পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২২ বছর: পাহাড়ে সংঘাত থামছে না কেন

পার্বত্য চট্টগ্রাম, চুক্তি, বাংলাদেশ।
ছবির ক্যাপশান, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগে
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে পার্বত্য চুক্তির ২২ বছর পার হলেও তিন পার্বত্য জেলায় সংঘাত, অস্থিরতা বেড়েই চলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ স্বীকার করেছেন।

এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়েই বিতর্ক এখনও থামছে না।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী পাহাড়ীদের একটি সংগঠন জনসংহতি সমিতি অভিযোগ করছে, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠী নানান উদ্দেশ্য নিয়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ পাচ্ছে এবং সেকারণে সেখানে অস্থিরতা বাড়ছে।

পার্বত্য অঞ্চলে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীদের অনেকে বলছেন, চাঁদাবাজি এবং অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই আঞ্চলিক দল এবং গোষ্ঠীগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং সংঘাত হচ্ছে।

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জন সংহতি সমিতির মধ্যে এই শান্তি চুক্তিটি হয়েছিল।

এই চুক্তির মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান হয়েছিল। পাহাড়ে তার একটা ইতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। গত ২২ বছরে এসব প্রশ্ন আর অভিযোগের পাল্লা ভারি হয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলায় জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যাকে পাহাড়িদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, এর সমাধানে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে পাহাড়িদের সংগঠনগুলোর প্রশ্ন রয়েছে।

রাঙামাটি থেকে একজন মানবাধিকার কর্মী টুকু তালুকদার বলছেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনেক রকম স্বার্থ তৈরি হয়েছে, সেজন্য সংকট বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন,"আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে চুক্তি হওয়ার পর সরকার তার বাস্তবায়ন শুরু করেছিল। তার পর বিএনপি সরকার আসলো। তখন সেই চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া একটা বিরতিতে পড়লো।তখন এখানে বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপ ঢুকে যায়।"

"ইন্টারেস্ট গ্রুপ যখন ঢুকে যায়, তখন চুক্তিবিরোধীরা অনেক ইস্যু নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে। আবার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। কারণ ইন্টারেস্ট গ্রুপ বেড়ে গেছে। এখানে বিষয় জিইয়ে রাখা এবং অনেক ইন্টারেস্ট গ্রুপের কারণে বিষয়টা ঘোলাটে হয়ে গেছে," বলেন তিনি।

আরো পড়তে পারেন:

পাহাড়ে সংঘাতের কারণে চাপা আতংকে থাকেন সাধারণ মানুষ
ছবির ক্যাপশান, পাহাড়ে সংঘাতের কারণে আতংকে থাকেন সাধারণ মানুষ

আরো পড়ুন:

পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিনটি জেলা পরিষদ গঠনকে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সেগুলোতে ২২ বছরে কোন নির্বাচন করা হয়নি।

এছাড়া আঞ্চলিক পরিষদের হাতে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া এবং সব সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করাসহ চুক্তির বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ করে আসছে পাহাড়ি সংগঠনগুলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির কারণে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়িদের রাজনৈতিক দলগুলো অধিপত্য বিস্তারের দিকে ঝুঁকেছে। সেজন্য তাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লামার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিও বিভক্ত হয়েছে। ভাগ হয়েছে চুক্তি বিরোধী পাহাড়িদের একটি সংগঠন ইউপিডিএফ।

পার্বত্য এলাকায় নাগরিক পরিষদ নামের বাঙালীদের একটি সংগঠনের একজন নেত্রী নুরজাহান বেগম বলছেন, "আঞ্চলিক দলগুলো এবং সেখানে তৎপর বিভিন্ন গোষ্ঠীর এখন আয়ের মূল উৎস হয়েছে চাঁদাবাজি। ফলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘাত বেড়েই চলেছে। এখানে অর্থস্বার্থই এখন একমাত্র বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

পার্বত্য চট্টগ্রামের পুলিশ বলছে, অধিপত্য বিস্তারে গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সে কারণে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম উদ্বেগ রয়েছে।

পার্বত্য এলাকার পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে তিন পার্বত্য জেলায় সংঘাতে কমপক্ষে ২২ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পাহাড়িদের সংগঠন বা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত যেমন বাড়ছে, তেমনি পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যেও বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ হয়েছে।

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির নেতা উষাতুন তালুকদার বলেছেন, চুক্তির বেশিরভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট কাটছে না।

তিনি বলেন, "অনেকে বলে থাকেন, আমরা অস্ত্র রেখে এসেছি বা নতুন করে এগুলো বের করেছি। কিন্তু আমরা গণতান্ত্রিক দল। খুবই আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছার সাথে চুক্তি করে আমরা ফিরে এসেছি। এসে দেখা গেলো যে, নানা কারণে এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। যারা এখন অস্ত্রবাজি করছে, তাদের তো আদর্শ নেই।"

"যে উদ্দেশ্য নিয়ে চুক্তি হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য বা আদর্শের ধারে কাছে যাওয়া কি সম্ভব হয়েছে? চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে এখানে শান্তি আসবে না।"

সরকার বরাবরের মতো এখনও এসব বক্তব্য মানতে রাজি নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তির ছোটোখাটো যে বিষয়গুলো এখনও বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলোর দিকে সরকারের নজর রযেছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, পাহাড়ে সংঘাতের নেপথ্যে

আরো পড়ুন: