দরিদ্র গ্রামে থেকেও ভারতকে চাঁদ আর মঙ্গলে পৌঁছে দিয়েছেন যিনি

ড. আন্নাদুরাই
ছবির ক্যাপশান, ড. আন্নাদুরাই চন্দ্রায়ন-১ এর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন
Published

"ক্লাস শুরু হওয়ার আগে গরুর গোবর পরিষ্কার করতাম আমি। কিন্তু দুর্গন্ধ থেকে যেতো।" বলেন ড. মিলস্বামী আন্নাদুরাই।

নিজের পেশায় থাকা আর অন্য আট-দশ জনের মতো শিক্ষার সুযোগ ছিল না তার।

তিনি ভারতের প্রথম সারির একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী- মঙ্গল আর চন্দ্রাভিযানের সফলতার পেছনে অবদান রয়েছে তার।

শিক্ষাজীবনের প্রথম তিন বছর তিনি ক্লাস করেছেন অদ্ভুত সব জায়গায়। কখনো গাছের তলায়, কখনো মন্দিরের বারান্দায় আবার কখনো গোয়াল ঘরে ক্লাস করেছেন তিনি।

তাহলে কিভাবে প্রযুক্তি শিল্পের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেন তিনি?

প্রাথমিক অভিযান

আন্নাদুরাইয়ের পায়ে পরার মতো কোন জুতা ছিল না। আর তার গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেছিলো যখন তার বয়স আট বছর। তবে দ্রুতই পরিবর্তিত হচ্ছিল পৃথিবী।

আরো পড়তে পারেন:

আন্নাদুরাইয়ের স্কুলের ছবি
ছবির ক্যাপশান, নয় বছর বয়সে স্কুলের বন্ধুদের সাথে আন্নাদুরাই

১৯৬০ সালের ওই সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার প্রতিযোগিতা গিয়ে ঠেকেছিলও মহাকাশ পর্যন্ত।

ভারতও সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম রকেট লঞ্চ করে দেশটি।

তবে এসবের কিছুই সাধারণ ভারতীয়দের জীবনযাত্রায় তেমন প্রভাব ফেলেনি।

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর ছোট গ্রাম কোধাবাড়িতে বেড়ে উঠছিলেন আন্নাদুরাই।

তার মতো ভারতের বেশিরভাগ মানুষ তখন শিল্প-পূর্ব যুগে বাস করছিলেন যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ ছিল অপ্রতুল।

মেধাবী শিক্ষার্থী

তবে দরিদ্রতা পড়াশুনায় তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিজ্ঞান আর গণিত পছন্দ ছিল তার। আর ঘৃণা করতেন ইতিহাস।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভাইদের সাথে আন্নাদুরাই
ছবির ক্যাপশান, ভাইদের সাথে আন্নাদুরাই(মাঝে)

বিবিসিকে তিনি বলেন, "আমার বাবা বলতেন যে, ইতিহাস তৈরি করতে হলে ইতিহাস পড়তে হয়।"

তার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। আর সেলাইয়ের কাজ করে কিছুটা বাড়তি উপার্জন করতেন তিনি।

পরিবারকে ভরণপোষণের জন্য তার আয় যথেষ্ট হলেও সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই থাকতো না।

এক সময় তিনি ভেবেছিলেন, আন্নাদুরাই হয়তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগই পাবে না।

কিন্তু হঠাৎ করেই জীবন বদলে দেয়ার মতো সুযোগ পেয়ে যান কিশোর আন্নাদুরাই।

"আমার বয়স যখন ১২ বছর, তখন রেডিওতে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি এক বৃত্তির খবর শুনি আমি। আর আবেদনও করি", বলেন আন্নাদুরাই।

ওই বৃত্তি তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে তাকে পাশের শহরের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হতে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, "সেসময় আমার বাবা প্রতিমাসে ১২০ রুপি আয় করতেন।

আর বৃত্তির অর্থ ছিল বছরে এক হাজার রুপি।" ১৯৭০ সালে এক ডলার সাড়ে সাত রুপির সমান ছিল।

জেলার সেরা আর রাজ্যে ৩৯তম মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে স্কুল শেষ করেন তিনি।

যা পরবর্তীতে তাকে আরও শিক্ষার খরচ যোগাতে সহায়তা করে।

প্রাথমিক সংগ্রাম

আন্নাদুরাই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির কিছুদিন আগে, ১৯৭৫ সালে রাশিয়ার সহায়তায় আরিয়াভাটা নামে নিজেদের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা।

স্যাটেলাইটের সংকেত গ্রহণের জন্য ব্যাঙ্গালোরের বেশ কিছু শৌচাগারকে তাৎক্ষনিকভাবে তথ্য কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।

ছয় মাস চলার জন্য স্যাটেলাইটটির নকশা করা হয়েছিলো। তবে এটি ঠিকভাবে কাজ করেছিলো মাত্র চার দিন।

ইসরোতে যোগ দেয়ার সময়কার আন্নাদুরাইয়ের ছবি
ছবির ক্যাপশান, ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে আন্নাদুরাই

চার বছর পর, স্যাটেলাইট বহনে সক্ষম ভারতের নিজেদের তৈরি একটি রকেট উৎক্ষেপণ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে আন্নাদুরাই ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা-আইএসআরও তে যোগ দেন।

তিনি বলেন, "অ্যাসবেসটস শিটের নিচে আমরা কাজ করতাম। আর প্রতি চার বছরে মাত্র একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতাম।"

তামিলভাষী হওয়ার কারণে এবং ইংরেজি ও হিন্দিতে দুর্বলতা থাকায় যোগাযোগে বেশ অসুবিধার মুখে পড়তে হতো তাকে।

তিনি বলেন, "অনেক সময় মানুষ আমার ইংরেজি শুনে হাসতো।"

তিনি প্রথম যে স্যাটেলাইটটিতে কাজ করেছিলেন সেটি পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার উপরে একটি কক্ষপথে পৌঁছানোর জন্য নকশা করা হয়েছিলো।

কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সেটি বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়।

চাঁদে চিত্র ধারণ

শুরুটা খারাপ হলেও, আটটি আইএনএসএটি বা ইনসাট স্যাটেলাইট অভিযানে কাজ করেছেন তিনি।

ইনসাট'স হল ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচীর মূল চালিকাশক্তি। যেগুলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে ম্যাপিং এবং সম্প্রচার-সবই করতো।

২০০৩ সালে, চন্দ্রাভিযান হাতে নেয়ার আগে, একবার মহাকাশ সংস্থা ছেড়ে দিয়ে বেসরকারি খাতে লোভনীয় চাকরী করারও চিন্তা করেছিলেন আন্নাদুরাই।

আন্নাদুরাই নিয়মিত তার গ্রামে যান
ছবির ক্যাপশান, আন্নাদুরাইয়ের মতে, মহাকাশ কর্মসূচী ভারতীয় কৃষকদের অনেক সহায়তা করেছে

তিনি বলেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আগের অভিযানগুলোতে যেসব বিষয় বাদ পড়েছে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করা।

আমরা জানতে চেষ্টা করেছিলাম যে, চাঁদে কি পরিমাণ পানি রয়েছে এবং এগুলোর গঠন কেমন।"

২০০৮ সালের এক বৃষ্টিময় বর্ষার দিনে চেন্নাই থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরের শ্রীহরিকোটা থেকে চন্দ্রাভিযান-১ উৎক্ষেপণ করা হয়।

এটি চাঁদের বুকে ভারতের পতাকা স্থাপন করে এবং চাঁদের পানির উপস্থিতি প্রমাণ করে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে এই সফলতা উদযাপন করা হয়।তবে যেখানে লাখ লাখ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের অর্থ নেই সেখানে এ ধরণের প্রকল্পে অর্থ খরচ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন।

ড. আন্নাদুরাই অটল ছিলেন।

তিনি বলেন, "দরিদ্রের একটা বড় কারণ ছিল শিল্প বিপ্লবে আমাদের অংশগ্রহণ না করা। জাতি হিসেবে এতো বিপুল মানব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মহাকাশ গবেষণার সুবিধা না নিয়ে শুধু দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারি না আমরা।"

মঙ্গল এবং আরও কিছু

কয়েক বছর পর, তার নেতৃত্বেই প্রথম দেশ হিসেবে মঙ্গলে প্রথম চেষ্টাতেই নমুনা পাঠাতে সক্ষম হয় ভারত।

উৎক্ষেপনের জন্য মার্স অরবিটার প্রস্তুত করা হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, রকেটের ভেতর মার্স অরবিটার স্থাপন করা হয়

তিনি বলেন, "চাঁদে পৌছাতে হলে আমাদের স্যাটেলাইটকে প্রতি সেকেন্ডে এক কিলোমিটার যেতে হতো।

আর মঙ্গলে পৌঁছাতে হলে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করার প্রয়োজন হয়। যা করতে বড় ধরণের পরিকল্পনা ও গণনার দরকার হয়েছিলো।"

ভারতের মঙ্গল পরিক্রমণকারী যানকে "লাল গ্রহে" পৌছাতে সাড়ে ১০ মাস লেগেছিল। খরচ হয়েছিলো ৭৩ মিলিয়ন ডলার। তবে এটি ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সস্তা মঙ্গল অভিযান।

২০০০ রুপি নোট
ছবির ক্যাপশান, ২০০০ রুপির নোটে মার্স অরবিটারের ছবি

তিনি বলেন, "আমি আমার উপদেষ্টা প্রফেসর ইউ আর রাওকে বলেছিলাম যে, আপনার স্যাটেলাইট আরিয়াভাটার ছবি দুই টাকার ব্যাংক নোটে ছাপা হয়েছিলো।

"আর আমার মঙ্গল অরবিটারের ছবি ছাপা হয়েছে দুই হাজার টাকার ব্যাংক নোটে। আমরা হাজার গুণ এগিয়ে গেছি", তিনি বলেন।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

চাঁদে ভারতের প্রথম অভিযানের ১১ বছর পর, মহাকাশ বাজার অনেক বদলে গেছে।

স্পেস এক্স এবং এর বারবার ব্যবহার উপযোগী ভারী রকেট আশ্চর্যজনকভাবে ব্যয় কমিয়ে আনছে।

তিনি বলেন, "আমাদের তাল মেলাতে হবে। আমরা বারবার ব্যবহার উপযোগী লঞ্চার উন্নয়নের চেষ্টা করছি।"

ভারতের বারবার ব্যবহার উপযোগি রকেটের ছবি
ছবির ক্যাপশান, বারবার ব্যবহার উপযোগী রকেট উন্নয়নের কাজ করছে ভারত

ভারতের মহাকাশ কর্মসূচীকে বিরল সফলতা হিসেবে ধরা হয় এবং জাতীয়ভাবেও সমর্থন দেয়া হয়।

এই অর্জন ভারতকে প্রযুক্তিগত শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে।

যাই হোক, জাতীয় সম্মান এখনো মহাকাশ কর্মসূচীর মূল চালিকাশক্তি।

আর মহাকাশে মানুষ পাঠানো অভিযানের বিষয়টিও ইসরোর পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বরাই ঘোষণা করেছে।

অতীতের মতোই এখনো ইসরোর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই যেমন বর্তমান প্রধানও ড. আন্নাদুরাইয়ের মতোই গ্রামাঞ্চল কিংবা ছোট শহর থেকে এসেছেন।

চন্দ্রায়ন-২

জুলাইয়ে ভারত তার বিলম্বিত চন্দ্র অভিযান "চন্দ্রায়ন-২" শুরু করবে।

চাঁদে প্রথম অভিযানের ১১ বছর পর হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় এই অভিযান। এই অভিযান চন্দ্র পৃষ্ঠ এবং এতে থাকা পানি, খনিজ এবং পাথরের গঠন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে।

শুরুর বছরগুলোতে এই অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন ড. আন্নাদুরাই।

"চন্দ্রায়ন-২" এর অরবিটার ভেহিকেলে কাজ করছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা
ছবির ক্যাপশান, সব ঠিক থাকলে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে রোভার অবতরণকারী প্রথম দেশ হবে ভারত

তিনি বলেন, "এখনো পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি জটিল।"

এটি সফল হলে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার আর চীনের পর ভারত হবে চাঁদের বুকে নিয়ন্ত্রিত অবতরণে সক্ষম চতুর্থ দেশ।

স্বীকৃতি

ড. আন্নাদুরাই চাঁদে দ্বিতীয় অভিযানের সমাপ্তি দেখে যেতে চেয়েছিলেন।

তবে গত বছরের জুলাইয়ের শেষ দিনে অবসর নেন তিনি।

তিনি মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ক জাতিসংঘের কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন টানা দুই বছর।

ভারত সরকারের তৃতীয় সর্বোচ্চ পুরষ্কারসহ বেশ কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জিতেছেন তিনি।

সহকর্মীদের সাথে কাজ করছেন আন্নাদুরাই
ছবির ক্যাপশান, স্যাটেলাইট লোডিংয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন ড. আন্নাদুরাই

"আমি ১০ বছর বয়সে সাঁতার শিখতে চেয়েছিলাম বলে আমার বন্ধুরা আমাকে চাষাবাদের জন্য তৈরি বড় একটি কুপে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো।

ভেসে থাকতে হাত-পা ছুড়েছিলাম আমি। অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ংকর।

তবে আমি খুব দ্রুত সাতার শিখেছিলাম। আমার কঠিন অবস্থা আমাকে শিখিয়েছে যে, দরিদ্রতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে শিক্ষা," ড. আন্নাদুরাই বলেন।

তিনি নিয়মিত তার গ্রামে যান এবং তার পুরনো স্কুলটি সংস্কারে তহবিল সংগ্রহ করছেন।

ইতিহাস

ড. আন্নাদুরাই একটি ছোট গাড়ি চালান এবং শহরের কাছে একটি আবাসিক এলাকায় বাস করেন।

তিনি বলেন, বেশ আরামেই জীবন পার করছেন এবং অর্থ কখনোই তার কাছে মুখ্য ছিল না।

নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে আন্নাদুরাই
ছবির ক্যাপশান, নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে আন্নাদুরাই

"আমরা যখন চন্দ্রায়ন-১ এ কাজ করতাম, আমি আমার দলের সদস্যদের বলতাম, এটি শুধু একটি প্রকল্প নয় বরং আমরা ইতিহাস গড়ছি", তিনি বলেন।

তিনি হয়তো ক্লাসে ইতিহাস ঘৃণা করতেন কিন্তু ক্লাসরুমের বাইরে ইতিহাসই তৈরি করেছেন বটে।

তার জীবন কাহিনী এখন তার রাজ্য তামিল নাড়ুর স্কুলের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।