করোনাভাইরাস: লকডাউনের সময় একা থাকা বয়স্কদের দেখাশোনা হচ্ছে কীভাবে

প্রবীণ নারী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের একটি বড় অংশই বয়সে প্রবীণ (ফাইল ছবি)
Published

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ বয়সে প্রবীণ হওয়ায়, বাংলাদেশের বয়স্ক ব্যক্তিরা কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন তাদের সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যরাও।

ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বাংলাদেশে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যে কার্যত লকডাউন পরিস্থিতি চলছে, এরমধ্যে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনেছেন এই বয়স্ক ব্যক্তিরা।

যেমন ঢাকার বাসিন্দা আবদুল ওয়াদুদ শামসুজ্জোহা এবং তার স্ত্রী শামসুন্নাহার আগে নিয়মিত হাঁটতে বের হতেন।

নিজেরাই প্রয়োজনীয় বাজার করতেন। এছাড়া নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার অভ্যাস ছিল সত্তোরোর্ধ মি. শামসুজ্জোহার।

কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

"করোনাভাইরাসের সতর্কতায় বলা হয়েছে বাড়ির বাইরে বের না হতে। বিদেশ থেকে ছেলেমেয়েরা ফোন করে বলে যেন বাসাতেই থাকি। আগে যে তরকারি ৩/৪ দিনে শেষ করতাম সেটা গত ৭/৮ দিন ধরে খাচ্ছি। এখন দরকারেও বের হইনা," বলেন মি. শামসুজ্জোহা।

আবার ভাইরাসের সংক্রমণ যাতে না হয় সেজন্য বাড়িতে কাজের লোককে আসতেও মানা করে দিয়েছেন ষষ্ঠর্ধ মিজ শামসুন্নাহার।

তিনি বলেন, কাজের লোক ছেড়ে দেয়ার পর এখন তারা দুইজনই সব কাজ করেন।

''এটা তো আমাদের জন্য কষ্ট হয়ে গিয়েছে অনেক,'' তিনি বলেন।

''আমার আবার ডায়াবেটিস আছে, নিয়মিত হাঁটতে হয়। এখন সেটাও বন্ধ। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্যও বেরচ্ছি না। সাবধান থাকতে গেলে কষ্ট তো করতেই হবে," বলেন মিজ শামসুন্নাহার।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner
পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অন্যান্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অন্যান্যরা।

আবার অনেকই আছেন যারা নিয়ম মানতে চাইছেন না। তাদের নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বীথি সপ্তর্ষি এবং তার একমাত্র ভাই ঢাকায় থাকেন। তাদের বাবা-মা থাকেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তারা মা-বাবাকে বারবার বাড়ির ভেতরে থাকার কথা বললেও অনেক সময় তারা সেটা এড়িয়ে চলছেন।

"আমার মা'কে তাও বোঝানো যায়। কিন্তু বাবাকে বোঝানো খুব কঠিন হয়ে যায়। বাবার হাইপ্রেশার আছে। বারবার মানা করার পরও এদিকে ওদিকে হাটতে বের হয়ে যান। তখন ফোনও ধরেন না। জানে যে জিজ্ঞেস করবো কেন বের হলেন। কি যে টেনশন। তাদের কিছু হলে তো দেখার কেউ নেই।" বলেন, মিস সপ্তর্ষি।

তবে দুশ্চিন্তা না করে বয়স্কদের সচেতন করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটার জন্য তাদের যেন বাইরে বের হতে না হয় সেজন্য পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বা প্রতিবেশীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বয়স্ক ব্যক্তি মাস্ক পরে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বয়স্কদের সচেতন হওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) এর ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান তাহমিনা শিরিন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, উন্নত দেশে এতো আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা থাকা সত্ত্বেও মানুষ মারা যাচ্ছে।

''তাদের যতো ভেন্টিলেটর আছে, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক আছে। আমাদের তো তা নেই। কোন ভেন্টিলেটর ফাঁকা নেই,'' তিনি বলেন।

'' এখন কারও যদি ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হয়, সেই ব্যাকআপ তো আমরা এই মুহূর্তে দিতে পারবো না। সেটা তাদেরকে বোঝাতে হবে।

"বয়স্কদের সঙ্গে তো চাইলেই কঠোর হওয়া যায় না। কিন্তু তাদেরকে যুক্তি দিয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতিটা বোঝাতে হবে,'' তাহমিনা শিরিন বলেন।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের এক গবেষণা অনুযায়ী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের মৃত্যুর হার, ৪০ বছরের কম বয়সীদের চাইতে ১০ গুণ বেশি।

আবার বাংলাদেশে সম্প্রতি ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে এক নারীর করোনাভাইরাস থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠার নজির রয়েছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে বয়স্কদের সচেতন হওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।