এডিটার'স মেইলবক্স: আমেরিকার বর্ণবাদ আর বাংলাদেশে করোনাভাইরাস

    • Author, সাবির মুস্তাফা
    • Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published

গত কয়েকদিন আমেরিকায় বর্ণবাদ এবং পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভের খবর মনে হয় করোনাভাইরাসকেও ছাপিয়ে গেছে। পুলিশের হাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বহু বছরের চেপে রাখা ক্ষোভ যেন ফেটে পড়ছে।

তবে সে বিষয়ে যাবার আগে জানিয়ে রাখি, গত মাসের ৩০ এবং ৩১ তারিখে বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে আমাদের রেডিও অনুষ্ঠানগুলো লাইভ স্ট্রিমিং হয়নি এবং পরবর্তীতে অন-ডিমান্ডেও তা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অনেকেই চিঠি লিখেছেন। কারিগরি সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এবং আমাদের রেডিও অনুষ্ঠানগুলো আবার বিবিসি বাংলা ওয়েবসাইটে শোনা যাচ্ছে।

যাই হোক, অনেকেই জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু এবং তার পরিণাম নিয়ে মন্তব্য করেছেন এবং সেরকম কয়েকটি চিঠি দিয়ে শুরু করছি। প্রথমে লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:

''পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এখন উত্তাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যে পুলিশ সদস্য এ'কাজ করেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার পরিবর্তে উল্টো প্রতিবাদকারীদেরই কঠোর হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আজকের দিনেও এ ধরনের বর্ণবাদী আচরণ আমাদের দেখতে হচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্নটি এসে যায়, সভ্যতা এখনো কত দূরে? আর জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কি এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই?''

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিক থেকে বিশ্বের সব চেয়ে অগ্রগামী জাতি। কিন্তু এই রাষ্ট্রের সৃষ্টি-লগ্ন থেকেই বর্ণবাদ তার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে বসে আছে। মার্কিন সভ্যতা এখানে এসেই আর দৃশ্যমান থাকে না। তার সাথে যোগ হয়েছে দেশের সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ বাহিনীর নির্যাতন - যেখানে প্রতি নিয়ত বর্ণবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই সমস্যার সমাধান অন্য কোন দেশ বা জাতিসংঘের মত কোন প্রতিষ্ঠান দিতে পারবে না। আমেরিকার জনগণকেই আন্দোলন করে প্রতিবাদ করে সংস্কার করতে হবে।

মার্কিন সমাজে বর্ণবাদের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:

''আমেরিকা শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত হলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের আড়ালে এক শ্রেণির দুষ্ট বর্ণবাদী দীর্ঘকাল ধরে তাদের অন্তরে জঘন্য ধরণের বর্ণবৈষম্য ও প্রতিহিংসা লালন করে আসছে। সরকারের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া এদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা বেশ কঠিন।

''আমেরিকার পূর্ববর্তী অনেক ঘটনায় প্রশাসন ও বিচার বিভাগে শ্বেতাঙ্গ মনোভাবের কারণে এদেরকে আইনের আওতায় আনা যায়নি, যা খুবই দুঃখজনক। যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও বর্ণবাদী ধারণা পোষণ ও লালন করেন, সেখানে আমার প্রশ্ন, এসব সমাজে বর্ণবৈষম্য ও প্রতিহিংসা কি আদৌ সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব? নাকি বিচ্ছিন্নভাবে এসব ঘটনা যুগ যুগ ঘটতেই থাকবে?''

ভাল প্রশ্ন করেছেন মি. রহমান। আমেরিকাতেও অনেকেই বলছেন, দু'একটি ঘটনার জন্য চার-পাঁচজন পুলিশের বিচার করে কিছু হবে না, কারণ বর্ণবাদের শিকড় অত্যন্ত গভীরে চলে গেছে এবং পুলিশের নির্যাতনমূলক ক্ষমতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সেজন্য আমেরিকার বিচার ব্যবস্থায়, অর্থাৎ পুলিশ, আদালত এবং কারাগার ব্যবস্থায়, আমূল সংস্কার প্রয়োজন।

কিন্তু এই সংস্কারের জন্য যে রাজনৈতিক সাহস এবং সদিচ্ছা দরকার, সেটা আদৌ আছে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে। কারণ, চলমান ব্যবস্থা থেকে যারা লাভবান হচ্ছে, তারা বারবারই সংস্কার প্রতিহত করে আসছে। দেখা যাক, এবার ভিন্ন কিছু হয় কি না। আর পাঁচ মাস পরেই আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে, এবং তার ফলাফলের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে।

এবার আসি করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে। বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ভিন্ন একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকামে মাহমুদ চৌধুরী:

''করোনার প্রভাবে বিদেশী সিরিয়াল বন্ধের প্রেক্ষিতে বিদেশী চ্যানেল থেকে বাংলাদেশের মানুষজন যখন সংবাদের জন্য দেশীয় চ্যানেলের দিকে ঝুঁকছে সেই সংগে পাল্লা দিয়ে দেশীয় চ্যানেলের বিজ্ঞাপনের মাত্রাও মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। যেন টিভি চ্যানেল গুলোতে সংবাদ নয় বিজ্ঞাপন দেখার জন্যই চালানো হয় অর্থাৎ বিজ্ঞাপনের মধ্যে সংবাদ দিয়ে সংবাদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। যা বড়ই হতাশাজনক।''

বিষয়টি বেশ ব্যতিক্রমী মনে হচ্ছে মি. চৌধুরী। করোনাভাইরাস এবং লকডাউনের কারণে বাংলাদেশেসহ গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে চরম মন্দা চলছে। এই অবস্থায় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে জেনে একটু অবাকই হয়েছি। অনেক কর্মচারী ছাঁটাই হয়েছে, ছোট-বড়-মাঝারি সব কোম্পানিই প্রণোদনার জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তাহলে বেশি বিজ্ঞাপন দেবার অর্থ কি আদৌ তাদের আছে?

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:

''স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাত নির্ভরতার বিষয় নিয়ে আকবর হোসেনের প্রতিবেদনটি ভাল লাগল। প্রতিবেদনটিতে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট স্বল্পতা, পরিকল্পনা ও ডাক্তারের অভাব নিয়ে বেশি গুরুত্ব দিলেও দুর্নীতির ব্যাপারটি উপেক্ষিত বলেই মনে হয়। সরকার যেটুকু যা বরাদ্দ করেছে, তার বড় একটা অংশ চলে গেছে দুর্নীতিবাজদের পকেটে।

''তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার হল, হাই প্রোফাইল মানুষেরা চরমভাবে নির্ভরশীল বিদেশ আর বেসরকারি হাসপাতালের উপর। যারা এভাবে নির্ভরশীল ছিলেন তারা ভাবতে পারেনি করোনা এসে তাদের সব থেকে নির্ভরতার জায়গাগুলোকে তাসের ঘরের মত উড়িয়ে নিয়ে যাবে।''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. সাঈদ, এই প্রতিবেদনে দুর্নীতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়নি। এর কারণ, আকবর মূলত সরকারের স্বাস্থ্যসেবা নীতি নিয়ে আলোচনা করেছে। এখানে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে কেন বাংলাদেশে এই খাতকে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে এবং সরকারি খাতের জন্য তার পরিণাম কী হয়েছে।

অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলার জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের একটি হচ্ছে কৃষকের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সাম্প্রতিক সার্কুলার। সেটা নিয়ে মন্তব্য করেছেন যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল থেকে মোহাম্মদ মোবারক হোসাইন:

''ফেলে রাখা জমি সরকার খাস জমি হিসেবে নিয়ে নেওয়াটা একদিক থেকে ভালো। কিন্তু অন্যদিকে সরকার নিজের জমি ফেলে রেখেছে। ঠিকমতো চাষ করছে না। এটা কিভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে? এক কথায় বলতে গেলে, নিজের মাথার উপরে টিন ফুটো কিন্তু অন্যের মাথার উপরে ছাদ নিয়ে চিৎকার দিচ্ছেন। বারবার কেন এরকম বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়? কিছুদিন পরপর একটা-না-একটা নিয়ে বিতর্ক লেগেই থাকে।

''তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিতর্কিত বিষয় বাদ দিয়ে যেভাবে দেশের উন্নতি হবে, করোনাভাইরাস থেকে মানুষ বের হতে পারবে, তার ব্যবস্থা করা উচিত। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য দেয়া উচিত, সারের দাম কমানো উচিত। তাহলে কৃষকেরা এমনিতেই চাষ করবে।''

বিষয়টি বেশ জটিল মনে হচ্ছে মি. হোসাইন। কৃষকের জমি অধিগ্রহণের আইন থাকলেও সরকারের সেটা করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ফেলে রাখা জমিতে যাতে ফসল উৎপাদন করা হয়, সেটাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এবং জমির মালিকানা কৃষকের হাতে রেখেই সেটা করা সব চেয়ে ভাল বলে আমার মনে হয়।

পরের চিঠি লিখেছেন বাগেরহাট থেকে মোহাম্মদ তৈমুর হোসেন:

''দেশের এ ক্রান্তিকালে যখন করোনা রোগী বাড়ছে, তখন বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আর অসন্তোষ বেড়েই চলছে। যেখানে মানুষ দীর্ঘ দুমাসের অঘোষিত লকডাউনের ফলে বেকার হতে বসেছে, সে মুহূর্তে কোন পরিবার করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের জীবন ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। যারা কিছুটা সচ্ছল তারা যদি করোনা চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে যান, সেখানে তাদের গুনতে হচ্ছে প্রচুর অর্থ।

''তাহলে সাধারণ জনগণ আক্রান্ত হলে কোথায় গিয়ে সেবা নিবে? সরকারি ব্যবস্থাও রোগী বাড়ার সাথে সাথে অপ্রতুল হয়ে উঠছে। এই কঠিন সময়ে সরকার যদি তাদের সেবা খাতকে উন্নত না করে এবং বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে আমাদের অবস্থা আরো শোচনীয় হবে।''

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা দরকার, তা নিয়ে আর কোন সন্দেহ নেই মি. হোসেন। এই মহামারি সব দেশকেই বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ শুধু জীবন বাঁচায় না, সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।

আবার ফিরে যাচ্ছি আমেরিকায় পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যা এবং তার প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রসঙ্গে। এবার লিখেছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে মোহাম্মদ রেজাউল রহিম:

''ছোট কালে কবি ও ছড়াকার সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'মানুষ জাতি' কবিতায় পড়েছিলাম,

'কালো আর ধলো বাহিরে কেবল/ ভিতরে সবারই সমান রাঙা'

তাহলে এই একুশ শতকে এসেও কি এ বর্ণ বৈষম্যের অর্থহীন মৃত্যু মেনে নিতে হবে?''

অবশ্যই মানতে হবে না মি. রহিম। সেজন্য আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদী মানুষের ঢল নেমেছে। শুধু আমেরিকা নয়, লন্ডন, বার্লিন, এ্যামস্টারডাম সহ পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অনেকেই আশা করছেন এর ফলে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি পুলিশ এবং আইন ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে।

আরো লিখেছেন রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে মুশফিকুর রহমান ওলিউল্লাহ:

''প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হত্যা করা হয়েছিল জর্জ ফ্লয়েডকে? সহজ উত্তর :লোকটি ছিলেন কালো। আমেরিকায় তথা পৃথিবীতে কালো লোকের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই কি? কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই ? যে পুলিশ সদস্য তাকে হত্যা করেছে, সে মানুষ হতে পারে কিন্তু তার ভিতরে মনুষ্যত্ববোধ আছে বলে আমি মনে করি না। জাতি,ধর্ম,বর্ণের ভেদাভেদ আজ আমাদেরকে অন্ধ করে দিয়েছে। আমরা যে মানুষ, সেই পরিচয়টি আমরা ভুলে গিয়েছি।''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. ওলিউল্লাহ, মনুষ্যত্ববোধের অভাবের কারণেই আজ বিভিন্ন দেশে সামাজিক বৈষম্য থেকে শুরু করে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনা থেকে যে প্রতিবাদের ঢল নেমেছে, হয়তো সেটা থেকে একটু হলেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এবারে কয়েকটি চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

এমদাদ হুদা, রমফোর্ড, লন্ডন।

বঙ্কিম চন্দ্র কীর্তনিয়া, গলাচিপা।

জিয়াউর রহমান জুয়েল, নাটোর।

মোহাম্মদ জাহিদ হাসান, সিলেট।

মিলন কুমার মিস্ত্রি, ময়মনসিংহ।

মোহাম্মদ আলহাজ উদ্দিন জুয়েল, নাটোর।

মোহাম্মদ সুলতান বায়াজিদ, রাঙ্গামাটি।

কাজী মোহাম্মদ হোসেন মোবারক, চট্টগ্রাম।

মোহাম্মাদ রুমী শরীফ, পটুয়াখালী।

ফয়সাল আহমেদ সিপন, ঘোড়াদাইড়, গোপালগঞ্জ।