করোনা ভাইরাস : ভারতে করোনা চিকিৎসার খরচে ঊর্দ্ধসীমা কি বাঁধা যাবে?

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

ভারতে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দু লক্ষ ৩৬ হাজারেরও বেশি। গত কয়েকদিন ধরেই দিনে ৯ হাজারেরও বেশি নতুন সংক্রমণ ধরা পড়ছে। মহামারি যখন এরকম একটা পরিস্থিতিতে, তখন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত প্রশ্ন তুলেছে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার খরচ নিয়ে।

বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।

শনিবার ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রক যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে দু লক্ষ ৩৬ হাজার মানুষ করোনা সংক্রমিত হলেও তার মধ্যে এক লাখ ১৪ হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সেরে ওঠা রোগীদের একটা বড় অংশেরই চিকিৎসা হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে - একেবারে বিনামূল্যে।

আবার কিছু বেসরকারি হাসপাতালের দখল নিয়েছে সরকার, যেখানে চিকিৎসার খরচ রোগীকে দিতে হচ্ছে না - সরকারই তা মিটিয়ে দিচ্ছে।

তবে এমন অনেক বেসরকারি হাসপাতাল আছে, যেখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করা হলেও মাত্রাতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

চিকিৎসা বিভ্রাট সংক্রান্ত অভাব অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি লড়াই চালায় পিপলস ফর বেটার ট্রিটমেন্ট নামের সংগঠনটি।

তার প্রধান, ডা. কুনাল সাহা বলছিলেন, "আমাদের কাছে এরকম অনেক অভিযোগ আসছে যে লাগামছাড়া বিল ধরানো হচ্ছে। কিন্তু এটাও বলে রাখা দরকার, ওই অভিযোগগুলির মূল বিষয় কিন্তু হাসপাতালের বেশি চার্জ নেওয়া নয়। সবগুলি অভিযোগই হয়েছে রোগীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায়।

''রোগীদের পরিবার পরিজনরা বলছেন হাসপাতাল থেকে জানানোই হচ্ছে না সঠিক ভাবে যে কী কী চিকিৎসা করা হচ্ছে! এর সঙ্গে বাড়তি খরচ নেওয়ার অভিযোগও যোগ করছে অনেক পরিবার," বলছেন ডা. কুনাল সাহা।

বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে কেন করোনা চিকিৎসায় অতিরিক্ত বিল নেওয়া হচ্ছে?

এ প্রশ্নে কলকাতার হাসপাতাল গোষ্ঠী এ এম আর আইয়ের প্রধান কার্যনির্বাহী অফিসার রূপক বড়ুয়া অতিরিক্ত অর্থ নেবার অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন বরং তাদের খরচ বেড়ে গেছে।

"আমাদের হাসপাতালগুলির কথা বলতে পারি। এখানে অতিরিক্ত বিল নেওয়ার প্রশ্নই নেই। তবে এটাও ঠিক যে রোগী আর হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মী - ডাক্তার, নার্স - এদের দুই পক্ষেরই সুরক্ষার খাতিরে আমাদের যে পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি কিনতে হচ্ছে, হাসপাতাল ভবনকে বারবার জীবাণুমুক্ত করতে হচ্ছে - এগুলোর একটা বাড়তি খরচ লাগছে। কিন্তু সংক্রমণ শুরুর দিকে এসবের দাম যতটা চড়া ছিল, এখন দাম অনেক কমেছে, আমরাও কিন্তু বিলে কম দামটাই নিচ্ছি," বলছিলেন মি. বড়ুয়া।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

এধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা হয়, যার শুনানি চলাকালীন শুক্রবার আদালত বলেছে যে বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার খরচের উর্দ্ধসীমা বেঁধে দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে।

তারা আরও বলেছে যে বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না, কিন্তু একটা সীমা রাখা যায় কি না, তা দেখতে হবে - বিশেষত যেসব হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে জমি পেয়েছে - তাদের ক্ষেত্রে।

কেন্দ্রীয় সরকারের যে 'আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প' আছে, সেই অনুযায়ী করোনা চিকিৎসার খরচ বেঁধে দেওয়া যায় কি না, তাও সরকারকে জানাতে হবে।

এএমআরআই হাসপাতালের প্রধান হওয়ার পাশাপাশি মি. রূপক বড়ুয়া কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি বা সিআইআই-য়ের স্বাস্থ্য পরিষেবা বিষয়ক সাব কমিটির পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান।

স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে তিনি বলছেন, "যদি এরকম একটা ঊর্দ্ধসীমা বেঁধে দিতেই হয়, আমার মনে হয় সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সেটা করা উচিত। যদি কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল লোকসানের আশঙ্কায় পরিষেবা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।

''কারণ করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর থেকে চিকিৎসক, নার্সদের বেতন, তাদের গাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে আসা, হাসপাতাল চত্বর সুরক্ষিত রাখা এসবের জন্য খরচ অনেকটা বেড়ে গেছে, অন্যদিকে সাধারণ রোগী আসা অনেকটা কমে গেছে," বলছেন রূপক বড়ুয়া।

ডা. কুনাল সাহাও মি. বড়ুয়ার এই কথার সঙ্গে কিছুটা সহমত যে বেসরকারি হাসপাতাল পরিষেবা না দিতে পারলে এই মহামারির সময়ে আখেরে সাধারণ মানুষেরই সমস্যা হবে। তবে বাড়তি যে খরচ হাসপাতালগুলির হচ্ছে, তা সরকারের বহন করা উচিত বলে তার মত।

বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল যেমন করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা প্যাকেজ তৈরি করেছে, তেমনই আবার তামিলনাডুর মতো রাজ্যের সরকার চিকিৎসক সংগঠনগুলির কাছেই জানতে চেয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালে কোন ধরণের করোনা চিকিৎসায় কত ‌ঊর্দ্ধসীমা রাখা যেতে পারে।

ভেন্টিলেটর লাগলে একরম প্যাকেজ, শুধু আইসিইউতে থাকলে ভিন্ন, আর যদি এসব কিছুরই প্রয়োজন না হয়, সাধারণ বেডে থেকেই রোগী সেরে ওঠেন, তাহলে তার জন্য আর একরম খরচ ধরা হচ্ছে ওইসব প্যাকেজে।