করোনাভাইরাস: সঙ্কট প্রমাণ করলো ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশু অধিকার বঞ্চিত

মালবী গুপ্ত

ছবির উৎস, মালবী গুপ্ত

Published

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবিত ও মৃত', ছোট গল্পে - 'কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই', এই শেষ লাইনটি একটু বদলে নিয়ে হয়তো বলাই যায় - সে মরে গিয়ে প্রমাণ করল, সে বেঁচে ছিল।

কারণ সে জানত না, এখন তার স্কুলে যাওয়ারই বয়স। সে জানত না যে, সেখানে গেলেই দুপুরের খাবার বা মিড ডে মিল তার প্রাপ্য অধিকার।

সে এও জানত না, ভারতের আইন ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তার মত সমস্ত শিশুর জন্যই শিক্ষা, খাদ্য, সুরক্ষার অধিকারকে সুনিশ্চিত করেছে।

তাই বারো বছর বয়সেই তাকে যেতে হল ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে। কিন্তু সেখান থেকে জীবিত অবস্থায় নিজের গ্রামে তার আর ফেরা হল না। সে জামলো মকদম।

ভারতে লকডাউনের মাঝে শ্রমিক মা পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন কিন্তু তার শিশু আর হাঁটতে পারছে না, ০৪-০৫=২০২০।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতে লকডাউনের মাঝে শ্রমিক মা পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন কিন্তু তার শিশু আর হাঁটতে পারছে না।

জামলোর দুর্গম দীর্ঘ পদযাত্রা

মা বাবার একমাত্র সন্তান হয়েও তাকে ছত্তিসগড়ের বিজাপুর জেলা থেকে ১৫০ কিমি দূরে তেলেঙ্গানার কান্নাইগুড়া গ্রামে লঙ্কা ক্ষেতে কাজ করতে যেতে হয়েছিল মাস কয়েক আগে।

কিন্তু দেশে কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ ঠেকাতে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভারত সরকার হঠাৎ লকডাউনের নির্দেশ দিলে, যে লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষ বে-রোজগার হয়ে পড়ল, ওই বালিকা ছিল তাদেরই একজন।

নিরাপত্তাহীন, অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটকে পড়া, তাদের ঘরে ফেরার কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, যে প্রতিবেশীদের হাত ধরে জামলো সেখানে পৌঁছেছিল, তাদেরই সঙ্গে গ্রামে ফেরার অনিশ্চিত যাত্রায় শেষ পর্যন্ত পা বাড়িয়েছিল সেও।

কিন্তু দুর্গম দীর্ঘ সেই পদযাত্রায় তিন দিন ধরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামে পৌঁছনোর আগেই গত ১৮ এপ্রিল হতক্লান্ত, অভুক্ত সেই বালিকার কচি পা দুটি পথের ওপর চিরকালের জন্য থেমে গেল। যে বারো বছরের নিষ্ঠুর শৈশব তাকে অসহায় পরিযায়ী শ্রমিক বানিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই শৈশবই যেন তার দুঃখদ জীবন-যাত্রার অবসান ঘটাল।

দিল্লির এক রাজনীতিকের এলাকায় খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে একদল শিশু, ০৪-০৫-২০২০।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, জামলোর মৃত্যু প্রমাণ করলো ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশুর মত সেও বেঁচে ছিল।

তাই বলছিলাম, জামলো আসলে মরে গিয়েই প্রমাণ করল, ভারতের লক্ষ লক্ষ অসহায় শিশু কন্যার মতো সেও বেঁচে ছিল। কিন্তু বেঁচে থাকার সব অধিকার থেকেই সে বঞ্চিত ছিল আমৃত্যু।

তার সেই বঞ্চনার প্রমাণপত্রটি জন সমক্ষে এসে পড়ায়, অনেক দেশবাসীই বিমূঢ় হল। তবে দেখছি, জামলোর মর্মান্তিক মৃত্যুতে হঠাৎই যেন মহামান্য সরকারের ঘুম ভেঙে গেল।

দেখা গেল ওই দুই রাজ্যে সরকারি আমলাদের মধ্যে শুরু হয়েছে প্রবল তৎপরতা। শ্রমের বাজারে এমন বেআইনি নিয়োগ কী ভাবে হল? কোন সে ব্যক্তি যে এমন অপরাধ কর্মে লিপ্ত ছিল? খোঁজ খোঁজ।

অপরাধীর বিরুদ্ধে কেস, জামলোর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের অর্থমূল্য ইত্যাদি নিয়ে তাদের মধ্যে এখন চলছে প্রবল দৌড়ঝাঁপ। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন )

ভারতের গাজিয়াবাদে পায়ে হেঁটে গ্রামমুখী হয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিক, ০৫-০৫-২০২০।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, ভারতের পরিযায়ী শ্রমিক: পায়ে হেঁটে গ্রামমুখী হয়েছেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর।

ঘরমুখী এক বিষাদ যাত্রা

হঠাৎই আমরা এও লক্ষ করলাম, দেশ জুড়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের যেন এক উল্টো যাত্রা শুরু হয়েছে। এতদিন গ্রাম ছেড়ে যারা শহরমুখী হয়েছেন বাঁচার তাগিদে। কিন্তু আকস্মিক নভেল করোনাভাইরাসের হাত ধরে সেই যাত্রার অভিমুখ যেন রাতারাতি বদলে গ্রামমুখী হয়ে উঠল।

সংবাদ মাধ্যমে তাবৎ দেশবাসীর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল, লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের মাথার ওপর হঠাৎই যেন ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এক ঘোর অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার একটি খাড়া। যা থেকে বাঁচতেই শুধু নিজের পায়ের ওপর নির্ভর করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে দুর্দশাগ্রস্ত ঘরমুখী দীর্ঘ এক বিষাদ যাত্রায় তাদের শামিল হওয়া।

আমার জানা নেই, এই মুহূর্তে ভারতের কোন কোন রাজ্যে কত পরিযায়ী শ্রমিক নিজের ঘরে ফেরার আকুতি নিয়ে এমন মর্মান্তিক মরণ যাত্রায় বেরিয়েছেন। তবে দেশে মাসাধিককাল অভূতপূর্ব লকডাউনে ভারতের নানা শহরে পরিযায়ী শিশু শ্রমিকদের অবস্থা বোধহয় সবচেয়ে শোচনীয়।

কলকাতায় এক শিশু খাবার গ্রহণ করছে, ০৪-০৫-২০২০

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, অভূতপূর্ব লকডাউনে কলকাতার মত (ছবি) ভারতের নানা শহরে শিশু শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয়।

বন্দি দশা থেকে উদ্ধার

যেভাবে প্রায় খাদ্যহীন, নিরাপত্তাহীন লক্ষ লক্ষ অসহায় শিশু শ্রমিক অমানুষিক পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে গেছে, তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপক কৈলাশ সত্যার্থী।

এখনই বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে তাদের সেই বন্দি দশা থেকে উদ্ধার করার আর্জি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তিনি চিঠিও লিখেছেন। ( আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন )

আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, বেশ কয়েক বছর আগের কথা। শিশু শ্রমিকদের নিয়ে বিবিসি বাংলার জন্য একটি প্রোগ্রাম করতে জলপাইগুড়িতে একটা নদীর চড়ায় গিয়ে চমকে উঠেছিলাম। প্রখর রোদে, খালি গায়ে ৮/৯ বছরের কয়েকটি শিশুকে হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙার কাজ করতে দেখে।

স্মৃতিতে আজ আরও ভেসে উঠছে চায়ের দোকানে, রাস্তায় চলন্ত ট্রেকারে ডেকে ডেকে যাত্রী তোলার কাজে, ইট ভাঁটায় বা গ্যারাজে কাজ করা শিশু শ্রমিকদের অসংখ্য মলিন মুখ ।

ভারতের পাঞ্জাবে কাজ করছে একজন শিশু শ্রমিক, ০১-০৫-২০১৯।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আসলে জামলোর মতো কত শত শিশু যে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন শ্রমিক হয়ে পাড়ি দিচ্ছে দেশ, দেশান্তরে। কত শিশু যে আজও বন্ডেড লেবার হয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে চাষের ক্ষেত, গৃহ কাজ, ইট ভাটা, নির্মাণ কাজ, পাথর খাদান কিম্বা নানা কল কারখানায়, তার হিসেব নেই।

এমনকি বাজি কারখানাতেও আগুনে পুড়ে কত শৈশব প্রায়শই আহত ও নিহত হচ্ছে, জানি কোনো পরিসংখ্যানেই তার সঠিক তথ্য মেলা ভার।

কেবল মাঝে মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে অত্যাচারের শিকার হওয়া সেইসব অসহায় শিশুদের প্রবল দুর্দশার ইতস্তত ছবি ওঠে। কিন্তু ভারতে শ্রমের বাজারে কোনো শিশুকে নিয়োগ করা তো আইনত নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তাতে কি? আমাদের দেশে অপরাধ ঘটালেই যে অপরাধীর শাস্তি হবে তেমন নিশ্চয়তা তো নেই। কারণ দেখে শুনে মনে হয়, দেশে নতুন আইন তৈরিতে সরকার যত উৎসাহী, সেই আইন কার্যকর করায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি যেন ততই উদাসীন, ততই অনাগ্রহী।

তা নাহলে সেই অধিকার বঞ্চিত বারো বছরের জামলোকে কেন ভিন রাজ্যের লঙ্কা ক্ষেতে পৌঁছতে হয়েছিল? তা নাহলে ভারতে প্রতি ১০ জন শ্রমিকের একজনই কেন হয় শিশু শ্রমিক? যা ভারতের শ্রমবাজারের প্রায় ১৩%। ( আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন)

কিন্তু কেবলই মনে হয়, তাদের প্রতি অন্যায়, অবিচার আর নিষ্ঠুরতার দুর্ভেদ্য দেওয়ালে আঘাত হানায় সরকারি নিষ্ক্রিয়তা কেন যুগ যুগ ধরে এরকম বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে? কেন তাই নিয়ে সমাজে কোনো প্রশ্ন ওঠে না? কোনো হই চই হয় না?

সে কি ছোট বড় কল কারখানা, দোকান বা ক্ষেতের মালিক, নিয়োগকারী যেই হোক, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে অনেক সময়ই তাদের নিবিড় সখ্যতা গড়ে ওঠে বলে? না কি শ্রমের বাজারে এমন কম পয়সায় বেশি কাজ আদায় করার এবং মালিকের নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করা, আপাদ মস্তক নিংড়ে নেওয়া শ্রমশক্তির এমন আধারের কোনো বিকল্প হয় না বলে?

হয়তো তাই। হয়তো সেই কারণেই আমাদের ঘরে বাইরে চারপাশে অনন্তকাল অটুটই থেকে যাবে শিশু শ্রমিকদের এই প্রবাহটি। শিশুর মৌলিক অধিকার রক্ষায় আইন প্রণয়নে সরকারি আয়ুধগুলিতেও কেবল মর্চে পড়তে থাকবে।

আমি নিশ্চিত যে, একদিকে দালাল আর একদিকে নিয়োগকারীর শোষণ দণ্ডের মাঝখানে জামলোর মতোই অগণিত শিশু শ্রমিকের অনিশ্চিত, অনিরাপদ বাঁচা মরাও অব্যাহত থাকবে।