মরু-পঙ্গপাল: আফ্রিকায় আবারও আক্রমণের হুমকি, লাখে লাখে বংশ বিস্তার

পঙ্গপালের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসল।

ছবির উৎস, FAO/Luis Tato

ছবির ক্যাপশান, গত বছর পঙ্গপালের হানায় পূর্ব আফ্রিকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বলা হচ্ছে ৭০ বছরের ইতিহাসে এরকম ঘটনা ঘটেনি।
    • Author, নাভিন সিং খাটকা
    • Role, পরিবেশ সংবাদদাতা, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published

ঝাঁকে ঝাঁকে মরু-পঙ্গপালের কারণে পূর্ব আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা আবারও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়েছে।

বছর-খানেক আগেও এসব দেশে পঙ্গপালের হানার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

এর পর প্রচুর কীটনাশক ছিটিয়ে এসব পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এখন জাতিসংঘ বলছে তাতে খুব একটা কাজ হয়নি বলেই মনে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি বলছে, মরুভূমির এসব পঙ্গপালের বংশ বিস্তারের জন্য ইথিওপিয়ার পূর্বাঞ্চলে এবং সোমালিয়াতে এখনও আদর্শ পরিবেশ বজায় রয়েছে। এর ফলে ঝুঁকির মুখে রয়েছে কেনিয়াও।

কর্মকর্তারা বলছেন, লোহিত সাগরের উভয় পাশে প্রচুর পঙ্গপালের জন্ম হচ্ছে যার ফলে এরিত্রিয়া, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।

বলা হচ্ছে, পূর্ব আফ্রিকাতে এবছর পঙ্গপালের যে ধরনের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, গত ৭০ বছরের ইতিহাসে সেরকম কখনও চোখে পড়েনি।

"কেনিয়াতে এই হুমকি আসন্ন, এখন থেকে যে কোন সময়ে তারা হানা দিতে পারে," বিবিসিকে একথা বলেছেন কিথ ক্রেসমান, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা। পঙ্গপালের আক্রমণের পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করেন তিনি।

"এবারকার পরিস্থিতি গতবারের মতোই খারাপ হতে পারে। কারণ বিভিন্ন দেশের সাড়ে তিন লাখ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় এসব পঙ্গপালের বংশ বৃদ্ধি ঘটছে।"

এবছরের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত কোটি কোটি পঙ্গপাল পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে আক্রমণ করে ব্যাপক ফসল-হানি ঘটিয়েছে।

"পঙ্গপালের আক্রমণের কারণে আমরা অনেক পশুচারণভূমি এবং গাছপালা হারিয়েছি আর একারণে এখনও আমাদের প্রচুর গবাদিপশু মারা যাচ্ছে," বলেন কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় একজন পশু খামারি গঞ্জোবা গুইয়ো।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "পঙ্গপালের প্রকোপের কারণে আমি ১৪টি ছাগল, চারটি গরু এবং দুটো উট হারিয়েছি। এখনও ভীতি তৈরি হয়েছে যে আমরা আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি কিম্বা এর পরিণতি আগের বারের চেয়েও খারাপ হতে পারে।"

কেনিয়ায় মরু-পঙ্গপালের হামলা।

ছবির উৎস, FAO/Sven Torfinn

ছবির ক্যাপশান, উত্তর কেনিয়ায় মরু-পঙ্গপালের হামলা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, তবে এই অঞ্চলের দেশগুলো পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন আগেরবারের তুলনায় ভালোভাবেই প্রস্তুত রয়েছে।

তবে তারা বলছেন, এবার নজরদারি বেশি, প্রস্তুতিও ভাল- যেমন জমিতে কিম্বা বিমান থেকে কীটনাশক ছিটানো হয়েছে।

তারা বলছেন, ১০টি দেশের দশ লাখ একরেরও বেশি জমিতে পোকামাকড়ের উৎপাত ঠেকাতে ওষুধ দেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে এই ভীতিও তৈরি হয়েছে যে পঙ্গপালের ঝাঁক খুব বেশি বড় হলে তারা হয়তো নিরুপায় হয়ে পড়তে পারে।

কিন্তু এবার এরকম পরিস্থিতির তৈরি হল কেন? এই অঞ্চলে কেন এতো পঙ্গপালের জন্ম হচ্ছে?

অনুকূল আবহাওয়া

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবছরের বর্ষা মওসুমে সোমালিয়ার মধ্যাঞ্চল ও ইথিওপিয়ার পূর্বাঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত গড় বৃষ্টিপাতের হার ছিল খুব বেশি।

এর ফলে জমিতে নানা ধরনের ও প্রচুর পরিমাণে গাছপালার জন্ম হয়েছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, পঙ্গপাল ধরে অর্থ আয় পাকিস্তানের কৃষকদের

মি. ক্রেসমান বলেন, "এর ফলে পঙ্গপালের বংশ বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এবং এসব অঞ্চলে প্রকৃত অর্থেই প্রচুর পঙ্গপালের জন্ম হচ্ছে।"

এরকম পরিস্থিতিতে কয়েক মাসের মধ্যেই ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের আবির্ভাব ঘটে।

এগুলো প্রথমে থাকে ডানাবিহীন ফড়িং এবং পরে সেগুলোর পাখা গজায়। এরা তখন ঝাঁকে ঝাঁকে চলতে শুরু করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মরুভূমির পঙ্গপালের খুব দ্রুত বংশবিস্তার ঘটে এবং এক বছরের মধ্যে এদের সংখ্যা এক লাখ ৬০ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় গাতি

উত্তর সোমালিয়ার আবহাওয়া শুষ্ক। এর ফলে পঙ্গপালের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা কঠিন।

কিন্তু গত নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় গাতি আঘাত হানার পর থেকে সেখানকার পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে।

মাত্র দু'দিনে দু'বছরের সমান বৃষ্টিপাত হয়েছে।

ইথিওপিয়ায় কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে।

ছবির উৎস, FAO/Michael Tewelde

ছবির ক্যাপশান, ইথিওপিয়ায় কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে।

আরো পড়তে পারেন:

এর ফলে পঙ্গপালের জন্য সেখানকার পরিবেশ যেখানে বিরূপ হওয়ার কথা ছিল সেটা বদলে গিয়ে তাদের বংশ বিস্তারের জন্য অনুকূল হয়ে উঠেছে।

বন্যার পরে জমিতে পানি জমার কারণে পঙ্গপালের জন্য সেখানে ডিম পাড়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে যে প্রচুর গাছপালার জন্ম হয়েছে সেগুলোও তাদেরকে খাদ্য জুগিয়েছে।

মরুভূমির পঙ্গপালের আক্রমণের কারণে এবছর এই অঞ্চলের যেসব দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের অন্যতম এই সোমালিয়া।

যুদ্ধ সংঘাত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত বিভিন্ন অঞ্চলে নজরদারির কারণে সেসব এলাকা থেকে পঙ্গপালকে দূরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যেসব জায়গায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই সেসব এলাকায় তা করা সম্ভব হয়নি।

"উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ সোমালিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, সেখানে কোন নজরদারি ছিল না," বলেন মি. ক্রেসমান।

কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়েমেনের বিভিন্ন জায়গাতেও মরুভূমির পঙ্গপালের বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।

তবে সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে গত কয়েক বছর ধরে কয়েকটি এলাকাতে নজরদারি চালানো সম্ভব হয়নি।

চারণভূমির ক্ষতি হওয়ায় মারা যাচ্ছে গবাদি পশুও।

ছবির উৎস, Jeremiah Lekoli

ছবির ক্যাপশান, চারণভূমির ক্ষতি হওয়ায় মারা যাচ্ছে গবাদি পশুও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এছাড়াও অনেক পঙ্গপাল সৌদি আরব থেকে ইয়েমেনের দিকে চলে আসছে।

তারা বলছেন, বেশি সময় ধরে উড়তে পারার কারণে এসব পঙ্গপাল লোহিত সাগরও পাড়ি দিতে পারে যার দূরত্ব তিনশো কিলোমিটারের মতো।

কীটনাশক ছিটানো

পরিস্থিতি খারাপ হলে এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ কীটনাশক ব্যবহারের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে। জমিতে এবং আকাশ থেকে এই কীটনাশক ছিটানো হবে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে প্রায় ২৭ লাখ টন সিরিয়াল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে যার আর্থিক মূল্য ৮০ কোটি ডলারের মতো। এসব দেশ খাদ্য সঙ্কট ও দারিদ্রে ভুগছে।"

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আরো কিছু উপায় খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

"আমরা নজরদারি বজায় রেখেছি কিন্তু আমাদেরকে কোন যন্ত্র অথবা ছিটানোর জন্য কীটনাশকও দেওয়া হয়নি," বলেন জেরেমিয়া লেকোলি, একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী যিনি কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় মারসাবিত এলাকায় পঙ্গপালের ওপর নজরদারি করার কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

"এসব জিনিস থাকা খুব জরুরি। নাহলে এর মধ্যেই পঙ্গপাল এসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে চলে যাবে।"

সোমালিল্যান্ডের একটি গ্রামের জমিতে ছেয়ে আছে পঙ্গপাল।

ছবির উৎস, FAO/Isak Amin

ছবির ক্যাপশান, সোমালিল্যান্ডের একটি গ্রামের জমিতে ছেয়ে আছে পঙ্গপাল।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আক্রান্ত পাঁচটি দেশে ইতোমধ্যেই সাড়ে তিন কোটি মানুষ খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে।

তারা বলছে, পঙ্গপালের বর্তমান প্রকোপ সামাল দেওয়া না গেলে তাদের সংখ্যা আরো প্রায় ৩৫ লাখ বেড়ে যেতে পারে।