করোনা ভাইরাস: কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ নিয়ে যে বিরাট ধাঁধাঁর মীমাংসা হয়নি

    • Author, রোরি সেলান জোনস এবং লিও কেলিওন,
    • Role, টেকনোলজি বিষয়ক রিপোর্টার
  • Published

জার্মানি আর আয়ারল্যান্ড সম্প্রতি বেশ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানিয়েছিল, তারা সাফল্যের সঙ্গে করোনাভাইরাস ট্রেসিং অ্যাপ চালু করতে পেরেছে।

কিন্তু এই অ্যাপ যে আসলে কাজ করছে, এটি দিয়ে লোকজনকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ সম্পর্কে যে সতর্ক করে দেয়া যায়, তার কী প্রমাণ আছে?

আসলে কোন প্রমাণ এখনো নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষার কথা ভেবে এই অ্যাপগুলো যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, তাতে করে আসলে কোনদিনই জানা যাবে না, এই অ্যাপগুলো আসলে কতটা কাজ করছে।

ব্রিটিশ সরকার ইংল্যান্ডের জন্য এমন একটি কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ চালু করতে চেয়েছিল, যেটির সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে এক জায়গায় সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু গত মাসে ব্রিটিশ সরকার সেই পরিকল্পনা বাদ দেয়। পরিবর্তে তারা এখন অ্যাপল-গুগল টুলকিটের ভিত্তিতে একটি ডিসেন্ট্রালাইজড বা বিকেন্দ্রীকৃত অ্যাপ তৈরির পথে এগুচ্ছে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে যাদের উদ্বেগ আছে, তারা এধরণের কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপের পক্ষে। কারণ এ ধরণের অ্যাপে কোন ব্যক্তি কার সংস্পর্শে এলো, সেই তথ্য তাদের স্মার্টফোনেই সংরক্ষিত থাকবে, কোন কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে নয়। এর ফলে অ্যাপ ব্যবহারকারীরা অজ্ঞাতপরিচয় থাকতে পারবেন।

ব্রিটিশ সরকার বলছে, এরকম নতুন একটি অ্যাপ খুব দ্রুত তৈরি করা যাবে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গত সপ্তাহেই পার্লামেন্টে বলেছিলেন, বিশ্বের কোন দেশেই আসলে ঠিকমত কাজ করে এমন কোন কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ নেই।

তবে ব্রিটেনে বিরোধী দলের নেতা, কিয়ের স্টার্মার সাথে সাথে জবাব দিয়ে বলেছিলেন, জার্মানির এরকম অ্যাপ আছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে একই কথা বলেছিলেন আরও অনেকে।

জার্মানির করোনাভাইরাস অ্যাপটি দেশজুড়ে চালু করা হয় গত জুন মাসে। এর কয়েকদিন আগে রবার্ট কচ ইনস্টিটিউট এটির অগ্রগতি সম্পর্কে একটি আপডেট দেয়। এতে তারা বেশ উল্লাস প্রকাশ করে বলেছিল, সারাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এই অ্যাপটি তাদের স্মার্টফোনে ইনস্টল করেছে।

অ্যাপটির ডেভেলপার তখন এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, "শুরুতেই এরকম ব্যাপক সাড়া এই অ্যাপটির ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ এবং গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ।"

কিন্তু মনে রাখতে হবে জার্মানিতে ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। কাজেই এরকম কোন অ্যাপ যদি সফল হতে হয়, জনসংখ্যার অন্তত অর্ধেক মানুষকে সেটি ব্যবহার করতে হবে।

রবার্ট কচ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর লোথার ওয়েইলার বলেছিলেন, ''অ্যাপটি কাজ করছে।'' তিনি আরও জানিয়েছিলেন, এই অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রায় ৫০০ জন মানুষ করোনাভাইরাস টেস্ট করে পজিটিভ বলে প্রমাণিত হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, এই অ্যাপ ব্যবহার করে অন্যদেরকে সতর্ক করে দেয়ার সুযোগ আছে।

তবে এরপর তিনি আবার যোগ করেছিলেন, "আমরা বলতে পারবো না ঠিক কতজন মানুষকে সতর্ক করা গেছে, কারণ এই অ্যাপটি বিকেন্দ্রীকৃত ধারার ভিত্তিতে কাজ করে।"

আরও পড়ুন:

এর মানে হচ্ছে, আমরা আসলে জানি না, এই সফটওয়্যার তার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ঠিকমত করতে পারছে কি না।

কোন অ্যাপ কতটা সঠিকভাবে কাজ করছে তা জানতে হলে এটা বোঝা দরকার অ্যাপটি কতটা ভুল পজিটিভ বা ভুল নেগেটিভ সংক্রমণের বার্তা পাঠাচ্ছে। অর্থাৎ যখন কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে আসছে, তখন এই অ্যাপটি তাকে সতর্ক করে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কি না। অথবা যারা আসলে সংক্রমণের শিকার কারও সংস্পর্শে আসেনি, তাদের কাছে আবার ভুলে সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে কি না।

এটি জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক গবেষণায় দেখা গেছে দুজন মানুষের মধ্যকার দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে ব্লুটুথ খুব নির্ভরযোগ্য নয়।

রবার্ট কচ ইনস্টিটিউট বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের অ্যাপ কতটা ভালোভাবে কাজ করছে সেই উত্তর তারাও জানে না। কারণ অ্যাপ ব্যবহারকারীদের তথ্য তাদের স্মার্টফোনেই সংরক্ষিত থাকছে, সেই তথ্য ইনস্টিটিউটের পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

জার্মানিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব যাদের ওপর, সেই ম্যানুয়্যাল কন্ট্যাক্ট ট্রেসাররা কি এ সম্পর্কে কোন ধারণা দিতে পারে কত লোক আসলে এই অ্যাপের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পেয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তরও 'না।' কারণ এদের পরিচালনা করে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ। তারা তাদের তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করতে রাজী নয়।

রবার্ট কচ ইনস্টিটিউট আশা করছে, মধ্য বা দীর্ঘ মেয়াদে এই অ্যাপটির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল থেকেই জানা যাবে। কিন্তু কিভাবে সেটা করা হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সুইজারল্যান্ডেও এই একই সমস্যা।

দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের একজন মুখপাত্র বলেন, তারাও অ্যাপল এবং গুগলের মডেল ব্যবহার করে তাদের 'সুইসকোভিড' অ্যাপ তৈরি করেছেন।

"আর এ কারণে পরিসংখান পেতে আমাদেরও একই ধরণের সীমাবদ্ধতা আছে।"

'ইতিবাচক মনে হচ্ছে'

আয়ারল্যান্ডের অ্যাপটি তৈরি করেছে নিয়ারফর্ম নামের যে প্রতিষ্ঠান, তার প্রধান সিয়ান ও মাইডিন।

দু সপ্তাহ আগে তারা অ্যাপটি চালু করেন। খুব দ্রুতই এটি স্মার্টফোনে ইনস্টল করেছেন ১৩ লাখ মানুষ। আয়ারল্যান্ডের মোট স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

নিয়ারফর্ম এখন উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্যও একই ধরণের একটি অ্যাপ তৈরি করছে। ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা এনএইচএসের অ্যাপ প্রকল্প সমস্যায় পড়ার পর উত্তর আয়ারল্যান্ড নিজেদের মতো করে অ্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেয়।

মিস্টার ও মাইডেন আশা করছেন ব্রিটেনের অন্যান্য জায়গায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে তারা এই একই অ্যাপু চালু করতে পারেন।

বিবিসির কাছে তিনি দাবি করেন, তারা এরই মধ্যে সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন।

"আমরা এমন এক সমাধান খুঁজে বের করেছি, যেটা সবার জন্য কাজ করছে। এটা পরীক্ষিত, যাচাই করা। কোন সরকার চাইলে আমরা এক মাসের মধ্যে এই তৈরি করে দিতে পারি।"

এরকম অ্যাপের কার্যকারিতা নিয়ে যেসব সংশয়, সেগুলো তিনি উড়িয়ে দিলেন।

"আমাদের কাছে সব তথ্য এখনো নেই। তবে যেসব তথ্য প্রাথমিক তথ্য আমরা পেয়েছি, তা বেশ ইতিবাচক।

জার্মানি আর সুইজারল্যান্ডের অ্যাপ যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, আয়ারল্যান্ডের অ্যাপটিও সেই একইভাবে তৈরি। কাজেই এই অ্যাপ থেকে কেন অনেক বেশি তথ্য পাওয়া যাবে সেটি পরিস্কার নয়।

তবে একটা ছোট্ট পার্থক্য আছে। আয়ারল্যান্ডের অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় এটি ব্যবহারকারীদের কাছে জানতে চায়, তারা কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপের কার্যকারিতার জন্য কিছু বেনামি মেট্রিক্স ব্যবহার করতে দিতে রাজী আছে কি না।

মিস্টার ও মাইডেন বলছেন, কোন ক্ষেত্রে অ্যাপটি সতর্ক করে দিতে ব্যর্থ হলে বা ভুল করলে সেটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই।

কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ নিয়ে সমস্যা

বিশ্বের অন্য কিছু দেশেও কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল:

  • জাপানের কনট্যাক্ট কনফার্মিং অ্যাপ (কোকোয়া) ডাউনলোড করার হার কমে এসেছে। সোমবার পর্যন্ত এটি ডাউনলোড করা হয় ৭৭ লাখ বার। জাপানের জনসংখ্যা হচ্ছে ১২ কোটি ৬০ লাখ। এই সফটওয়্যারে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে করোনাভাইরাস টেস্ট পজিটিভ আসলে সেটি এই অ্যাপে রিপোর্ট করা যাচ্ছিল না। পরে নতুন একটি ভার্সানে এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। কিন্তু জাপান টাইমস বলছে, তারপর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২৭টি করোনাভাইরাস পজিটিভ কেস এই অ্যাপের মাধ্যমে জানা গেছে।
  • ইটালির কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপের নাম ইমিউনি। ৪২ লাখ ইতালিয়ান এপর্যন্ত অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন। ইতালির জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। সরকার যা আশা করেছিল, তার চেয়ে অনেক কম সাড়া পাওয়া গেছে অ্যাপটি ব্যবহারে। ইতালিতে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় অ্যাপটি ব্যবহারে আগ্রহ কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
  • অস্ট্রেলিয়ার অ্যাপটির নাম কোভিডসেইফ। কিন্তু এই অ্যাপ দিয়ে এখনো পর্যন্ত এমন কোন করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা জানা যায়নি, যেটি কিনা অন্যান্য কনট্যাক্ট ট্রেসিং প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইতোমধ্যে জানা যায়নি। এই অ্যাপ নিয়ে বেশ কিছু সমস্যার কথা রিপোর্ট করছে জেডনেট নামের একটি ওয়েবসাইট। এক সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্থানীয় একটি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই অ্যাপটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার।
  • ফ্রান্সের কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপের নাম স্টপকোভিড। ফ্রান্সের ডাটা বিষয়ক ওয়াচডগ সংস্থা সোমবার সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে এই অ্যাপটিতে কিছু পরিবর্তন আনার জন্য, যাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিষয়ক আইনের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী এটি ব্যবহার করছে ২৩ লাখ মানুষ।