করোনাভাইরাস: "টেস্টিং কিটের অভাবে আক্রান্তরা বাড়িতে বসে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে" - বিবিসিকে নিউইয়র্কের একজন ডাক্তার

ছবির উৎস, Getty Images
করোনাভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যার বিবেচনায় তালিকার শীর্ষে এখন যুক্তরাষ্ট্র, এবং এই পরিস্থিতির জন্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের প্রস্তুতির অভাবকেই দায়ী করছেন।।
নিউইয়র্ক থেকে একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষ টেস্টিং কিট বাজারে আনতে এত দেরি করেছে যে, করোনাভাইরাস আক্রান্ত অসংখ্য লোক টেস্ট করাতে না পেরে দিনের পর দিন বাড়িতে বসে থেকেছেন, এবং এর ফলে সংক্রমণ পুরো কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
ডা. খন্দকার নিউইয়র্কের অভিবাসী-প্রধান কুইন্স এলাকার এলমহার্স্ট হাসপাতালের একজন চিকিৎসক এবং ২৫ বছর ধরে তিনি আমেরিকায় ডাক্তারি করছেন। পাশাপাশি তার একটি আউটপেশেন্ট মেডিক্যাল সেন্টারও রযেছে।
"আউটপেশেন্ট সেন্টারগুলোতে যেহেতু আমরা টেস্ট করাতে পারছি না - তাই আক্রান্ত লোকেরা ১০-১২দিন ধরে বাড়িতে বসে আছে এবং তা অন্যদের মধ্যে ছড়াচ্ছে" - বিবিসি বাংলার শাকিল আনোয়ারকে বলেন ডা. খন্দকার।
আমেরিকায় করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা এখন চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে, এবং যে মাত্রায় সেখানে করেনাভাইরাস ছড়াচ্ছে, তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মৃতের সংখ্যা দুই লাখে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে নিউইয়র্ক রাজ্যে, বিশেষ করে এ রাজ্যের অন্তর্গত নিউইয়র্ক সিটিতে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী যেখানে মৃতের সংখ্যা নয়শ' ছাড়িয়ে গেছে।

ছবির উৎস, ফেসবুক
ডা. খন্দকার বলছিলেন, "নিউইয়র্কের ৭০ শতাংশ লোকই মনে হচ্ছে সংক্রমিত হয়ে গেছে। গত বছর এই সময়ে আমরা সর্দি-কাশির রোগী পেয়েছি ১০-১২ শতাংশ। এবার দেখছি হাসপাতালে ৮০ শতাংশ লোকই এসব লক্ষণের কথা জানাতে ফোন করছে।"
"আমার আউটপেশেন্ট হেলথ সেন্টারে চারজন অপারেটর আছে। সেখানে এত ফোন আসছে যে তারা সামাল দিতে পারছে না। প্রতিদিন কমপক্ষে আশিজন করে লোক ফোন করছে। সবাই বলছে, আমার সর্দি, আমার কাশি, আমার শ্বাসকষ্ট - আমার কী হবে, আমি কী করবো?"
"আমি যে এলমহার্স্ট হাসপাতালে কাজ করি সেটা নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায়। সেখানে এখন যত রোগী ভর্তি আছে তার ৯৫ শতাংশই হচ্ছে করোনাভাইরাস আক্রান্ত। প্রচুর রোগী মারা যাচ্ছে সেখানে। এই হাসপাতালটির চারপাশে প্রায় ১০ মাইল ব্যাসার্ধের এলাকার অধিকাংশই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। বেশির ভাগ অভিবাসী সম্প্রদায়ের। তাদের জীবনযাপন বা চলাফেরা অতটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সেই কারণে এই মানুষগুলোই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।"
"একটি বিল্ডিংএ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি যদি একজন থাকে তাহলে সেখানকার ২০০ লোকের সবাই সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে।"
কিন্তু কী করে নিউইয়র্কের মতো একটা আধুনিক শহরে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারলো?
ডাক্তার খন্দকার বলছিলেন, "আসলে করোনাভাইরাস 'টেস্টিং কিট' সময়মতো আসে নি। আসছে, আসবে করতে করতে এক মাস দেরি করে ফেলেছে। এটা হলো এক নম্বর কারণ। দু নম্বর কারণ, এই টেস্টিং কিট যখন এলো, তখনও এটা পাওয়া যাচ্ছে শুধু মাত্র হাসপাতালগুলোতে। মেডিক্যাল সেন্টারগুলোতে নয়। সে জন্য আক্রান্তদের যে টেস্ট করা হবে, তারপর চিকিৎসা হবে - সেটা করাই যাচ্ছে না। "

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলছেন,"সাধারণ জ্বর-সর্দি-কাশি তিন থেকে পাঁচদিনে ভালো হয়ে যায় কিন্তু এই ভাইরাস থাকে ১০ থেকে ১২ দিন। সবাই বাসায় বসে থেকে ভালো হবার চেষ্টা করছে কিন্তু যে সাবধানতাগুলো অবলম্বন করতে হয়, তা কেউ করছে না। যেহেতু টেস্ট করা যাচ্ছে না - তাই সবাই ভাবছে তার সাধারণ সর্দিকাশি হয়েছে।"
"তারা যদি জানতে পারতো যে তাদের করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে তাহলে তারা ফুল কোয়ারেন্টিনে যেতে পারতো কিন্তু সেটা হচ্ছে না।"
এজন্য আামি সরকারকেই দায়ী করবো। প্রথমেই যদি তারা লক্ষ লক্ষ ডায়াগনস্টিক কিট দিয়ে দিতো, তাহলে পরিস্থিতি এমন হতো না। সরকার প্রথম দিকে ব্যাপারটা পাত্তাই দেয় নি। তার পরও কিট আনতে আনতে তিন সপ্তাহ দেরি করে ফেলেছে।
এ অবস্থায় ডাক্তাররা তাহলে কতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন?
জবাবে ডাক্তার খন্দকার বলেন, "হাসপাতালগুলোর অবস্থা সত্যি খুব খারাপ। একটি সার্জিক্যাল মাস্ক আমরা ৫ সেকেন্ড ব্যবহার করে ফেলে দিই, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন সেই মাস্ক আমাদের পুরো এক দিন পরে থাকতে হচ্ছে। এর চেয়ে উন্নত যে মাস্ক - তা অনেককে সাতদিন ধরে ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর পিপিই অর্থাৎ সংক্রমণ প্রতিরোধী অন্যান্য সরঞ্জামের কথা বাদই দিলাম। "
"বাংলাদেশী ডাক্তার আমরা যারা আছি - তাদের ৯০ ভাগ ইতোমধ্যেই সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। "
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কতজন এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা গেছেন?
ডা. খন্দকার বলেন, "এখন পর্যন্ত ৩০ জনের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু আমরা তাদের কথাই জানতে পারছি যাদের কথা মিডিয়ায় এসেছে সাথে আমার ধারণা আরো ২৫-৩০ জন আছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০এর বেশি হবে। "

ছবির উৎস, Getty Images
আমি প্রথম দিকে খুব ভয়ে ছিলাম যে, আমার এত প্রিয় এই শহরে এমন একটা ঘটনা ঘটছে কিন্তু আমরা কিছু করতে পারছি না। অনেক পরিচিত রোগী হাসপাতালে যেতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। অনেকে হাসপাতালে গিয়ে আর ফিরে আসছে না। অনেক বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু দেখে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।
"আমার এক বন্ধু - তিনি সিনিয়র ডাক্তার - আমাকে সেদিন বললেন, তার সহকর্মীরা সবাই সংক্রমিত। তিনি না পারছেন হাসপাতালে গিয়ে কাজ করতে, না পারছেন বাসায় বসে থাকতে।"
"আমরা যারা আউটপেশেন্ট করছি তারা টেলিমেডিসিন করছি। ভিডিওর মাধ্যমে রোগী দেখছি। কিন্তু এটা হচ্ছে যান্ত্রিকভাবে রোগী দেখা। প্রথম দিকে আমি পিপিই দিয়ে দেখতাম।"
"কিন্তু তার পর আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে গেলাম। তার পর আমি ইনকিউবেটর বানালাম। ইনকিউবেটরের ভেতর থেকে রোগী দেখতাম, রোগী চলে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতাম। কিন্তু এভাবে কি রোগী দেখা হয়? "
"রোগী দেখতে হলে তো নিজ হাতে তা পালস অনুভব করতে হবে। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে কতদিন চলবে?" - বলছিলেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার।








