনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পদত্যাগ না করে, ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টরের প্রথম মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তিনি পদ ছাড়েন।

তিনি ৬০%-এর বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং ২০২১ সালে আরও বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন।

'বি নেটওয়ার্ক এবং লকডাউন জট

মেয়র হিসেবে তিনি অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রশংসা পান।

তাঁর নেতৃত্বে গ্রেটার ম্যানচেস্টর লন্ডনের বাইরে প্রথম এলাকা হিসেবে বাস সার্ভিস আবার জননিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা একীভূত করে "বি নেটওয়ার্ক" বা মৗেমাছির মতো নেটওয়ার্ক নামে পরিচালনা শুরু করে।

তিনি ২০২০ সালের মধ্যে রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সমস্যা শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন-যদিও লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

কোভিড মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডকে "অবজ্ঞার সঙ্গে আচরণ" করার অভিযোগ তুলে তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে।

এই অবস্থান থেকেই তিনি "কিং অব দি নর্থ" উপাধি পান।

বার্নহাম বি নেটওয়ার্ককে"কে তাঁর অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন

ছবির উৎস, PA Media

ছবির ক্যাপশান, বার্নহাম বি নেটওয়ার্ককে"কে তাঁর অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন

২০২৫ সালের শরতে পার্টি সম্মেলনের সময়, তিনি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।

তবে সরকারের ওপর "বন্ড মার্কেটের"-এর প্রভাব রয়েছে এমন মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন।

জানুয়ারিতে ওয়েস্টমিনস্টারে তার আবার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয় যখন গ্রেটার ম্যানচেস্টরের এমপি অ্যান্ড্রু গুইন পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

তবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে লেবারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁকে সেই উপনির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেয়।

মে মাসে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে নির্বাচনে লেবার খারাপ ফল করে এবং রিফর্ম পার্টির উত্থান দেখা যায়।

স্যার কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে, কিছু এমপি নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবি তোলেন এবং মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে শুরু করেন।

জশ সাইমন্স মেকারফিল্ডের এমপি পদ ছেড়ে দেন, যাতে বার্নহাম সংসদে ফিরতে পারেন।

এরপর বার্নহামকে ওই আসনের লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং পরের মাসে তিনি পুনরায় ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরেন।