আসামের ডিটেনশন সেন্টারে আটক কথিত বাংলাদেশীদের মুক্তি অনিশ্চিত

আসামে নাগরিক তালিকায় নাম তোলাতে নথিপত্র জমা দিচ্ছেন রাজ্যের বাসিন্দারা। ফাইল চিত্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামে নাগরিক তালিকায় নাম তোলাতে নথিপত্র জমা দিচ্ছেন রাজ্যের বাসিন্দারা। ফাইল চিত্র
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
  • Published

ভারতে আসাম রাজ্যের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে যেসব 'বিদেশি' তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আটক আছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকার তাদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বন্দীরা কার্যত কেউই তার সুফল নিতে পারছেন না।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই কথিত বিদেশিদের মুক্তির জন্য যেভাবে দুলক্ষ টাকা দিয়ে দুজন জামিনদার রাখার কথা বলা হয়েছে তা জোগাড় করা এদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

এ মাসের শেষেই আসামে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। তারপর ডিটেনশন সেন্টারগুলোর হাল আরও খারাপ হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আসামের শিলচর, কোকরাঝাড়, গোয়ালপাড়া, তেজপুর বা জোড়হাটে অবৈধ বিদেশিদের জন্য মোট ছটি ডিটেনশন সেন্টারে বাংলাদেশী সন্দেহে শত শত ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে আটক আছেন।

কথিত বিদেশিদের খেদানোর দাবিতে আসামে আন্দোলন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কথিত বিদেশিদের খেদানোর দাবিতে আসামে আন্দোলন

কিন্তু এই 'অমানবিক ও বেআইনি প্রথা' রদ করতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেওয়ার পর আসামের বিজেপি সরকার স্থির করেছে, যারা তিন বছরের বেশি সময় ধরে সেন্টারগুলোতে বন্দী আছেন তারা এখন মুক্তি পেতে পারেন।

তবে তার জন্য তাদেরকে মোট দু'লক্ষ টাকার বন্ডে দুজন জামিনদার রাখতে হবে, আর একটি যাচাই করার মতো ঠিকানাও পেশ করতে হবে - যেখানে স্থানীয় পুলিশ থানায় তারা প্রতি সপ্তাহে হাজিরা দেবেন।

শিলচরের সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্ট জয়দীপ বিশ্বাসের মতে এই পদক্ষেপ আসলে 'লোকদেখানো।'

তার কথায়, "ডিটেনশন ক্যাম্পে তো কাউকে সারা জীবন রেখে দেওয়া যায় না।"

"ডিপোর্টেশনের পরবর্তী পদক্ষেপটা হল ডিপোর্টেশন, কিন্তু মুশকিল হল এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের কোনও দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা নেই।"

শিলচরের সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্ট জয়দীপ বিশ্বাস

ছবির উৎস, Joydeep Biswas/Facebook

ছবির ক্যাপশান, শিলচরের সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্ট জয়দীপ বিশ্বাস

"তাহলে সরকার এই লোকগুলোকে নিয়ে করবেটা কী? তুমি ডিপোর্ট করতে পারছ না বলে কি আজীবন এদের ক্যাম্পে রেখে দেবে?"

"সুপ্রিম কোর্টও এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সরকার এদের মুক্তির জন্য আইন করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সেই মুক্তির বিধিনিষেধ এতটাই কঠিন যে ডিটেনশন সেন্টার থেকে কেউ বেরোতেই পারবেন না বলে আমার বিশ্বাস", বলছিলেন তিনি।

সদ্য আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টার সরেজমিনে সফর করে এসেছেন বিবিসির সাংবাদিক প্রিয়াঙ্কা দুবে, তিনিও মনে করেন "মুক্তির জন্য যেধরনের কঠিন শর্ত রাখা হয়েছে তার সুযোগ কেউই নিতে পারবে বলে মনে হয় না।"

"দুলক্ষ রুপি জোগাড় করা যেমন তাদের জন্য অসম্ভব, তেমনই কঠিন যাচাই করার মতো একটা স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া।"

আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল

"সেই ঠিকানা ছিল না বলেই তো তাদের এই ডিটেনশন সেন্টারে ঠাঁই হয়েছে!", বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা দুবে।

মোটা টাকা দিয়ে কে-ই বা তাদের জন্য জামিনদার হতে রাজি হবেন, প্রশ্ন তুলছেন জয়দীপ বিশ্বাসও।

"শুধু টাকা দিলেই তো হবে না, দুজন জামিনদারও জোগাড় করতে হবে। পার্সোনাল বন্ডে তো আর ছাড়ছে না, এক লক্ষ টাকা করে দুটো সিওরিটিও লাগবে।"

"এখন বলুন, এই সহায় সম্বলহীন ও গরিব মানুষগুলো, যাদের কাগজপত্রের ঠিকঠিকানা নেই বলেই তারা আজ ডিটেনশন ক্যাম্পে - কে তাদের হয়ে জামিনদার হবে, আর কে-ই বা এতগুলো টাকা দেবে?"

আসামের সঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তে টহল দিচ্ছে বিএসএফ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামের সঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তে টহল দিচ্ছে বিএসএফ

ফলে এটা নিছক আইন বাঁচানোর জন্য একটা অবাস্তব পদক্ষেপ বলেই অধ্যাপক বিশ্বাসের দৃঢ় ধারণা।

কিন্তু আইন দিয়ে নয়, মানবিক দৃষ্টিতে দেখলেই কেবল এই বিপুল সঙ্কটের একটা সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করছেন।

এদিকে, ৩১ আগস্ট এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা বেরোলে এক ধাক্কায় আসামে এই কথিত বিদেশীর সংখ্যা বিশ, তিরিশ বা চল্লিশ লক্ষ বেড়ে যাবে, ডিটেনশন সেন্টারগুলোর সেই চাপ সামলানোর কোনও ক্ষমতাই নেই।

দিল্লিতে লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী ফারাহ নকভি মনে করেন, "এই কথিত বিদেশিদের সম্পর্কে বিজেপি নেতারা 'উইপোকা', 'অনুপ্রবেশকারী' বা 'ঘুষপেটিয়ার' মতো নানা ধরনের প্ররোচনামূলক শব্দ ব্যবহার করছেন যা থেকে বুঝতে কোনও অসুবিধা হয় না তাদের আসল নিশানা মুসলিমরাই।"

লেখিকা ফারাহ নকভি

ছবির উৎস, Farah Naqvi/Facebook

ছবির ক্যাপশান, লেখিকা ফারাহ নকভি

"অন্যদিকে মোদী-অমিত শাহ বারবার বলছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা অনুপ্রবেশকারী নন, তারা এখানে আশ্রয় পাবেন।"

তবে ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে এখন যারা আটক আছেন এবং এনআরসি-তে যাদের নাম বাদ পড়তে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে মুসলিমদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় হিন্দুরাও আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।