কেন এক বিচারপতির মৃত্যুর পর আমেরিকায় তোলপাড়

উদারপন্থী বিচারপতি রুথ গিনসবার্গ। শুক্রবার তার মৃত্যুর পর বদলে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে নতুন কে আসবেন তা এখন প্রধান নির্বাচনী ইস্যূ হয়ে দাঁড়িয়েছে

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, উদারপন্থী বিচারপতি রুথ গিনসবার্গ। শুক্রবার তার মৃত্যুর পর সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে নতুন কে আসবেন তা এখন প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে
Published

যুক্তরাষ্ট্রে তেসরা নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব আন্দাজ করতে এপর্যন্ত পরিচালিত জনমত জরিপের অধিকাংশগুলোতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে।

মাত্র সপ্তাহ-খানেক আগে বিবিসির সবশেষ জনমত জরিপেও মি. ট্রাম্প তার প্রতিপক্ষের চেয়ে সাত শতাংশ পয়েন্ট পেছনে ছিলেন।

কিন্তু নির্বাচনের মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের উদারপন্থী‘ বিচারপতি রুথ বেইডের গিনসবার্গের মৃত্যুতে নির্বাচনী অংক অনেকটাই বদলে যেতে পারে বলে অনেক পর্যবেক্ষক ধারণা করছেন।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর ভর করে খুব সহজেই পুনঃনির্বাচিত হওয়ার যে স্বপ্ন ছয় মাস আগেও মি. ট্রাম্প দেখছিলেন কোভিড মহামারির কারণে তা দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, প্যানডেমিক মোকাবেলায় সরকারের পারফরমেন্সে নাখোশ প্রচুর রিপাবলিকান সমর্থক এবার ভোট না দেওয়ার কথা ভাবছেন। এমনকি অনেকে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।

কিন্তু প্রয়াত বিচারপতি গিনসবার্গের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, কবে হবেন - তা নিয়ে যে তুমুল বিতর্ক এখন তৈরি হয়েছে তাতে হঠাৎ করেই কোভিড মহামারি ইস্যু অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে।

অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, ট্রাম্প শিবির এখন অবধারিতভাবে চাইবে এই বিতর্ক যেন নির্বাচন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, এবং একে কাজে লাগিয়ে কোভিডের কারণে ক্রদ্ধ রিপাবলিকান সমর্থকদের ফিরিয়ে আনা যায়।

বিচারপতি গিনসবার্গের মৃত্যুর পরদিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়ে দেন, শূন্য পদ পূরণে তিনি দ্রুত একজন বিচারপতিকে মনোনয়ন দেবেন। সোমবার তিনি বলেন, শুক্র বা শনিবারের মধ্যেই তিনি তার মনোনীত প্রার্থীর নাম জানাবেন।

সাথে সাথেই তার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। তার কথা- নির্বাচনের আগে নতুন কোনো বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট যদি সত্যিই তা করেন, তাহলে তা হবে ‘ক্ষমতার চরম অপব্যবহার।‘

নির্বাচনের আগেই নতুন বিচারপতি নিয়োগ দিতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনের আগেই নতুন বিচারপতি নিয়োগ দিতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডেমোক্র্যাটরা ভয় পাচ্ছে কেন?

কিন্তু একজন বিচারপতির নিয়োগ নিয়ে এত ভীত কেন জো বাইডেন ?

বিবিসির সংবাদদাতারা বলছেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের নয়-সদস্যের বেঞ্চে কট্টর রক্ষণশীল এবং রিপাবলিকান সমর্থক একজন বিচারপতিকে নিয়োগ দেবেন, এবং তার ফলে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘকালের জন্য রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র প্রভাব কায়েম হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই বিচারপতিদের ক্ষমতার মেয়াদ আমৃত্যু এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় তদের নিয়োগ হয়। ফলে, বিচারপতিদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আদর্শিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গুরুত্বপূর্ণ জন এবং রাজনৈতিক ইস্যুর মীমাংসা কোনো পর্যায়েই যখন সম্ভব হয় না, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তই তখন শেষ কথা।

এতদিন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নয় সদস্যের বেঞ্চে পাঁচজন ‘রক্ষণশীল‘ বিচারকের বিপরীতে ছিলেন চারজন ‘উদারপন্থী‘ বিচারক। কিন্তু শুক্রবার বিচারপতি গিনসবার্গের মৃত্যুতে সেই সমীকরণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ-তিন।

আরো পড়তে পারেন:

এখন যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো একজন কড়া রিপাবলিকান সমর্থক বিচারপতি নিয়োগ দেন, তাহলে তিনজন উদারপন্থী বিচারকের তুলনায় রক্ষণশীলদের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ।

ফলে, গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসীদের অধিকার বা সম-লিঙ্গের বিয়ের অধিকারের মত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যুতে আগামিতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রিপাবলিকান পার্টির কট্টর রক্ষণশীল অংশের ইচ্ছার প্রতিফলন হবে বলে ডেমোক্র্যাট এবং উদারপন্থীদের মধ্যে গভীর আশংকা তৈরি হয়েছে।

এছাড়া, অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা এখনও মুখে না বললেও তাদের ভেতরে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে ২০০০ সালের মত ভোট গণনা নিয়ে যদি আবার কোনো বিরোধ-মতানৈক্য শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়, তাহলে রায় তাদের পক্ষে যাওয়ার কোনো আশাই থাকবে না।

কী করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কি নির্বাচনের আগেই সুপ্রিম কোর্টের শূন্য পদে কোনো বিচারপতি নিয়োগ করবেন?

বিবিসির উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্টনি জারকার বলছেন, নির্বাচনের মাত্র ৪৬ দিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টে তৃতীয় কোনো বিচারক নিয়োগের বিরল সুযোগ পেয়েছেন, এবং তিনি সেই সুযোগ কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগাবেন।

কিন্তু তেসরা নভেম্বরের আগেই তিনি বিচারপতি নিয়োগ সম্পন্ন করবেন কিনা- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিবিসির ঐ সংবাদদাতা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এখন চাপের মুখে তাড়াহুড়ো না করে বিচারপতি নিয়োগ নাও দেন এবং নির্বাচনে যদি হেরেও যান, তাহলেও তিনি নতুন কংগ্রেস এবং নতুন প্রেসিডেন্ট জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়ার আগেই সেনেটে রিপাবলিকানদের দিয়ে তার পছন্দের একজন বিচারক নিয়োগ সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে পারেন।

নির্বাচনের আগে নতুন বিচারপতি নিয়োগ মানবো না - জো বাইডেন

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনের আগে নতুন বিচারপতি নিয়োগ মানবো না - জো বাইডেন

রিপাবলিকান পার্টিতে দ্বিধা

সেনেটে এখন রিপাবলিকানদের সিট ৫৩। প্রেসিডেন্ট যদি একজন বিচারপতি মনোনয়ন দেন তাহলে ৫০টি ভোট হলেও তা পাশ হয়ে যাবে।

তবে নির্বাচনের আগেই বিচারক নিয়োগে অনেক রিপাবলিকান সেনেটরের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে।

নভেম্বরে সেনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্যকে নতুন করে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। ফলে অনেক রিপাবলিকান সেনেটর ভয় পাচ্ছেন, এখনই রক্ষণশীল একজন বিচারপতি নিয়োগ হলে, তাদের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ভোটাররা ক্ষেপে যেতে পারেন।

তারা আরো ভয় পাচ্ছেন এখনই বিচারপতি নিয়োগ করা হলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সেটিকে রিপাবলিকানদের ‘ভণ্ডামি‘ হিসাবে জোর প্রচারণা শুরু করবে। কারণ ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ওবামার সুপ্রিম কোর্টে একজন বিচারপতির মনোনয়ন রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সেনেটে আটকে দেওয়া হয়েছিল, এবং যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে নির্বাচনের আগে এমন পদে নিয়োগ অনুচিত।

তবে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সেনেটে তার মনোনয়ন অনুমোদন করা হোক বা না হোক, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব দ্রুত অন্তত একজন রক্ষণশীল প্রার্থীর মনোনয়ন ঘোষণা করে দেবেন।

উদ্দেশ্য দুটো - এই মনোনয়ন বিতর্কে যেন কোভিড প্যানডেমিক সামলানো নিয়ে তার পারফরমেন্সের বিচার-বিশ্লেষণ চাপা পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, কোভিড ইস্যুতে যেসব রক্ষণশীল রিপাবলিকান ভোটার ক্ষিপ্ত হয়েছেন, তারা যেন বৃহত্তর আদর্শিক স্বার্থে আবার তার পাশে এসে দাঁড়ান।

রিপাবলিকানরা মনে করছে, সুপ্রিম কোর্টের আদর্শিক অবস্থান অনেক দক্ষিণপন্থী রিপাবলিকানদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা সর্বোচ্চ আদলতে যেন উদারপন্থী বিচারপতিদের প্রভাব কমে যাতে গর্ভপাত বা সম-লিঙ্গের মধ্যে বিয়েসহ স্পর্শকাতর ইস্যুতে তাদের ইচ্ছাই প্রতিফলিত হতে পারে।

জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন।

ছবির উৎস, BBC

ছবির ক্যাপশান, জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন।

বদলে যাবে সুপ্রিম কোর্টের আদর্শিক ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্রে এখন জোর ধারণা, এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও রোববার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে রক্ষণশীল হিসাবে পরিচিত বিচারক অ্যামি কোনি ব্যারাটকেই হয়ত মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। তা হলে, দীর্ঘদিনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আদর্শিক ভারসাম্য দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে চলে যাবে।

বিবিসির অ্যান্টনি জারকার বলছেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্টে নতুন একজন বিচারপতি নিয়োগের ইস্যু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সুবিধা করে দিয়েছিল। একজন রক্ষণশীল বিচারপতি এলে গর্ভপাতের অধিকার আইন বদলে ফেলা যাবে -এই আশায় কট্টর ইভানজেলিকাল ক্রিস্টানরা দলে দলে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।

এবারও কি তাই হবে? ট্রাম্প শিবিরে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, কোভিড সংকট ভুলে রক্ষণশীল ভোটাররা এবারও তার পাশে এসে দাঁড়াবেন।কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন সুপ্রিম কোর্ট পুরোপুরি রক্ষণশীলদের কব্জায় চলে যেতে পারে এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের উদারপন্থীরা জো বাইডেনকে জেতানোর জন্যে এখন জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা শুরু করতে পারেন।

কমবয়সী তরুণ উদারপন্থী ভোটারদের মধ্যে ক্রোধ তৈরি হলে, ডেমোক্র্যাটরা নিঃসন্দেহে তার ফল পাবে। এই ভোটারদের আরো চাঙ্গা করতেই হয়ত বাইডেন শিবির থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে নির্বাচনের আগেই যদি রিপাবলিকানরা তাদের পছন্দের কোনা বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে ফেলে, তাহলে নির্বাচনের জিতলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে বিচারপতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ নয় সদস্যের হলেও তা বাড়ানো বা কমানো যাবেনা এমন কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নেই।

তবে নভেম্বরে ভোটের বাক্সে এই বিতর্কের ফল কে পাবে তা একশ ভাগ নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, জনমতে এতদিন ধরে যে একটা অব্যাহত স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, সেটা বদলে যেতে পারে।

বিবিসির অ্যান্টনি জারকার বলছেন, ভোটারদের মনে এখন যে কোনো অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতা তৈরি করা গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য তা স্বস্তি।