করোনাভাইরাস: যেভাবে অন্যরকম এক ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে বাংলাদেশের মানুষ

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
- Published
ঢাকার ধানমণ্ডির বাসিন্দা লায়লা রুমিনা আক্তারের বাড়িতে প্রতিবছর ঈদের দুপুরে আত্মীয়স্বজনের বেড়াতে আসা নিয়মিত একটা ব্যাপার। সেখানেই ঈদের আগের দিন থেকে তিনি রান্নাবান্না শুরু করেন।
কিন্তু এই বছর তার বাড়িতে ঈদ এসেছে অন্যভাবে।
''মনে হচ্ছে না কোন ঈদ কাটাচ্ছি। আত্মীয়স্বজন কেউ আসেনি, আমাদেরও কারো বাসায় যাওয়া হবে না। গত বছর এই দিনে বাসা ভর্তি মেহমান ছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে যেন অন্যসব দিনের মতোই আজকের দিনটা। এতো কিছু রান্না করেছি, কিন্তু খাওয়ার লোক নেই।''
তিনি বলছেন, ঈদে যদি কেউ আসে, সেই ভেবে বরাবরের মতোই অনেক কিছু রান্না করেছেন। কিন্তু ঈদের দিনে দুপুরেও কেউ আসেনি, রাতেও আসার সম্ভাবনা নেই।
আরো অনেক পরিবারের ঈদ উদযাপনের গল্পটা একই রকম। বাংলাদেশে এই বছর আলাদা ধরনের এক ঈদুল ফিতর কাটাচ্ছেন দেশটির বাসিন্দারা।
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশটিতে দুইমাস ধরে অঘোষিত লকডাউন চলছে। ঘরে বসে সবাইকে ঈদ উদযাপনের পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩৫,৫৮৫ জন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এই রোগে ৫০১ জন মারা গেলেন।
রবিবার সন্ধ্যায়, ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ঘরে থেকে ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানান। সাথে সব ধরণের স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, "এ বছর আমরা সশরীরে পরস্পরের সাথে মিলিত হতে বা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে না পারলেও টেলিফোন বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেব"।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাবিহা পারভীন বলছেন, "সাধারণত বাচ্চারা তাদের বাবার সাথে নামাজে যায় ও ফিরে আসলে একসাথে খাই। রান্না করি। অতিথিরা আসে বা আমরা বেড়াতে যাই। কিন্তু এবার এর কোনটাই হয়নি। ওরা ঘরে নামাজ পড়েছে। আমরা নিজেরা নিজেরাই ঈদ করছি"।


ঈদগায়ে নয়, মসজিদে জামাত
ঈদের জামাত ঐতিহ্য অনুযায়ী ঈদগায়ে অনুষ্ঠানের রেওয়াজ থাকলেও, প্রথমবারের মতো মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও অনেকে মসজিদের ঈদের জামাতেও অংশ নেননি।
বেশ কয়েকটি মসজিদে খবর নিয়ে জানা গেছে, সেখানে একাধিক জামাতের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে ভিড় বেশি না হয়। সবাইকে মাঝখানে অন্তত একফুট জায়গা রেখে দাঁড়াতে বলা হয়েছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আজ পাঁচটি ঈদের জামাত হলেও তার দৃশ্যপট ছিলো ভিন্ন। এর আগেই পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। সে অনুযায়ী মুসল্লিরা সারিবদ্ধ ভাবে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে একটি জীবাণুনাশক কক্ষের মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছেন। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাদের নামাজ পড়তে দেখা গেছে। একই চিত্র ছিলো ঢাকার বাইরেও। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ভিড় এড়াতে অনেক মসজিদেই একাধিক জামাতের আয়োজন করা হয়েছিলো।
সিরাজগঞ্জে শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিলেন ঢাকার বাসিন্দা মিরাজ মওলা চৌধুরী। সেখানকার মসজিদে মাইকিং করা হয়েছে, ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা এসেছেন, তারা যেন ঈদের জামাতে অংশ না নেন। এই কারণে মি. চৌধুরীর এই বছর ঈদের জামাত পড়া হয়নি।
ঢাকার খিলগাঁয়ের বাসিন্দা আরিফুল হক অবশ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মসজিদে নামাজ পড়তে যাননি।
তিনি বলছেন, '' সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা দরকার। মসজিদে গেলে সেই দূরত্ব কতটা রাখতে পারবো জানি না। সেসব চিন্তা করে আর বাসা থেকে বের হইনি। ঈদের দিনটা বাসাতেই কাটিয়ে দেবো।''
উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ঈদ করছেন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা লিংকন মোহাম্মদ লুৎফরজ্জামান সরকার।
তিনি বলেন, "আমি মসজিদে নামাজ পড়েছি। তবে সেখানে দূরত্ব বজায় রেখে সবাই নামাজে অংশ নিয়েছে। কোনো কোলাকুলি বা এ ধরণের কিছু আমরা কেউ করিনি। এমনকি আত্মীয় স্বজন বা প্রতিবেশীদের বাড়ি যেমন যাইনি, তেমনি আমাদের বাড়িতেও সেটা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।''
মসজিদের পরিবর্তে অনেক ভবনের ছাদেও ঈদের জামাতের আয়োজন করতে দেখা গেছে। তাদেরই একজন ঢাকার একজন ব্যবসায়ী মুহাম্মদ আশরাফুল সরকার জুয়েল।
তিনি বলছেন, "আমার ৪২ বছরের জীবনে কোনোদিন ভাবিনি যে ঈদের নামাজ ঘরে পড়বো। সেটাই পড়লাম আজ। এটা অবিশ্বাস্য। গত বছরেও এটা আমরা কল্পনা করিনি। সারা জীবন ঈদগাহে সবার সাথে নামাজ পড়েছি"
ঈদের জামাতের পর কোলাকুলি আর স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির রেওয়াজ থাকলেও এবছর থাকছে না তেমন কোন আয়োজন। কাউকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়নি। প্রায় সবাই মাস্ক ব্যবহার করছেন। এমনকি অনেকের হাতে ছিলো গ্লাভস।
ঈদের দিনে সাধারণত মসজিদগুলোর সামনে ভিক্ষুকদের যে ভিড় থাকে বাংলাদেশে আজ সেটিও তেমন একটা ছিলোনা। ঢাকায় কিছু মসজিদের সামনে ভিক্ষুকদেরও দেখা গেছে দূরত্ব বজায় রেখে বসে থাকতে।

ছবির উৎস, Getty Images
পুরনো কাপড়ে নতুন ঈদ
ঈদের আগে নতুন কাপড় চোপড় কেনা এবং ঈদের দিন সেগুলো পড়ে বের হওয়া বাংলাদেশে একটা প্রচলিত ব্যাপার। কিন্তু এই ঈদে সেখানেও ব্যতিক্রম হয়েছে।
দোকানপাট খোলা হলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে অনেকে কেনাকাটা করতে যাননি। ফলে অনেক পরিবারের সদস্যরা পুরনো কাপড় পড়েই এই বছর ঈদ উদযাপন করছেন।
সালামির আকাল
ঈদের দিন বড়দের সালাম করে সালামি আদায় যেন ঈদের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে গিয়ে এই বছর সালাম করার বা সালামি আদায়েও আকাল দেখা গিয়েছে।
ক্লাস এইটের শিক্ষার্থী জাহিদ আবদুল্লাহর গত বছর সালাম করেই আড়াই হাজার টাকা আয় হয়েছিল। কিন্তু এই ঈদে সে শুধু বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাঁচশো টাকা পেয়েছে।
''বাসায় কেউ তো আসছেই না। কাকে সালাম করবো। কারো বাসাতে যাওয়ার উপায়ও নেই,'' সে বলছে।
সাতক্ষীরার একটি মসজিদের ইমাম মোঃ শহিদুল ইসলাম বলছিলেন, ''একবছর পরে ঈদ-উল-ফিতরের নামাজ, কিন্তু সেই আমেজটা আমাদের ভেতর এখন বিরাজ করছে না। একই সঙ্গে করোনার সমস্যা, আরেকদিকে আম্পান, ঘূর্ণিঝড়ের দুর্যোগের কারণে মানুষের ভিতর বাৎসরিক ঈদের আমেজটা ফুটে উঠছে না।''

ছবির উৎস, Getty Images
সড়কে গণপরিবহন নেই, তবে সিএনজি ও প্রাইভেটকার চলছে
ঢাকার প্রধান সড়কগুলোয় দুইমাস ধরেই বাসের মতো গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। তবে সিএনজি ও প্রাইভেটকার চলতে দেখা গেছে।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন একটি সিএনজি নিয়ে ঢাকার কলাবাগান থেকে মিরপুরে বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়েছেন।
তিনি বলছেন, ''ঈদের একটা দিন বড় ভাই, ভাবী, বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা হবে না, তাতো হয় না। তাই একটু ঝুঁকি নিয়েই বের হলাম। সিএনজি চলছে, আসতে সমস্যা হয়নি।''
তবে গ্রীনরোডের বাসিন্দা সোহানা ইয়াসমিন প্রতিবছর ঈদের সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে যান। কিন্তু এই বছর তার আর বাসার বাইরে বের হওয়ার ইচ্ছা নেই।
''শুধু একদিন ঘুরতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাই না। বরং ঘরে থেকে টেলিফোনে সবার খোঁজখবর নেবো। সুস্থ থাকার জন্য একটা বছর ঈদের আনন্দ না হয় একটু কমই হোক।'' তিনি বলছেন।
সীমাহীন কষ্টের ঈদ
ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে, গত বুধবার (২০শে মে) বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত করে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। সেই ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সহ দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি জেলা।
সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা হামিদা বেগম বলছেন, ''আমার ঘর-দরজা সব পড়ে গেছে। এখন এই ঈদিরও মুখ! (ঈদের সময়)। আমার বাচ্চাকাচ্চার বস্ত্র নেই। কী করি আমি চালামু, আমার দরোজা পড়ি গেছে। আমার ঘর বানবার মুনেষ্যে (পুরুষ) নেই। কী করবো আমি?''
এক বেলা খাবার জোগাড় করাই তার জন্যে এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। এদিক সেদিক থেকে কুড়িয়ে আনা শাকসবজি রান্না করে কোনরকম খাওয়া চলছে।
আরেকজন গ্রামবাসী নার্গিস পারভীনের মুরগির খামার এখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলছেন, ''ঝড়ে গাছ পড়ে ১৬০০টি মুরগি মারা গেছে। এই খামারই আমাদের ইনকাম ছিল। এই ছাড়া ইনকামের কোননো সোর্স নেই। মাঠে কোন জমি-জাগা নেই। এখন ছয়-সাতটা লোক সংসারে। কোন ঈদ বলে আমাদের কিছু নেই।''









