আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
করোনা ভাইরাস: ভারতে 'ঈশ্বরতুল্য' ডাক্তারদের প্রতি বৈরিতা কেন?
- Author, মালবী গুপ্ত
- Role, সাংবাদিক, কলকাতা
- Published
যমালয়ে জীবন্ত মানুষের যাওয়ার কথা নয় ঠিকই। তবে ভারতের নানা রাজ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া একরকম যমের দুয়ারে কড়া নাড়ারই শামিল। সেটা খানিকটা যেন প্রমাণ হল দেশ জুড়ে সাম্প্রতিক কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ ঘটায়। সে কথায় পরে আসছি।
এই মুহূর্তে আমি খুবই আশঙ্কিত হচ্ছি এই দেখে , যে যুদ্ধে তাঁরাই প্রধান সৈনিক, তাঁরা ছাড়া যে যুদ্ধটা জেতাই সম্ভব নয়, দেশে সেই তাঁরাই বার বার হেনস্তা আর আক্রমণের শিকার হচ্ছেন!
হ্যাঁ বলছি, সেইসব ডাক্তারদের (যাদেরকে কেউ কেউ 'ঈশ্বরতুল্য' মনে করেন) কথা, বলছি সেই অগণিত নার্স আর স্বাস্থ্য কর্মীদের কথা, যাদের উদয়াস্ত চিকিৎসায়, সেবায়, যত্নে লক্ষ লক্ষ কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগী এখন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছেন।
অথচ বার বার তাঁদেরই মাথায় গেঁথে দেওয়া হচ্ছে অপমান, লাঞ্ছনা আর নিগ্রহের কাঁটা। যে কাঁটার যন্ত্রণা কেউ কেউ সহ্য করতে পারছেন না। যেমন পারেননি পশ্চিমবঙ্গে জলপাইগুড়ি জেলার সিনিয়র মেডিকেল সুপারভাইজার দেবাশিষ চক্রবর্তী।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা
সম্প্রতি গ্রামবাসীদের দ্বারা প্রবল নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর অপরাধ ছিল, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশ পালনে ঘুঘুডাঙায় গিয়েছিলেন তিনি। যেখানে সদ্য ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকদের কেউ কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত কি না জানতে তাঁদের সোয়াব নমুনা পরীক্ষা কেন্দ্র, 'কিয়স্ক' গড়ে তোলার জন্য।
আর সেখানেই গ্রামবাসীদের হাতে ওই প্রবীণ মানুষটি চরম নিগৃহীত হন। (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
প্রায়শই সংবাদ মাধ্যমে দেখছি, নিজেদের উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই, চিকিৎসক ও সেবা কর্মীরা অনেক সময়ই জীবনের প্রবল ঝুঁকি নিয়েও কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের সুস্থ করার চেষ্টা করছেন। আর দেশের নানা রাজ্যে আমাদেরই কোনো কোনো সহনাগরিক তাঁদের প্রতি ছুঁড়ে দিচ্ছেন বিদ্রূপ, কটূক্তি।
তাঁদের কোথাও পুলিশ, কোথাও পাড়া প্রতিবেশীদের হাতে দৈহিক নির্যাতন ঘটছে। কোথাও কোথাও একঘরে করে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। এমনকি সেবিকাদের ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
আশ্চর্য, নিজেদের অসুস্থতায় সব সময় যাদের দ্বারস্থ হই আমরা, সেই তাঁদের প্রতি কীভাবে এই নিষ্ঠুর আচরণ সম্ভব? এই মুহূর্তে যাদের মাথায় করে রাখার কথা, তাঁদের প্রতি এমন ঘৃণা, এমন কুৎসিত দুর্ব্যবহারে তো লজ্জায় অধোবদন হতে হচ্ছে।মনে হচ্ছে, এক বিপুল কলঙ্কের বোঝা যেন আমাদের সকলের মাথার ওপরই চেপে বসছে।
অবশ্য এমনটা শুধু ভারতেই নয়, ঘটছে বিশ্বের আরও কিছু দেশেও - আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।
সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব
অথচ দেশের নানা জায়গায় এই ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের অনেকেই নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের পরিষেবা দিতে গিয়ে নিজেরাই তাঁদের দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছেন। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। এবং প্রায় সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবেই এমন অঘটন ঘটছে।
লেখার সময় পর্যন্ত জানতে পারছি, ভারতে সরকারি হিসেবে ৫৪৮ ডাক্তার, ২৭৪ নার্স ও প্যারামেডিক আক্রান্ত। অবশ্য এর বাইরেও রয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত আরও বিপুল সংখ্যক কর্মী। এবং যে হারে তাঁদের দেহে সংক্রমণ ঘটছে, তাতে দেশে একের পর এক সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
সন্দেহ নেই বর্তমানে করোনাভাইরাসের হামলায় বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমাদের দেশে এমনিতেই জনসংখ্যার তুলনায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চূড়ান্ত অভাব। ডাক্তারের সংখ্যাও কম।
যেমন, ভারতে একজন সরকারি অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারকে গড়ে ১১০৮২ জন রোগী দেখতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'র নির্দেশিকায় ডাক্তার - রোগীর অনুপাত যেখানে ১ : ১০০০ এর কথা বলা হয়েছে। এতেই বোঝা যায় কী প্রবল চাপ সহ্য করতে হয় তাঁদের।
তার ওপর দেশে জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সেভাবে চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়েই ওঠেনি। তাই প্রতি বছর রুগ্ন, চূড়ান্ত অব্যবস্থায় চলা সরকারি হাসপাতালগুলিতে শুধু শিশু মৃত্যুই ঘটে হাজার হাজার। (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
এই সমস্যা বছরের পর বছর গভীরতর হয়েছে। আর এ ব্যাপারে সরকারি অবহেলা, ঔদাসীন্যও যে প্রায় আকাশ ছোঁয়া, বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের দিকে একবার দৃষ্টি ফেরালেই তা অনুমান করা যায়।
দেখা যাচ্ছে, জন স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও স্বাস্থ্য পরিষেবায় ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির থেকেও কম অর্থ ব্যয় করে। এমনকি ব্রিকস ( ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, সাউথ আফ্রিকা ) ভুক্ত দেশগুলির মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে সব থেকে কম খরচ করে ভারত। ( আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন)
অথচ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যতই দুর্বল হোক, পরিষেবা যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, উত্তরোত্তর বেড়ে চলা চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের দরিদ্ররা ক্রমশই আরো দারিদ্রের অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন।
ধৈর্যচ্যুত আত্মীয় পরিজন
হয়তবা সেই কারণে বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তাঁর ধৈর্যচ্যুত আত্মীয় পরিজনদের হাতে ভাঙচুর চলে। ডাক্তারদের সামনে পেয়ে তাঁদের ওপরই চড়াও হন তাঁরা।
একথা সত্য যে, গোটা পৃথিবীর মতোই ভারতও এই অভূতপূর্ব কোভিড ১৯ এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। সরকারি হিসেবে ভারতে সংক্রমণ লক্ষাধিক হলেও কোভিড ১৯ এ মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। যা আমেরিকা বা ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় কম। অবশ্য তার জন্য ভারতের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা পরিষেবার কৃতিত্ব কতটা জানি না।
দু'মাস ধরে গৃহবন্দি
তবে হ্যাঁ, আমরা বিষয়টিকে অতি আত্মবিশ্বাসী পাশ্চাত্যের মতো অত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিনি। এবং প্রথমে কিছু ভুল ভ্রান্তি থাকলেও গোটা দেশবাসীকে প্রায় দু'মাস ধরে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। তার একটা প্রভাব নিশ্চয়ই আছে।
যদিও তাতে সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং ক্রমশই তা ঊর্ধমুখী। তবে মৃত্যুর সংখ্যা এত কম হওয়ায়, কি জানি আমার মনে হচ্ছে, বছর বছর ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর মতো মারি নিয়ে ঘর করা দেশবাসীর স্বাভাবিক প্রতিরোধী ক্ষমতা হয়তো অন্য দেশের তুলনায় বেশি। সেই ক্ষমতায় আমাদের শরীর শেষ অবধি হয়তো লড়াইয়ে জিতে যাচ্ছে ।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান এই সংক্রমণের দরুণ নানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া অব্যাহত থাকায়, বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে অন্য রোগীদের জীবনে। কারণ মাসের পর মাস দেশে লকডাউনের প্রভাবে অসংখ্য ক্যানসার, থ্যালাসেমিয়ার রোগীর মতো অন্যান্য রোগীরাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সব থেকে আশঙ্কার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শিশুদের ইমুনাইজেশনের মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আরও জানতেএখানে ক্লিক করুন।
অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো পশ্চিমবঙ্গে ভিন রাজ্য থেকে আসা কয়েক'শ নার্সও বেসরকারি হাসপাতালগুলি থেকে সম্প্রতি নিজেদের রাজ্যে ফিরে গেছেন করোনা সংক্রমণের ভয়ে। সন্দেহ নেই এর ধাক্কাও এসে লাগবে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থায়।
তাই মনে হচ্ছে, এমনিতেই রক্তহীন, অধুনা ঘোর সঙ্কটে পড়া সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থারই এখন যেন প্রায় নাভিশ্বাস উঠছে। তার ওপর এই করোনা মহামারিতে যে অনিশ্চয়তা, যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা, তাতে নাগরিক জীবনে দিগন্তব্যাপী এক আশঙ্কার ঘন মেঘ যেন ঘনিয়ে উঠেছে।
অবশ্য এই করোনা ও লকডাউনোত্তর দেশের প্রায় 'আইসিইউ'তে চলে যাওয়া অর্থনীতিকে অক্সিজেন জোগাতে ২০ লক্ষ কোটি রুপির বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন দেশের অর্থমন্ত্রী। তাতে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে কিছু প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দ 'সামান্য'ই বেড়েছে।
কিন্তু তা দিয়ে বর্তমানে করোনা মোকাবিলা সমেত দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবায় আগামী দিনগুলিতে কতটা প্রাণ সঞ্চার করা যাবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। কারণ অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রীরা প্রতিশ্রুতি বিতরণে যত উৎসাহী, যত পারঙ্গম, তার রূপায়নে তাঁরা ততই উদাসীন, ততই ব্যর্থ।