আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে নিমেষে তিন টুকরো হলো যে তিনটি কারণে
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
পশ্চিমবঙ্গে একটানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা, মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস যে ভোটের ফল বেরোনোর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, তা অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি।
নির্বাচনে হারলে দলটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকে সেই পূ্র্বাভাস করলেও সেটা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটতে পারে, তা আসলে ধারণাই করা যায়নি।
অথচ বাস্তবে দেখা গেল, তৃণমূল কংগ্রেস শুধু ভাঙেইনি, আসলে তিন টুকরো হয়ে গেছে বলা চলে। যেটাকে অনেকেই 'ইমপ্লোশন' বা ভেতরে ভেতরে চৌচির হয়ে যাওয়া বলে বর্ণনা করছেন।
একদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে সদ্য জেতা বিধায়কদের বেশিরভাগ ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আলাদা ব্লক গঠন করে নিজেদেরই 'আসল তৃণমূল' বলে দাবি করছেন। কলকাতায় কার্যত এই গোষ্ঠীটিই রাজ্য বিধানসভায় শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে মূল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে, দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে জেতা লোকসভা এমপি-দের মধ্যে অন্তত কুড়িজন স্পিকারকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, তারা পুরনো দল ছেড়ে 'এনসিপিআই' নামে একটি অখ্যাত ও অপরিচিত দলে মিশে যাচ্ছেন – এবং তারা কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এনডিএ-কেই সমর্থন করবেন।
আর এই দুই গোষ্ঠীর থেকেই সম্পূর্ণ আলাদাভাবে – কাগজেকলমে এখনো যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী, সেই মমতা ব্যানার্জী তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই শুরু করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমে দলের এই অংশটিকে মমতা ব্যানার্জীর বাসভবন শহরের যেখানে, সেই এলাকার নামানুসারে 'কালীঘাট তৃণমূল' নামে ডাকাও শুরু হয়ে গেছে।
এবং এই 'কালীঘাট তৃণমূলে'র সঙ্গে হাতেগোনা খুব অল্প কয়েকজন নেতা বা জনপ্রতিনিধিই রয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই সে দিনও দোর্দন্ডপ্রতাপে যারা রাজ্য শাসন করছিল - সেই ২৮ বছরেরও বেশি পুরনো একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে মাত্র ২৮ দিনের মধ্যেই এভাবে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে?
বিশেষত যেখানে মমতা ব্যানার্জীর মতো শক্তিশালী, অভিজ্ঞ, জনপ্রিয় ও মানুষের নাড়ির খবর রাখা রাজনীতিবিদ দলটির সর্বময় কর্তৃত্বে ছিলেন – তিনিও কেন দলটির ভাঙন ঠেকতে পারলেন না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিবিসির বিশ্লেষণে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, এই প্রতিবেদনে সেগুলোই একে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে।
তৃণমূলের নির্বাচন-সর্বস্ব রাজনীতি
ভারতের 'গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি' কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হলেও তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শ বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, তা নিয়ে চিরকালই বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতা ছিল।
অনেকেই মনে করেন, মমতা ব্যানার্জীর দলে যদি কোনো 'ইজম' থেকে থাকে, সেটা ছিল কেবল 'পপুলিজম'। মানে তিনি সব সময় জনমোহিনী নীতি নিয়ে চলেছেন, মানুষের কাছে যেটা স্বল্পমেয়াদে আকর্ষণীয় হবে সে দিকেই ঝুঁকেছেন।
কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করে বছরের পর বছর ট্রেনে যাত্রীভাড়া বাড়াতে দেননি। ফলে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিরাগভাজন হয়েছেন।
আসলে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের গঠন থেকে শুরু করে ২০১১তে রাজ্যে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তার রাজনীতির এক ও একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল সিপিআইএম-কে হঠিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা।
এই যে একটা দলের রাজনীতির সব কর্মকান্ডের অভিমুখ ছিল যেন তেন প্রকারে নির্বাচনে জেতা – এই নির্বাচন সর্বস্বতার জন্যই এখন মমতা ব্যানার্জীকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস।
পরপর তিনটি নির্বাচনে জেতার পর চতুর্থ নির্বাচনে হারা-মাত্র যেভাবে মমতা ব্যানার্জীর একদা অনুগত নেতারা তাকে ফেলে রেখে অন্য রাস্তায় হাঁটছেন – তা এটাই প্রমাণ করে যে ওই নেতারাও বিশ্বাস করেন ভোটে হেরে গেলে দলটির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
মমতা ব্যানার্জীও সম্ভবত অবচেতনে এটা জানেন – যে কারণে চৌঠা মে নির্বাচনী ফল প্রকাশ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি গণতন্ত্রের রায় মেনে নিয়ে পরাজয় অবধি স্বীকার করেননি। বরং ভবানীপুর কেন্দ্রে তার হারকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতেও গেছেন।
তিনি এমনও বলেছেন, "আমি হারিনি, আমাকে হারানো হয়েছে। কাজেই আমি কেন পদত্যাগ করতে যাব?" বস্তুত তিনি ভোটে হারার পর রাজ্যপালের কাছে কোনো পদত্যাগপত্রও জমা দেননি।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কংগ্রেস, বিজেপি বা অন্য সব আঞ্চলিক বড় দলেরই ভোটে হারার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু ভোটে হারার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পার্টি উঠে যাওয়ার উপক্রম – এমন দৃষ্টান্ত আর নেই বললেই চলে।
আসলে বিজেপির ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শিক অভিভাবক আরএসএস-এর সংগঠন ও কর্মকান্ড – কিংবা কংগ্রেসের ক্ষেত্রে একটা সেন্টার-লেফট রাজনৈতিক পরিসর বা সোশ্যালিস্ট, উদারপন্থী ধ্যানধারণা ভোটে হারার পরও দলগুলোর অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। বামপন্থীদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই যুক্তি খাটে।
এমন কী, প্রতিবেশী বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল, তখনো কিন্তু সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বা আদর্শগত ভিত্তি নিয়ে কাজ করে তারা অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রেখেছে। তাদের মোটেই নিশ্চিহ্ন করা যায়নি।
কিন্তু চৌঠা মে-র পর তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা যেন সহসা আবিষ্কার করলেন, ভোটে হারার পর তাদের হাতে এমন কিছুই নেই – যেটাকে আঁকড়ে ধরে তারা পুরনো ধাঁচে রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারেন, মানুষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে পারেন।
প্রথমবার রাজ্যের ক্ষমতায় এসে মমতা ব্যানার্জী যে 'মা-মাটি-মানুষে'র সরকারের কথা বলতেন, সেটার ভিত্তিও যে আসলে বেশ দুর্বল ছিল, তা এ থেকে বোঝা কঠিন নয়।
কিংবা একে একে তার সরকার 'সবুজ সাথী', 'কন্যাশ্রী', 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' বা 'যুবসাথী'র মতো যে সব ভাতা বা উন্নয়ন প্রকল্প চালু করেছিল তারও নির্বাচনী ফায়দা একটা সময়ের পর সঙ্কুচিত হয়ে এসেছিল।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েও তৃণমূল কংগ্রেস যে এত তাড়াতাড়ি খানখান হয়ে গেল, তার একটা বড় কারণ তাই নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে দলটাকে বিস্তৃত করতে না পারা।
'ক্যাটালিস্টে'র ভূমিকায় বিজেপি
চৌঠা মে-র নির্বাচনী বিপর্যয় মমতা ব্যানার্জীকে যে তার রাজনৈতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে 'ভালনারেবল' বা বিপন্ন অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং তার এই দুর্বলতম মুহুর্তে তাকে আঘাত করার কোনো সুযোগই ছাড়েনি বিজেপি।
কেন্দ্রে ও রাজ্যে শাসক দলের ভূমিকায় থাকা বিজেপি বিলক্ষণ বুঝেছে, মমতা ব্যানার্জীকে আঘাত করার এটাই সেরা সময় – এবং তৃণমূলকে ভাঙাতে পারলে কলকাতা ও দিল্লি, উভয় জায়গাতেই তাদের লাভ।
আসলে 'কালীঘাট তৃণমূলে'র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কলকাতায় যে বিধায়করা বা দিল্লিতে যে সংসদ সদস্যরা আলাদা গোষ্ঠী বা দল গড়েছেন – তাদের পেছনে যে বিজেপির সক্রিয় মদত ছিল এটা কোনো গোপন কথা নয়।
বিদ্রোহী বিধায়কদের নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী দল ভাঙার আগে দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে 'সৌজন্য সাক্ষাৎ' করেছেন – অন্য দিকে বিদ্রোহী এমপি-রা তাদের বৈঠকই করেছেন বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বসে।
আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে গোটা অপারেশনটি আড়াল থেকে তদারকি করেছেন, দিল্লিতে কান পাতলেই সে কথা শোনা যায়।
কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব ঠিক কোন হিসেব কষে কলকাতায় ও দিল্লিতে আলাদাভাবে তৃণমূলকে ভাঙতে চেয়েছেন?
এর জবাবে বলতে হয়, প্রশাসক মমতা ব্যানার্জীর চেয়ে বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জী যে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী – একথা সবাই জানেন। রাজ্যে প্রথমবার ক্ষমতায় আসা বিজেপি স্বভাবতই চেয়েছে বিরোধী নেত্রীর রাশ মমতা ব্যানার্জীর হাত থেকে একটি 'বন্ধুত্বপূর্ণ' বিরোধী দলের হাতে যাক।
বস্তুত পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করা ছিল বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন – সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর তারা স্বভাবতই চাইবে মমতা ব্যানার্জীর মতো রাজপথের আন্দোলন করে আসা একজন নেত্রীর বদলে এমন বিরোধী দল পেতে, যারা 'গঠনমূলক সমালোচনা'তেই বেশি জোর দেবে।
ঋতব্রত ব্যানার্জী-সন্দীপন সাহার মতো নেতাদের সামনের রেখে তারা সেই লক্ষ্যই হাসিল করতে চেয়েছে। তার সঙ্গে যদি এদের মাধ্যমে তৃণমূলের ঘাসফুল প্রতীক বা ব্যাংক ব্যালান্সও ছিনিয়ে নেওয়া যায়, সেটা হবে উপরি লাভ।
আর দিল্লিতে তৃণমূলকে ভাঙানোর পেছনে কাজ করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে আরো শক্তিশালী করার অঙ্ক।
২০২৪-র সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তাদের আসনসংখ্যা ২৪০-এই আটকে গিয়েছিল। ফলে তৃতীয় মেয়াদের মোদী সরকারের টিঁকে থাকাটা তেলুগু দেশম বা জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর মতো শরিক দলগুলির সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের টিকিটে জিতে আসা এমপি-দের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যককে ভাঙিয়ে বিজেপি এমন একটা নতুন ব্লক তৈরি করতে চেয়েছে – যারা এনডিএ-কে সমর্থন করবে এবং তাতে লোকসভায় সরকারের শক্তিও ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে।
কাকলি ঘোষদস্তিদার, সুদীপ ব্যানার্জী বা শতাব্দী রায়দের মতো এমপি-দের সামনে রেখে বিজেপি দিল্লিতে ঠিক এই কাজটাই করেছে।
ফলে কলকাতা ও দিল্লি – উভয় জায়গাতেই তৃণমূলের ভাঙন বিজেপির জন্য 'উইন উইন সিচুয়েশন' সৃষ্টি করেছে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, তারা কিন্তু বিধানসভা বা লোকসভা - কোথাওই বিদ্রোহীদের বিজেপি-তে মিশিয়ে নেয়নি বা নিজেদের দলে কাউকে ঠাঁই দেয়নি।
মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে হাতেগোনা যে ক'জন নেতা টিঁকে আছেন তাদের অন্যতম কল্যাণ ব্যানার্জী সে কারণেই বিবিসিকে দিনকয়েক আগে বলছিলেন, "দেখবো এদের মধ্যে থেকে ক'জনকে বিজেপি নিজেদের দলে নেয়! দেখবেন একজনকেও নেবে না।"
তার বক্তব্য ছিল, যারা বিদ্রোহী শিবিরে গেছেন তারা আসলে 'বিশ্বাসঘাতক' ও 'চরম লোভী' বলে নিজেদের প্রমাণ করে দিয়েছেন – এবং এই সব 'বদ রক্ত' বেরিয়ে যাওয়ায় তৃণমূলের আখেরে ভালই হবে।
এনডিএ-কে সমর্থন করা বিদ্রোহী এমপি-দের ক'জন ২০২৯র ভোটে নিজের কেন্দ্রে বিজেপির সমর্থন পাবেন বা বিজেপি তাদের আসন ছেড়ে দেবে, সেটাও বলা মুশকিল। যদিও সেটা এখনো প্রায় তিন বছর পরের কথা।
তবে দলের যে বিধায়ক বা এমপি-রা 'বিদ্রোহে' সামিল হয়েছেন – তারা যে বিজেপির প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় পেয়েছেন বলেই আপাতত বিদ্রোহ করার সাহস দেখিয়েছেন, এটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই!
অভিষেক ব্যানার্জী ফ্যাক্টর
তৃণমূল কংগ্রেসের ছোট-বড়-মাঝারি যত নেতা গত কয়েক সপ্তাহে 'বিদ্রোহী' হয়েছেন, তারা প্রায় প্রত্যেকে একবাক্যে বলেছেন – দলের মধ্যে একটা 'দমবন্ধ করার মতো পরিস্থিতি' তৈরির জন্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী একজন মাত্র ব্যক্তি।
তিনি আর কেউ নন, অভিষেক ব্যানার্জী – মমতা ব্যানার্জীর প্রিয় ভাইপো এবং অঘোষিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী।
গত বহু বছর ধরেই অভিষেক ব্যানার্জীকে প্রথমে তৃণমূলের 'যুবরাজ' ও পরে 'সেনাপতি' বলে ডাকতেন দলের নেতা-কর্মীরা, কিন্তু এটাও তাদের জানা ছিল যে দলের রাজ্যপাটের রাশ আসলে ছিল সেই সেনাপতির হাতেই।
বস্তুত অভিষেক ব্যনার্জী যেভাবে 'কর্পোরেট কায়দায়' দল পরিচালনা করতেন এবং নিজের চারদিকে একটা ঘনিষ্ঠদের বলয় নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন – তাতে দলের নিচুতলার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের একটা অবধারিত দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
দিনকয়েক আগে রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করা সাবেক তৃণমূল নেতা সুখেন্দুসুখর রায় যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "একজন তো সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। তার সঙ্গে কখনোই যোগাযোগ করা যেত না।"
অভিষেক ব্যানার্জীর নাম না করলেও সুখেন্দুশেখর রায়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল তার দিকে নিশানা করেই।
যেভাবে অভিষেক ব্যানার্জী "আট-দশজন পেটোয়া লোককে নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন" অথবা "কিছু বলতে গেলেই চ্যালাচামুন্ডাদের কাছে শুনতে হতো তুই বেশি বুঝিস!" – তারও খোলাখুলি সমালোচনা করেন মি রায়।
তৃণমূলের সঙ্গে বহু বছর ধরে যুক্ত নেতারা অনেকেই জানাচ্ছেন, অভিষেক ব্যানার্জী আসলে দলটি পরিচালনার মৌলিক ভিত্তিটাই পাল্টে দিয়েছিলেন – যা তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ক্ষতি করেছে।
তাদের মতে, মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল তিনি মানুষের 'পলিটিক্যাল পালস' খুব ভাল বুঝতেন, সাধারণ মানুষের আবেগ বা চাওয়া-পাওয়াকে রাজনীতিতে সফলভাবে মিশিয়ে দিতে পারাটা ছিল তার সাফল্যের একটা বড় কারণ।
অভিষেক ব্যানার্জী কিন্তু দলের ভেতরে 'কর্পোরেট-সুলভ শৃঙ্খলা' আমদানি করতে গিয়ে সেই আমজনতার সঙ্গেই তৃণমূলের একটা বিরাট দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছিলেন।
তার ওপর কয়েক বছর আগে তিনি নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা 'আই-প্যাক'কে যেভাবে তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণের কাজে যুক্ত করেছিলেন – তা শুরুতে ফল দিলেও পরে দলের অন্দরেই তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল।
দলের বহু নেতা প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন, আই-প্যাকের বেতনভুক পেশাদার কর্মীরা কার্যত তৃণমূল কংগ্রেস দলটাকেই 'হাইজ্যাক' করে নিয়েছিল – কোন কেন্দ্রে কে টিকিট পাবেন থেকে শুরু করে নেতারা ভাষণে কে কী বলবেন, সবই ঠিক হচ্ছিল ওই সংস্থার ইশারায়।
আর এটা পুরোটাই ঘটছিল অভিষেক ব্যানার্জীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ও নির্দেশে। সায় ছিল মমতা ব্যানার্জীরও, প্রিয় ভাইপোর প্রতি যার 'অন্ধ স্নেহ' দেখানো নিয়েও এখন বিদ্রোহী নেতারা খোলাখুলি কথা বলছেন।
এর পাশাপাশি রয়েছে অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির ভূরি ভূরি অভিযোগ – যা তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সন্দেহাতীতভাবে।
তবে তার বিরুদ্ধে প্রায় সব মামলাই হয় আদালতে বিচারাধীন বা সেগুলোর তদন্ত চলছে, কোনো কোনোটাও তাকে জেরাও করা হচ্ছে – কিন্তু এই মুহুর্তে তাকে 'অভিযুক্ত'-র বেশি কিছু বলা যাবে না।
অথচ অভিষেক ব্যানার্জী এমন একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে গেছে যে তৃণমূলের প্রায় সব বিদ্রোহী নেতাই মনে করছেন, দলের এই তথাকথিত সেনাপতির দিকে আঙুল তুলেই তারা নিজেদের শিবির বদলানোর পদক্ষেপকে 'জাস্টিফাই' করতে পারবেন।
অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, অভিষেক ব্যানার্জী তৃণমূলে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যে দলের পুরনো নেতারা শুধু তার ঘাড়ে বন্দুক রেখেই নিজেদের দলবদলের হয়ে সাফাই গাইছেন এবং সেটা করে মানুষের চোখে পার পাওয়া যাবে বলেও বিশ্বাস করছেন।
তাই তৃণমূল কংগ্রেস এত দ্রুত তিন টুকরো হওয়ার পেছনে সম্ভবত এককভাবে সবচেয়ে বড় কারণ অভিষেক ব্যানার্জী নিজেই।