করোনাভাইরাস: লকডাউনের পর যেভাবে খুলে দেয়া হচ্ছে ভারতকে

দিল্লির বাসে উঠতে যাত্রীদের প্রতিযোগিতা।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির বাসে উঠতে যাত্রীদের প্রতিযোগিতা।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

করোনাইরাস মহামারিতে সংক্রমণ রোধ করতে ভারতে যে লকডাউন চলছে দুমাসেরও বেশি সময় ধরে, তার পঞ্চম পর্যায় শুরুর ঘোষণা করা হয়েছে শনিবার সন্ধ্যায়।

এই পর্যায়টিকে অবশ্য বলা হচ্ছে 'আনলক - ১', কারণ কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে বহু পরিষেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ঘোষণা করেছে, কীভাবে সওয়া দু`মাস লকডাউনের পরে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগোনো হবে।

যেসব এলাকা সংক্রমণের জন্য ঘিরে দেওয়া হয়েছে, সেখানে জুনের শেষ পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া অন্য কিছুই সেখানে খোলা থাকবে না।

'আনলক' করার প্রথম পর্যায় শুরু হবে ৮ই জুন থেকে।

সেদিন থেকে ধর্মীয় স্থান, হোটেল, রেস্তোঁরা, বিপনীবিতান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রাত্রিকালীন কার্ফূয়ের সময়ও কমিয়ে রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, জুলাই মাসে ভাবনা চিন্তা করা হবে কবে থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।

আর তৃতীয় দফায় খতিয়ে দেখা হবে আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা, মেট্রো রেল, সিনেমা হল, ধর্মীয় বা সামাজিক- রাজনৈতিক জমায়েত করতে দেওয়া হবে কী না।

বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার সাথে ভীড় বাড়ছে অফিস-আদালতে।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার সাথে ভীড় বাড়ছে অফিস-আদালতে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিয়ান পাবলিক হেল্থ এসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ বলছিলেন, "মহামারি রোধ করতে লকডাউনের উদ্দেশ্য হল কিছুটা সময় কেনা, যাতে এই সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়।

``দেশের যা জনসংখ্যা, তার পাঁচ শতাংশও যদি সংক্রমিত হন, তাদের তো হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। সেই ব্যবস্থা তো দেশে নেই। লকডাউনের সময়ে সেটাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তো আমাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই হবে।"

ডা. ঘোষ বলছিলেন, "লকডাউন কোনও দীর্ঘকালীন ব্যবস্থা হতে পারে না। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে মহামারি রুখতে পরামর্শ দুটো - আরও বেশী সংখ্যায় পরীক্ষা করো, সংক্রমিত এলাকাকে ঘিরে রাখো, কাশির সময়ে সচেতন থাক আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখো। আমাদের এই ভাইরাস নিয়ে থাকতে হবে, আবার স্বাভাবিক অবস্থায়ও ফিরতে হবে। এগুলোই আমাদের 'নিউ-নর্ম্যাল'।"

কেন্দ্রীয় সরকার এই ঘোষণার আগে শুক্রবারই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ১লা জুন থেকেই বেশ কিছু শিথিলতার ঘোষণা করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় নির্দেশ আসার পরে রাজ্যের সেই সব ঘোষণা সরকারি নির্দেশ হিসাবে প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ।

শপিং মলে ক্রেতার দেহের তাপামাত্রা পরীক্ষ।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, শপিং মলে ক্রেতার দেহের তাপামাত্রা পরীক্ষা।
Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

সেখানে বলা হয়েছে ৮ই জুন থেকে সরকারি দপ্তরগুলিতে ৭০% কর্মী আসতে পারবেন। বেসরকারি সংস্থাগুলিতে কত কর্মী আনা হবে, সেটা মালিকরাই ঠিক করবেন।

দোকান, বাজার ইতিমধ্যেই অনেকাংশে খুলে গেছে।

চটকল, নির্মাণ শিল্প আর চাবাগানে ১০০% শ্রমিক দিয়েই কাজ করানো যাবে বলেও ঘোষণা করা হয়েছে।

রাজ্যের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস চলাচলের বিষয়ে বলা হয়েছে যত বসার আসন আছে, সেই সংখ্যায় লোক নেওয়া যাবে বলে যে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, তাতে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা কঠিন বলে মন্তব্য ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষের।

"এই সিদ্ধান্তটা ভুল। যত আসন আছে বাসে, সেখানে যদি গা ঘেঁষে বসেন যাত্রীরা, তাহলে সামাজিক দূরত্ব মানা কখনই সম্ভব নয়। এই সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।"

যেভাবে লকডাউন তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে পরিকল্পনার অভাব আছে বলে মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স এর সাধারণ সম্পাদক ডা. মানস গুমটার।

বিদেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের জন্য একটি হোটেলকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, DIPTENDU DUTTA

ছবির ক্যাপশান, বিদেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের জন্য একটি হোটেলকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তিনি বলছেন এইভাবে লকডাউন তুলে নেওয়া হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমিতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়বে।

"যেভাবে অপরিকল্পিত ভাবে লকডাউন চালু হয়েছিল দেশে, তার জন্য সাধারণ মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক - সবাইকেই চূড়ান্ত দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। আবার লকডাউন তোলার সময়েও যদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে," বলছিলেন ডা. গুমটা।

"লকডাউন তোলার আগে মানুষকে তো আশ্বস্ত করার দরকার ছিল যে আমরা ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে প্রস্তুত। লকডাউনের উদ্দেশ্যই তো ছিল কিছুটা সময় কেনা - যাতে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়। তার পরিবর্তে একটা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষের ওপরেই সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হল।"

কেন্দ্র আর রাজ্য - দুই সরকারের নির্দেশনায় কিছু ফারাক থাকায় কার নির্দেশ কার্যকরী হবে, তা নিয়ে আইনী জটিলতাও দেখা দিয়েছে।

আইনজীবিদের একাংশ বলছেন, যেহেতু দেশে এখন জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা আইন চালু আছে, তাই কেন্দ্রীয় নির্দেশই গ্রাহ্য হবে। কোনও রাজ্য কঠোরতর নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাকে লঘু করতে পারে না।

আবার অন্য অংশের মন্তব্য রাজ্য সরকারগুলোকে পরিস্থিতি যাচাই করে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারই তো দিয়েছে।