করোনা ভাইরাস: হ্যাকাররা যেভাবে 'অতি-গণতান্ত্রিক' তাইওয়ানের কোভিড-১৯ পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

উহানের সাথে সরাসরি ফ্লাইট আর ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি শহরে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস - প্রথম দিকে মনে হয়েছিল তাইওয়ানের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত তাইওয়ানে কোভিড-১৯ এ মারা গেছে মাত্র ৭ জন। আর তারা কখনো পুরোপুরি লকডাউনেও যায়নি।

এই সাফল্যের জন্য তাইওয়ানের নেতারা মানুষের মাস্ক পরার প্রবণতাকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন, তবে মাস্কের কার্যকারিতা তারা ব্যাখ্যা করছেন একটু অন্যভাবে।

তাইওয়ানের ডিজিটাল মন্ত্রী অড্রে ট্যাং বলেন, "মাস্ক প্রথমত, আপনাকে হাত ধুতে অনুপ্রাণিত করবে, দ্বিতীয়ত, আপনাকে মুখে হাত দেয়া থেকে থামাবে - এগুলো হচ্ছে মাস্ক পরার মূল উপকারিতা।"

১৯৫০-এর দশক থেকে তাইওয়ানের মানুষ মাস্ক পরে আসছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে মাস্কের চাহিদা।

চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেড়ে যায় মাস্কের উৎপাদনও। আগে যেখানে দিনে ২০ লাখ মাস্ক তৈরি হতো, সেখানে ২ কোটি মাস্ক তৈরি হতে লাগলো।

ফার্মেসি ও অন্যান্য দোকানে মাস্ক কেনার জন্য মানুষের এমন লম্বা লাইন লেগে যায় যে লাইনের জনসমাগম থেকেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা শুরু করে মানুষ।

তাই সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রত্যেক এলাকার মাস্কের মজুদের তথ্য জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হবে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে অড্রে ট্যাংয়ের মন্ত্রণালয় একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে যেখানে প্রত্যেক মাস্ক বিক্রেতা তার মজুদের তথ্য আপডেট করে রাখতে পারবে।

এরপর কাজ শুরু করে তাইওয়ানের হ্যাকিং কমিউনিটি, যাদের সাথে বেশ কয়েকবছর ধরে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে দেশটির সরকার।

বিভিন্ন এলাকার মাস্ক বিক্রেতাদের আপডেট করা তথ্য নিয়ে তারা 'মাস্ক ম্যাপ'-এর সিরিজ তৈরি করা শুরু করে।

এর ফলে নাগরিকরা জানতে পারতেন তাদের বাসা বা কর্মস্থলের কাছে কোথায় মাস্ক পাবেন তারা। কোন দোকানে কতগুলো মাস্ক আছে, পাওয়া যেতো সেই তথ্যও।

সরকারের সাথে জনগণের বিশ্বাসের সম্পর্ক

হ্যাকারদের তৈরি ম্যাপগুলো যত জনপ্রিয়তা পেতে থাকে, আরো হ্যাকারদের দল একত্রিত হয়ে সেইসব ম্যাপে আরো ফিচার যোগ করে মানুষের ব্যবহারের জন্য সেগুলো সহজ করে তুলতে থাকে।

এখন পর্যন্ত এক কোটির বেশি মানুষ ম্যাপগুলো ব্যবহার করেছে।

আর অড্রে ট্যাংয়ের মতে, এই প্রকল্পের সাফল্য প্রতিফলিত হয় মানুষের মাস্ক ব্যবহারের মাত্রায়। তাইওয়ানের খুব কম সংখ্যক মানুষই আছে যারা মাস্ক ব্যবহার করে না।

মিজ ট্যাং বলেন মাস্ক ব্যবহার করার জন্য তাওয়ানের মানুষ একরকম 'সামাজিক চাপ' এর মধ্যে থাকেন।

"এই প্রথমবার হ্যাকাররা নিজেদের একটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের ডিজাইনারের রূপে দেখতে পাচ্ছে। তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ তাদের জনগণকে এত বিশ্বাস করে যে, প্রতিদানে জনগণও সরকারকে কখনো কখনো বিশ্বাস করে।"

তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ আর সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কিন্তু সবসময় এরকম মসৃণ ছিল না।

২০০৩ সালে সার্স মহামারির সময় সরকার আর জনগণের সম্পর্কটা ছিল অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের। মিজ ট্যাং বলেন সেসময় প্রতিক্রিয়া ছিল 'খুবই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ।'

সেসময় তাইওয়ানের সরকার মহামারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

এরপর ২০০৪ সালে তারা গঠন করে ন্যাশনাল হেলথ কমান্ড সেন্টার, যেন ভবিষ্যতে কোনো স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সব সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে।

ঐ সময় ব্যক্তিগক সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) মজুদ করার নির্দেশ দেয় তারা, যেন পরবর্তীতে কোনো মহামারির সময় শুরু থেকে সুরক্ষা উপকরণের অভাব না হয়।

২০১৪ সালে তাইওয়ানের সরকারবিরোধী সানফ্লাওয়ার বিপ্লবের সময় বহু হ্যাকার একত্রিত হয়ে নাগরিক সমাজের নানা ধরণের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সংকলন করেছিল।

পরবর্তীতে সরকার ঐ হ্যাকারদের আমন্ত্রণ জানায় তাদের সাথে কাজ করতে। হ্যাকারদের কাছে থাকা নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চাহিদা সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে জনবান্ধব আইন তৈরি করার প্রচেষ্টা ছিল সরকারের।

বর্তমানে তাইওয়ানের ডিজিটাল মন্ত্রী অড্রে ট্যাং নিজেও সেসময় হ্যাকার ছিলেন। তিনি মনে করেন হংকংয়ের সরকার করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিতে পেরেছে তার অন্যতম প্রধান কারণ অতীত থেকে তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার তাৎপর্য শিখেছে।

তাই ডিসম্বেরের শেষদিকে তাইওয়ানের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একজন 'নেটিজেন' যখন উহানে উদ্ভূত হওয়া সার্সের মত রোগ সম্পর্কে সতর্ক করে পোস্ট দেয়ার পর তাইওয়ানের মানুষ সেটিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং সরকার মানুষের প্রতিক্রিয়ার হার দেখে বিষয়টিকে আমলে নেয়।

এর কিছুদিন পরপরই জনসংখ্যার বিশেষ বিশেষ অংশকে পরীক্ষা করা হয় এবং তাদের কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করা হয়। এই পদ্ধতি ভাইরাসকে শুরুতেই রুখে দিতে সক্ষম হয়।

গুজব বনাম রসিকতা

তাইওয়ান সফলভাবে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকানোর পেছনে আরো কারণ রয়েছে।

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে তাইওয়ানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রোগতত্ববিদ দেশটির কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের পরিকল্পনা ও অভ্যন্তরীন চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর কোয়ারেন্টিন নীতিমালার পাশাপাশি দ্বীপ দেশটির 'অতি-গণতন্ত্র' ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি মন্তব্য করেন তাদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা মানুষের বিশ্বাস অর্জনে সফল হয়েছে, যার ফলে তাদের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়েছে।

তাইওয়ানে ক্ষমতাসীনরা শুধু যে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া আমলে নেন তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় নাগরিকদের শেয়ার করা 'মিম' এবং ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের দিকেও খেয়াল রাখেন তারা।

এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে পারে সরকার।

যেমন কিছুদিন আগে এরকম একটি খবর ছড়িয়ে পরে যে মাস্ক তৈরিতে টয়লেট পেপারের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নিজেকেই ব্যঙ্গ করে একটি কার্টুন পোস্ট করেন, যেখানে প্রেসিডেন্টের পশ্চাৎদেশের একটি ছবির পাশে তুলে ধরা হয় মাস্ক তৈরির উপাদান ও টয়লেট পেপার তৈরির উপাদানের উৎসগুলো।

মিজ ট্যাং বলেন, "ঐ পোস্টটি ভীষণভাবে ভাইরাল হয়।" তার মতে এক্ষেত্রে সরকারের মূলনীতি 'হিউমার ওভার রিউমার', অর্থাৎ গুজবের চেয়ে ব্যঙ্গ উত্তম।

এই কৌশল মেনে তারা চিত্তাকর্ষক, টুইট করার মত এমন সব পোস্ট তৈরি করে থাকে, যেগুলো গুজবের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়।

মিজ ট্যাং বলেন, "এই কৌশলে অধিকাংশ মানুষেরই গুজবের আগে সেটির ব্যঙ্গ রসাত্মক ব্যাখ্যা চোখে পড়ার সম্বাবনা বেশি থাকে।"

যে সময় বিশ্বের অনেক দেশে সরকারের ওপর মানুষের অনাস্থা ও অবিশ্বাস বাড়ছে, সেসময় তাইওয়ানের মানুষ ও সরকারের মধ্যকার আস্থার ওপর ভর করে তারা মহামারি পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।

যদিও দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ শুরু হলে কৌশল পরিবর্তন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন মিজ ট্যাং।

কিন্তু সেটি হলেও সেই সিদ্ধান্ত 'পুরো সমাজের মানুষের সিদ্ধান্ত নিয়েই' নেয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।