করোনাভাইরাস ভুলে গিয়ে গ্রীষ্মের আনন্দে ভাসছে রাশিয়া

ছবির উৎস, শাকিলা সিমকী
- Author, শাকিলা সিমকী
- Role, মস্কো থেকে বিবিসি বাংলার জন্য
- Published
টানা তিন মাস লকডাউনের পর মস্কো এখন আগের মতো স্বাভাবিক। এদেশের জনগণ ভুলে গেছে কোভিড- ১৯ এর কথা। মেট্রো চলছে, মার্কেট আর রেস্তোরাঁগুলো খুলে গেছে । বাইরে এতো দারুণ আবহাওয়া মস্কোবাসীর জন্য ঘরে থাকা দায়। আর রুশবাসী ভালো করেই জানে এখন বের না হওয়া মানে জীবন থেকে একটি গ্রীষ্ম চলে যাওয়া।
জুন থেকে আগস্ট জুড়ে সূর্য পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করার কারণে উত্তর গোলার্ধের সব দেশই সেসময় গ্রীষ্মকাল উপভোগ করলেও ভিন্নতা তো আছেই। গরমের দেশগুলোতে সামার রুক্ষ আর তপ্ত, কিন্তু সে তুলনায় শীত প্রধান দেশগুলোতে গ্রীষ্ম খুবই আরাধ্য।
বসন্তে যখন গাছগুলোতে দ্রুত পাতা গজাচ্ছিল আর চারদিকে ফুল ফুটছিল আমি দিন গুনছিলাম ফল ধরবে কবে? আর এর কিছুদিন পরেই লক্ষ্য করলাম অজানা অচেনা গাছগুলোতে নানারকম চেনা ফল ধরেছে।

ছবির উৎস, Dmitry Feoktistov
একদিন লক্ষ্য করলাম পাশের চার্চের বাগান জুড়ে আপেল গাছ আর সেখানে সবুজ সবুজ বাচ্চা আপেল ধরেছে। ডর্মেটরির সামনের প্লাম গাছটাতেও ছোট ছোট ফল ধরেছে। বাজারে যাবার পথের ধারেও একটা চেরি গাছে চেরি ধরেছে দেখে পেড়ে খেলাম।
অনুভূতি তো অন্যরকম অবশ্যই ।নিজের দেশে এসব বিদেশি ফল পয়সা দিয়ে কিনে খেয়েছি। আর সেইসব ফলের গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়া অন্যরকম অনুভূতি। এখানে পথে ঘাটে আপেল আর নাশপাতির গাছ। যার ইচ্ছে খেতে পারবে। কেউ বাধা দেবার নেই।
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা বলেছিলেন, 'যে মানুষ স্পর্শকাতর যাদের অনুভূতি তীক্ষ্ণ বা শাণিত,তারা সব ঋতুর আগমনেই কম বেশি সাড়া দিতে পারে। এমন মানুষ পৃথিবীতে অনেক।'
আমি নিজেও একমত। রুশদের সামার উদযাপন দেখে মনে হয়েছে দীর্ঘ ন'মাস শীতের ঠাণ্ডা তাদের কাবু করতে পারেনি। ঠাণ্ডার তীব্রতা তাদের অনুভূতিকে অসাড় করতে পারেনি। সামারের আবহাওয়া তাদের শরীর মন দুটোই জাগ্রত করেছে।

ছবির উৎস, Artyom Geodakyan
এখনতো করোনা, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় এখানে জুনের শুরুতেই সব স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তিন মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। অফিস আদালতেও কাজকর্ম খুব কমে যায় সবাই সামার উপভোগের জন্য অবকাশে যান। পরিবার নিয়ে সময় কাটান। কেউ বা দূরে সমুদ্রের কাছে যান।
রাশিয়ার এক অন্যতম উষ্ণ শহর 'সোচি'। কৃষ্ণ সাগরের তীরে এই শহর। অবকাশের জন্য দারুণ জায়গা। 'সামার বিচ রিসোর্ট' হিসেবে এমনিতেই পরিচিত। শীতকালেও একটু উষ্ণতার জন্য সোচি বেড়াতে যায় রুশ পরিবারগুলো আর ট্যুরিস্ট তো আছেই।
সামারে 'সেন্ট পিটার্সবুর্গ' এবং 'সোচি' এই দুইটা শহর রুশ এবং টুরিস্টদের কাছে কাঙ্ক্ষিত। এছাড়াও কেউবা যায় নিজ গ্রামের বাড়ি ডাচায় । আবার স্টুডেন্টরা ছুটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ আর শপিং মলে কাজ করে এই তিন মাস।

ছবির উৎস, Sergei Fadeichev
আমাদের দেশের আম কাঁঠালের ছুটিতে যেমন নানী বাড়ি দাদি বাড়ি বেড়াতে যাই (যদিও এখন আর সেরকম কিছু ঘটে কম), এখানে শহরের বাইরে গ্রামগুলোতে বনের পাশে কাঠের বাড়ি তৈরি করা আছে। এদের বলে 'ডাচা' ।
সামারে সবাই পরিবার নিয়ে তিনমাস সেই ডাচাতে বাস করে। তাই এখানে রুশ বাসীদের প্রত্যেকের নিজস্ব ডাচা আছে।
আর যাদের নেই তারাও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত নয়। কারণ গ্রামের বাইরে এত ডাচা তৈরি আছে যে কেউ যতদিন ইচ্ছে ভাড়া নিয়ে থাকতে পারে। ডাচাগুলো বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হয়, যেখানে গ্রীষ্মকালীন শাক সবজি আর ফলমূলের বাগান থাকে। থাকে ছোট পুকুর যেখানে মাছ চাষ হয় আর থাকে বারবিকিউ করার সমস্ত আয়োজন।
ডাচা আসলে ব্যক্তি বিশেষে তৈরি করে। ব্যক্তিগত ইচ্ছেয় । এইসব ডাচাগুলোর পাশেই আছে বড় বড় বন। গ্রীষ্মের রোদেলা দিনে পরিবার, বন্ধুবান্ধবদের সাথে বনে সাসলিক করে । নদীতে গোসল করে , মাছ ধরে নানারকম আনন্দের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে রুশ পরিবারগুলো।

ছবির উৎস, Sergei Savostyanov
বনে শুধু নয়, নদীর পাড়ে , আর শহরের বড় বড় পার্কগুলোতেও সে এক অসাধারণ দৃশ্য। গাছ তলায় বসে দুই বান্ধবী আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করছে, নদীর কূল ঘেঁষা এক বেঞ্চিতে বৃদ্ধা মহিলা বসে উলের সোয়েটার বুনছেন আর পাশেই বসে খেলা করছে তার ছোট্ট নাতনী ।
নানান বয়সী তরুণ তরুণীরা স্কেটিং করছে পিচ ঢালা পথে। কেউ সাইকেল চালাচ্ছে কেউ সামাকাত নিয়ে ব্যস্ত, একপাশে রেস্তোরাঁতে গরম গরম খাবার পরিবেশন করছে। একদল খাচ্ছে। আরেক পাশে খোলা মঞ্চে নাচের আয়োজন করা আছে। সেখানে গানের সাথে যুগলেরা মনের সুখে নাচছে।
পার্কের পাশে নদীতে ছোট বড় জাহাজ অপেক্ষা করছে ভ্রমণ পিপাসীদের জন্য। জনপ্রতি একহাজার রুবল। এক ঘণ্টায় জাহাজে চড়ে মস্কো শহরের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। সেই জাহাজগুলোতেও আছে বিনোদনের ব্যবস্থা। লাইভ গান নাচের ব্যবস্থা আর খানাপিনার আয়োজন।

ছবির উৎস, Mikhail Japaridze
তিন মাস মনের অবস্থা যা ছিল বা পৃথিবীর অসুখ সব এখন কাল্পনিক মনে হচ্ছে এখানে সামারের অবস্থা দেখে। পুরো শহরটাই একরকম আনন্দ বন্যায় ভাসছে। রাতের বেলাও সাদা রাত চারপাশে আলোর ঝলকানি। আতশবাজি , পথে পথে বসেছে নানা রকম বাদ্য বাজনার আয়োজন।
কেউ গান গাইছে, কেউ পিয়ানো বাজাচ্ছে, মুগ্ধ দর্শক সেগুলো উপভোগ করছে আর খুশি হয়ে তাদের দু-এক রুবল সামনে পাতা ঝুলিতে রেখে যাচ্ছে। এখানে সরাসরি ভিক্ষা চাইতে একজন মানুষ লজ্জিত বোধ করে। সে তার গুণ দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করে, তাতেই যে যা দেয় সেটা নিয়ে হয়তো তার পরিবার চালায়। গ্রীষ্মকে মুখরিত করার পেছনে এইসব গুণী মানুষগুলোর অবদান সত্যিই অনেক।
সামাকাত আর স্কেটিং এখানে সারা বছরই ব্যবহৃত হয়। ছেলে বুড়ো বাচ্চা সবাইকেই দেখি সামাকাত আর স্কেটিং-এ ভীষণ দক্ষ। ছোটবেলা থেকেই এরা এসবে পারদর্শী। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সবাই দেখি সামাকাত নিয়ে বের হয়। হোঁচট খায় আবার উঠে দাঁড়ায়।

ছবির উৎস, Dmitry Feoktistov
এখানে সাইকেল, কার সব ভাড়ায় পাওয়া যায়। ঘণ্টা হিসেবে। সুতরাং গ্রীষ্মের রৌদ্রজ্জ্বল দিনগুলোকে উপভোগ করার জন্য কী প্রকৃতি কী রাষ্ট্রীয় সব রকমের আয়োজনই আছে এই গ্রীষ্মে। মনের অনুভূতি দিয়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা উপভোগ করছে সামার।
রুশবাসীর আনন্দ দেখে মনে হয় আসলেই জীবন উদযাপনের। মৃত্যু, ভয়, আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে না থেকে যতদিন বেঁচে জীবন উদযাপন করা যায় সেটাই রুশদের কাছে থেকে দেখে শিখছি। প্রতিটা দিনকে তারা গুরুত্বপূর্ণ করতে চায়।
ঘরে বসে সময় নষ্ট করছে না। চব্বিশ ঘন্টার বেশিটা সময় তারা বাইরে কাটাচ্ছে, কারণ রুশ রাজকন্যার এই তিন মাসের রূপের ঝলকই রুশবাসীদের বাকী ন'মাস বেঁচে থাকার রসদ।








