করোনাভাইরাস: ভারতে আক্রান্তদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসছেন তাবলীগ জামাতের সদস্যরা

দিল্লির নিজামউদ্দিন মারকাজ থেকে ধর্মীয় সমাবেশ শেষে বেরিয়ে আসছেন তাবলীগে যোগ দেওয়া কজন মুসল্লি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির নিজামউদ্দিন মারকাজ থেকে ধর্মীয় সমাবেশ শেষে বেরিয়ে আসছেন তাবলীগে যোগ দেওয়া কজন মুসল্লি।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

দিল্লিতে তাবলীগ জামাতে যোগ দেওয়ার পরে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, এরকম কয়েকজন সুস্থ হয়ে ওঠার পরে এগিয়ে এসেছেন নিজের রক্ত দান করতে। সেই রক্ত থেকে প্লাজমা নিষ্কাশন করে তা দেওয়া হবে করোনা সংক্রমিত রোগীদের শরীরে।

করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় প্লাজমা প্রয়োগ করে গত সপ্তাহেই সাফল্য এসেছে। তারপরেই কোয়ারেন্টিন সেন্টারে থাকা সুস্থ তাবলীগ সদস্যরা প্লাজমা দিতে এগিয়ে এসেছেন।

অথচ কিছুদিন আগেও সারা দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য তাদেরই দায়ী করা হচ্ছিল।

করোনা থেকে সেরে ওঠা রোগীর দেহে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, সেই অ্যান্টিবডি রক্তের প্লাজমা ট্রান্সফিউশনের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহে ঢুকিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হচ্ছে ভারতে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে উঠে প্লাজমা দান করা এরকমই একজন তামিলনাডুর দিন্ডিগালের যুবক আনাস সৈয়দ।

দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্র তিনি। পরীক্ষার শেষে ছুটি পড়েছিল মার্চ মাসে। দিল্লি হয়ে বাড়ি ফেরার ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল আগেই। ট্রেন ছাড়ার একদিন আগেই পৌঁছেছিলেন দিল্লি। রাতটা থেকে গিয়েছিলেন নিজামুদ্দিনে।

কিন্তু সেই ট্রেনে চড়ে বাড়ি যাওয়া হয় নি তার - হঠাৎই শুরু হয়ে যায় লকডাউন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ধর্মীয় সমাবেশের পর কিছু মুসল্লিকে কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মার্চের মাঝামাঝি দিল্লিতে ধর্মীয় সমাবেশের পর কিছু মুসল্লিকে কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়।

আরও বহু মানুষের সঙ্গে নিজামুদ্দিন মারকাজেই থেকে যেতে হয় আনাস সৈয়দকে।

এরপরে তার শরীরে ধরা পড়ে করোনা সংক্রমণ।

আইসোলেশনে ২১ দিন থাকার পরে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি।

লালারস পরীক্ষা দুবার নেগেটিভ এসেছে।

"কয়েকদিন আগে চিকিৎসকরা প্লাজমা দান করার প্রস্তাব দেন। তারা বলেন যে অন্য রোগীদের সুস্থ করে তোলা যাবে প্লাজমা দিয়ে। কোয়ারেন্টিনে থাকা অন্য তাবলীগ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করি আমি।

''আবার তাবলীগ প্রধান মৌলানা সাদ কান্দলভিও হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তা দেন যে আমরা নিজের ইচ্ছায় প্লাজমা দিতেই পারি।তখনই সিদ্ধান্ত নিই যে আমি প্লাজমা দেব," দিল্লির সুলতানপুরী এলাকার একটি করোনা কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে টেলিফোনে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. সৈয়দ।

গত রবিবার তার এবং আরও কয়েকজনের রক্ত নেওয়া হয় - যা থেকে প্লাজমা পৃথক করা হয়।

করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য তাবলীগ সদস্যদের যে বদনাম করা হচ্ছিল, এখন আনাস সৈয়দের মনে হচ্ছে প্লাজমা দান করার মাধ্যমে আল্লাহ সেই বদনাম দূর করে দিলেন।

ফারুক বাশা।

ছবির উৎস, Anas Sayed

ছবির ক্যাপশান, প্রথম দিনেই আনাস সৈয়দের সঙ্গেই প্লাজমা দিয়েছেন তাবলীগের সদস্য ফারুক বাশা।

মি. সৈয়দ রোজা রাখছেন। সন্ধ্যায় ইফতারের পরেই তাদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারেই শুরু হচ্ছে দুই বা তিনজন সুস্থ হয়ে ওঠা তাবলীগ সদস্যর রক্ত থেকে প্লাজমা নিষ্কাশন।

তাবলীগ ঘনিষ্ট এক চিকিৎসক ডাক্তার শোয়েব আলি বলেছেন যে তিন থেকে চারশো তাবলীগ সদস্য প্লাজমা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন বলে তার ধারণা।

রবিবারে প্রথম দিনেই আনাস সৈয়দের সঙ্গেই প্লাজমা দিয়েছেন তাবলীগের আরেক সদস্য ফারুক বাশা।

তিনিও তামিলনাডুর বাসিন্দা - চেন্নাই থেকে দিল্লি এসেছিলেন তাবলীগ জামাতের সমাবেশে যোগ দিতে। তারপরে ফিরতে পারেন নি আরও অনেকের মতোই।

তিনিও দিল্লির সুলতানপুরীতেই কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন।

মি. বাশা বলছেন, তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, রক্ত দিতে ইচ্ছুক কি না।

''প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারিনি। তারপরে বুঝিয়ে বলা হয় যে প্লাজমা নিষ্কাশন করে তা অন্য করোনা সংক্রমিতের শরীরে দেওয়া হবে, যাতে তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন। আরও অনেকের মতো আমিও প্লাজমা দিতে রাজি হয়ে যাই। যদি ভাইরাস আক্রান্ত কেউ সেই প্লাজমা দিলে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাহলে তো ভালই," বলছেন মি. বাশা।

রবিবার তাদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারেই যন্ত্র নিয়ে এসেছিলেন ডাক্তারদের দল। সেখানেই তার রক্ত থেকে প্লাজমা নেওয়া হয়।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

মি. বাশা বলছিলেন একটা সময়ে তাদের বদনাম করেছেন অনেকে যে, তাবলীগ সদস্যদের জন্যই সারা ভারতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন তাদের প্লাজমা দিয়েই অসুস্থ ব্যক্তিদের সুস্থ করে তোলার মাধ্যমে সেই দুর্নাম ঘোচানোর সুযোগ পেয়েছেন তারা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ভারতের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পিছনে তাবলীগ জামাতের সদস্যদের ওপরে দায় চাপানো হচ্ছিল মূলস্রোতের গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে।

সেই ধারণা ছড়িয়ে পড়ার পিছনে মুসলমান বিদ্বেষও কাজ করেছিল বলে মনে করেন অনেকে - কারণ যারা তাবলীগকে দোষ দিচ্ছিলেন, তাদের অনেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমর্থক।

ফেসবুকে খুবই সক্রিয় এক বিজেপি নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বলছিলেন তাবলীগ সদস্যরা যেভাবে প্লাজমা দান করছেন, তা ইতিবাচক।

"তারা এখন প্লাজমা দিতে এগিয়ে এসেছেন, এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ঘটনা। এবং আমার মনে হয় তাবলীগ সদস্যরা যেমন ধর্ম প্রচার করেন, এখন থেকে তার পাশাপাশি সামাজিক বার্তাও যদি তারা দেন, তাহলে মানবসভ্যতার পক্ষে তা উপকারী হবে," বলছেন মি. সেনগুপ্ত।

তবে একই সঙ্গে তিনি যোগ করলেন, "প্রায়শ্চিত্ত বলে একটা কথা আছে এবং তার মাধ্যমেই মানুষের নতুন করে জন্ম হয়। এতদিন তাদের শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ করে রাখা হয়েছিল। করোনা তাদের ভারতবাসী হয়ে উঠতে সাহায্য করল।"

দিল্লির রাজপথে লকডাউনে এখনও মানুষজন নির্দ্বিধায় বাজার করছেন। দিল্লির কান্তি নগর - ২৭শে এপ্রিল ২০২০।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তাবলীগ জামাত থেকে সংক্রমণ ছড়ানো নিয়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে।

করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের প্লাজমা সংক্রমিতর দেহে প্রবেশ করিয়ে দিল্লিতে সাফল্য পাওয়া গেছে। তারপরে মুম্বাইতেও শুরু হয়েছে প্লাজমা নেওয়া। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্লাজমা চিকিৎসার সাফল্য তুলে ধরেছেন।

যদিও এই চিকিৎসা এখনও ক্লিনিকাল ট্রায়ালের পর্যায়তেই আছে।

তবে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ প্লাজমা চিকিৎসা নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি।