করোনা ভাইরাস: এক সময়ের 'নিরাপদ' রাশিয়া যেভাবে লকডাউন সামাল দিচ্ছে

ছবির উৎস, শাকিলা সিমকী
- Author, শাকিলা সিমকী
- Role, মস্কো থেকে বিবিসি বাংলার জন্য
- Published
রাশিয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছুদিন আগে কয়েকটি বিষয় বেশ ট্রল হচ্ছিল। রাশিয়াতে জনগণকে ঘরে রাখার জন্য নাকি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাইরে ৮০০ সিংহ ছেড়ে দিয়েছেন। পুতিনকে উদ্ধৃত করে আরও একটি মিম ছড়ানো হয়েছিল, "রাশিয়ান নাগরিকদের জন্য দুটো অপশন - এক, বাসায় অবস্থান করো। দুই, পাঁচ বছরের জেল খাটো - এন্ড অফ স্টেটমেন্ট।"
শুরুর দিকে যখন অন্যান্য দেশগুলোতে কোভিড ১৯-এর ব্যাপক হারে সংক্রমণ হচ্ছিল, তখন রাশিয়া ছিল নিরাপদ। সুরক্ষিত থাকার কারণেই বোধহয় সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব মজাদার ট্রল খুব ভাইরাল হয়েছিল।
তবে বিষয়টা যতো মজারই হোক না কেন, বাস্তবতা হলো যে শুরুর দিকে রাশিয়া আসলেই বেশ সেইফ জোনে ছিল। এবং কোভিড ১৯ এর আগমন ছিল বেশ ধীরগতিতেই। কেননা, চীনে যখন প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয় তখনি রাশিয়া চীনের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
রাশিয়াতে বাস করা যে সকল চাইনিজ নাগরিক সেই সময়টাতে চীনে গিয়েছিল তাদের আর আসতে দেয়া হয়নি এবং যারা আছে তাদের ও নজরদারিতে রাখা হয়েছিল সেই প্রথমদিকেই।

ছবির উৎস, Sergei Fadeichev
এখন সংক্রমণ বেশি কেন?
তারপর লকডাউন শুরু হলো মার্চের মাঝামাঝিতে। এতো তৎপর থাকা সত্ত্বেও এখন কেন বাড়ছে রাশিয়াতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ?
ধারণা করা হয় রাশিয়া চীনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে যতটা স্ট্রিক্ট ছিল, ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাথে কিন্তু অতোটা বিচ্ছিন্ন তখনো হয়নি। ফলে ইউরোপ বা অন্যান্য দেশ থেকে আসা নাগরিকদের ওভাবে নজরদারিতে রাখা হয়নি বা তারাও ওভাবে কোয়ারেন্টিন মেনে চলেননি।
এছাড়া রুশ নাগরিক যারা অন্যান্য দেশে বাস করতো তাদের সরকার দেশে ফেরত নিয়ে আসে, ফলে তাদের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আসলে সবকিছুই ধারণা। লক ডাউন শুরু হবার সাথে সাথে সরকার এখানে ঘোষণা করেন, বৃদ্ধরা যেন ঘরে থাকেন, বের না হন। এর বিনিময়ে তাদের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।
মেট্রোগুলোতে থার্মাল ক্যামেরা বসানো হয় যেন রোগীকে শনাক্ত করা যায়। লকডাউন অমান্যকারীকে জরিমানা করারও ঘোষণা করা হয়।

ছবির উৎস, Sergei Karpukhin
'ডিজিটাল পারমিট' সিস্টেম
চিন্তার বিষয় হচ্ছে নানা নিয়ম কানুন ও সচেতনতা সত্ত্বেও রাশিয়াতে কেন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা? সেই প্রশ্ন সবার মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
লকডাউন আসলেই কি থামাতে পারছে কোভিড ১৯? তবু উপায় নেই। লকডাউন চলছে, চলবে যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য সুপারশপ এবং ফার্মেসিগুলো খোলা আছে। তবে খাবার হোম ডেলিভারি যারা দিচ্ছে তারা কাজ করে যাচ্ছে প্রতিক্ষণ। সরকার 'ডিজিটাল পারমিট' সিস্টেম চালু করেছে ।
ঘর থেকে বের হয়ে গণ পরিবহন বা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করতে চাইলে অনলাইনে অনুমতি নিতে হচ্ছে।
এছাড়া মেডিক্যালগুলো এমার্জেন্সি নাম্বার চালু করেছে। যেন যে কেউ কল করে সমস্যা জানাতে পারে। মেডিকাল টিম সদস্যারা বাসায় এসে পরীক্ষা করছেন লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন আর অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালগুলোতে দিন দিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা তাই নতুন আরো হাসপাতাল নির্মাণ করছে সরকার।

ছবির উৎস, DIMITAR DILKOFF
লকডাউনে বাঙালি পরিবার
ভাইরাস গ্রাস করে নিয়েছে মানুষের সকল রকম ব্যস্ততা ও ক্ষমতা। জাঁ পল সার্তের 'নো এক্সিট' নাটকের মতো মানুষ কোন না কোন ফ্ল্যাট বা বাড়ির কামরায় বন্দী আজ ।
রাশিয়ার মস্কোসহ অন্যান্য শহরে ও বাস করে অনেক বাংলাদেশি । বাঙালি পরিবার যেমন আছে তেমনি অনেক ছাত্রছাত্রী এদেশে পড়াশোনা করে। লকডাউনে এখন সবাই বন্দী।
লকডাউনে ক্লাস চলছে অনলাইনে সবখানে। ছাত্রছাত্রী যারা হোস্টেলে আছে তাদেরও বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। হোস্টেল কর্তৃপক্ষ রোজ তাপমাত্রা নির্ণয় করছে । কোন কিছু কেনার জন্য বাইরে যাবার অনুমতি নিতে হয় তাছাড়া হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা আছে হোস্টেলগুলোতে।
তবে যেসকল ছাত্র ছাত্রী নিজ খরচে পড়াশোনা করে পাশাপাশি পার্ট টাইম কাজ করতো, লক ডাউনের কারণে এখন বেশ সমস্যা পোহাতে হচ্ছে তাদের । বাঙালি পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার কোভিড ১৯ তে আক্রান্ত হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জেনেছি তারাও এখন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

ছবির উৎস, Vyacheslav Prokofyev
মস্কোতে গ্রীষ্মের আভাস
কোভিড ১৯ এর কারণে যে যেখানেই আছি আজ আমরা গর্ত-বাসী। কিন্তু সৃষ্টি থেমে নেই। রাশিয়াতে এখন বসন্ত। গ্রীষ্মের শুরু হবে হবে করছে। বরফ ঢাকা সবুজহীন মস্কো শহরটা অল্প কয়দিনে কেমন সবুজে ভরে গেলো।
পাতা শূন্য গাছ পরিপূর্ণ আজ নতুন পাতায়। সাদা প্লাম ব্লোজমে গাছগুলো ভরে গেছে। রুমে বসেই রোজ শুনতে পাই আমার জানালার সামনের গাছে বসে এক ছোট মিষ্টি অজানা পাখির দুঃখ জাগানিয়া গান।
মন কেমন কেমন করে ওঠে। দেশের কথা মনে পড়ে। প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ে। ইদানিং রোজ একটা পায়রা এসে আমার জানালার কাঁচে এসে নক করে। আমি তাকে পাউরুটি দেই সে খেয়ে চলে যায়। যে হাঁসগুলোকে দেখতাম পার্কের পাশে ভেসে বেড়াতো তারাও এখন উড়ে উড়ে লোকালয় খোঁজে, ডর্মেটোরির সামনে ভীড় করে কারণ তারাও ক্ষুধার্ত। মানুষের সঙ্গ খোঁজে। অন্যসময় তো পার্কে গেলে লোকজন তাদের খাবার দিত।
মানুষ যেমন পশু প্রাণীর উপর নির্ভরশীল এইসব প্রাণীরাও তেমন আমাদের উপর নির্ভরশীল বোঝা যাচ্ছে। লকডাউনের এই চারপাশে নীরব পরিবেশে তারাও হাঁপিয়ে উঠেছে।

ছবির উৎস, KIRILL KUDRYAVTSEV
পাগল করা সুন্দর আবহাওয়া
এমনিতেই নয় মাস শীতের কারণে ঘরে থাকতে হয় রুশবাসীকে। তারা প্রতীক্ষায় থাকে এই তিনমাস সামারের। জানি না এই তিন মাস কিভাবে ঘরে থাকবে রুশবাসী। আর সত্যিই এই সময়টাতে ঘরে বসে থাকা অসম্ভব।
বাইরে পাগল করা সুন্দর আবহাওয়া হাতছানি দেয় বারে বারে। লকডাউনের এই সময়টাতে ঘর হতে দু'পা ফেলিয়া মাঝে মাঝে বের হই অবাক মুগ্ধ চোখে দেখি সবুজ ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে হলুদ ফুল আর আর সাদা পালকের ছড়াছড়ি। ঘাসে ঘাসে ফুটেছে ড্যান্ডিলায়ওন (Dandelion)। রহস্যময় এই ফুল ড্যান্ডিলায়ওন। ড্যান্ডিলায়ওন এর রুশ নাম আদুভানচিক। 'উইশ মেকিং' ফুল হিসেবে খ্যাত।
এই ফুল নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চলমান লোকবিশ্বাস রয়েছে যে, হলদে ফুলগুলো পরিণত হয়ে বীজের সাদা পাফ বলটি আপনার জন্য একটি উইশ মেকিং বল হিসেবে তৈরি হয়। এবং ড্যান্ডিলায়ওন বীজ ভর্তি পাফ বলটি যখন আপনি মনে মনে একটা উইশ করে ফু দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেবেন তখন আপনার চিন্তা এবং ইচ্ছেগুলো প্রিয়জনের কাছে নিয়ে যাবে বহন করে। ড্যান্ডিলায়ওন এর গোপন বার্তা কি জানেন তো?
'don't give up,make a wish and hope for something better to come.' আমার ডর্মেটরির সামনে ফুটে থাকা ড্যান্ডিলায়ওনগুলো দেখে তাই মনে হয় বাতাসে সাদা পালক গুলি উড়ে উড়ে বার্তা দিচ্ছে wishes coming to life ।
তাই আমিও প্রতিদিন একটি সাদা পাফ বল নিয়ে উইশ করছি পৃথিবীর অসুখ সেরে যাক। ব্যস্ততা ফিরে আসুক সবার মাঝে। মানুষ প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিক । ফিরে আসুক আনন্দ।








