চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে যেভাবে পথে নেমেছে ঝাড়খণ্ডের তরুণরা

রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে অবস্থান বিক্ষোভে ঝাড়খণ্ডের যুবসমাজের একাংশ

ছবির উৎস, Debalin Roy/BBC

ছবির ক্যাপশান, রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে অবস্থান বিক্ষোভে ঝাড়খণ্ডের যুবসমাজের একাংশ
    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, রাঁচি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"আমরা তোমাদের ঝাড়খণ্ড দিয়েছি, তোমার জন্য কি এবার চাকরিও কিনে দেব? যাও, আমরা যেরকম লড়াই করেছি, তোমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করো। রাস্তায় নামো।"

বছর ৩৫ এর চাকরিপ্রার্থী কৃষ্ণ দেবের বাবা তাকে বলেছিলেন। ওই যুবকের পিতা একজন কৃষক।

বিহারের দক্ষিণাঞ্চলে আদিবাসী মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয় ও স্বাধীন অস্তিত্বের দাবিতে যে দীর্ঘ আন্দোলন হয়েছিল, তাতে যোগও দিয়েছিলেন মি. দেবের বাবা।

কয়েক দশকের সেই আন্দোলনেরই ফল পাওয়া গিয়েছিল ২০০০ সালে - বিহার ভেঙে গড়া হয়েছিল ঝাড়খণ্ড নামে একটি নতুন রাজ্য।

'ঝাড়খণ্ড' নামের অর্থ অরণ্যের দেশ।

পৃথক রাজ্য গঠনের আন্দোলনের একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে মি. দেবের বাবা এখন মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা পেনশন পান।

গত ১০ বছরে একটি সরকারি চাকরির আশায় তার ছেলে, মি. দেব একাধিক বার ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনো বেকার।

চলতি মাসের ১০ তারিখ রাঁচিতে 'বিধানসভা ঘেরাও' মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "ঝাড়খণ্ড সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত যত সরকারি চাকরির পরীক্ষা হয়েছে সবেতে কোনো না কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষার খাতায় অসংগতি, এমনকি চাকরি বিক্রিও হচ্ছে।"

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বছরের পর বছর ধরে ভেতরে চেপে রাখা ক্ষোভে তার গলাটা কাঁপছিল। সোমবারের মিছিলে তার স্লোগানই ছিল সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বরের একটি।

তার অভিযোগ, "ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে কেবল রোল নম্বরের তালিকা দিয়ে। কাটঅফ মার্ক্স কত, কারা চাকরি পাচ্ছে, তারা আদৌ যোগ্য কি না, আমরা কিছুই জানতে পারছি না।"

সেই মিছিলে ছিলেন তারই মতো ঝাড়খণ্ডের হাজার হাজার হতাশাগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণী। জুলাই মাসের ২৫ তারিখ থেকে তারা রাঁচির রাজপথে আন্দোলন করছেন, একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাবিতে।

রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোসহ পাঁচজন আমরণ অনশনে বসেছেন। তাদের মধ্যে তিন জন হাসপাতালে ভর্তি।

মিছিলে ছিলেন আরেক চাকরিপ্রার্থী অশোক কুমারও, পিঠে ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে।

বিবিসিকে তিনি জানাচ্ছিলেন যে, তার পরিবার এতটাই গরিব, তারা এখনো মাটির বাড়িতে থাকেন। তার প্রশ্ন, এতো বছর ধরে একটি চাকরির জন্য পরিশ্রম করেও কি অবশেষে তাকে তার বাবার মতো চাষের কাজেই ফিরে যেতে হবে?

তিনি বলছেন, "কতদিন হলো ঝাড়খণ্ড আলাদা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজও আমরা দেখছি দিল্লি, হরিয়ানার মতন অন্যান্য রাজ্যের মানুষ এখানে এসে অনৈতিক ভাবে সরকারি চাকরির সুযোগ পাচ্ছে। তারা নাকি ঝাড়খণ্ডের আঞ্চলিক বিষয়ের পেপারে এখানকার ছেলে মেয়েদের থেকে বেশি নম্বর পাচ্ছে। সেটা কীভাবে সম্ভব?"

তিনি প্রশ্ন তুলছেন, "ঝাড়খণ্ড প্রশাসনকে প্রধানত গ্রামের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। বহিরাগতরা আমাদের গ্রামের সমস্যা, আমাদের গ্রামের উন্নয়ন সম্পর্কে কী বুঝবে?"

দুর্বল হয়ে পড়েছেন অনশনকারীরা

ছবির উৎস, Debalin Roy/BBC

ছবির ক্যাপশান, দুর্বল হয়ে পড়েছেন অনশনকারীরা

লাঠি, জলকামান, কিছুই দমাতে পারেনি প্রতিবাদের উদ্যম

অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার আশায় প্রতি বছর ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির কঠিন পরীক্ষাগুলিতে লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থী অংশ নেন।

এই পরীক্ষাগুলি পরিচালনা করে ঝাড়খণ্ড সরকারের মূলত দুই সংস্থা, ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসসি)। উভয় সংস্থার বিরুদ্ধেই ইতোমধ্যে রয়েছে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ।

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও, তাদের আন্দোলনে চোখে পড়ল নানা ধরনের রসিকতাও।

সোমবারের মিছিলে পুলিশ যখন ব্যারিকেড তৈরি করে, প্রতিবাদকারীরা সেগুলি তুলে মাথায় করে নিয়ে যেতে শুরু করেন। পুলিশ জলকামান চালালে, সেই 'বৃষ্টি'-তেই নাচতে শুরু করেন পড়ুয়ারা। কেউ কেউ আবার জলেই স্নান করে নেন।

প্রতিবাদকারীদের কাউকে কাউকে পুলিশকে বলতে শোনা যায়, "আজ এত গরম, আমাদের এত কম জল দিচ্ছেন কেন? জল বাঁচানোর চেষ্টা করছেন নাকি?"

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নারী পুলিশকর্মীও প্রতিবাদকারীদের রসিকতা দেখে হাসি চাপতে পারেননি।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তারা বিবিসিকে জানান, তাদের ছেলেমেয়েরাও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং এই মিছিলে রয়েছেন। হেসে তারা বলেন, "আমাদের ছেলেমেয়েরা বলে এসেছে, মিছিলে যেন ওদের মারধর না করি! আমরা এখানে পুলিশকর্মী, আর বাড়িতে মা। দুটো ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন।"

২৬ বছর বয়সি আয়ুষা আনুষা এবং তার বোনও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভিড় যখন বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের কাছে বেকার থাকার যন্ত্রণা মানে একই সঙ্গে তাড়াতাড়ি এবং অনিচ্ছায় বিয়ে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও।

মিজ. আনুষা বলছেন, "প্রথমদিকে আমাদের পরিবার আমাদের খুব সমর্থন করে। কিন্তু কতদিন? মেয়েদের হাতে তো বেশি সময় থাকে না। কয়েক বছর হয়ে গেলে মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। বিয়ে করতে দেরি হলে সমাজের কটাক্ষও শুনতে হয়।"

"পুরুষ চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও আমাদের খারাপ লাগে। কতজনের বেকারত্বের কারণে বিয়ে হচ্ছে না। এদিকে ৩৫-৩৬ বছর বয়স হয়ে গেছে। বছরের পর বছর পরীক্ষা দিচ্ছেন, আর বার বার দুর্নীতি হচ্ছে। এই কারণে ঝাড়খণ্ডের শিক্ষিত কিন্তু বেকার যুবক যুবতীদের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। আমরা কর্মক্ষেত্রে ঢুকতেই পারছি না।"

রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো

ছবির উৎস, Debalin Roy/BBC

ছবির ক্যাপশান, অনশনে থেকে এখন হাসপাতালে ভর্তি রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো

গান আর খাবার নিয়ে পাশে দাঁড়ান শুভাকাঙ্ক্ষীরা

ঝাড়খণ্ডের ছাত্রসমাজের দাবিতে অনশন শুরু করেছিলেন মোট পাঁচজন। রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে ঢুকলে আন্দোলনকারীদের দুটি শিবির চোখে পড়ে। গেট দিয়ে ঢুকেই প্রথমে দেখা যায় দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর নেতৃত্বে 'ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার' মঞ্চ।

মি. মাহাতো ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাঁচি কেন্দ্রের একজন প্রার্থী ছিলেন। গত দোসরা অগাস্ট থেকে তিনি অনশনে রয়েছেন।

মি. মাহাতোর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় সোমবার বিধানসভা ঘেরাওয়ের পরপরই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢুকে আরও কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে 'জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ'। সেখানে রয়েছেন চার জন আন্দোলনকারী, যাদের কোনও বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তাদের শিবিরে কোনও রাজনৈতিক পতাকা দেখা যায়নি।

দুপুর গড়াতেই এই শিবিরের চারপাশে লাইন পড়ে যায়। সকাল থেকে স্লোগান দিতে দিতে, আন্দোলন করতে করতে ক্লান্ত বিক্ষোভকারীরা এবার দুপুরের খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ান। প্রতিদিনই কোনও না কোনও শুভাকাঙ্ক্ষী বিক্ষোভকারীদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নেন।

মঙ্গলবার সেই দায়িত্ব নিয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা। তারা নিয়ে এসেছিলেন সোয়াবিন, ভাত, ডাল এবং ভাজা।

তাদের বক্তব্য, তরুণদের পাশে থাকা তাদের সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য, সবল শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করা হোক, বা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা।

এর পাশেই দেখা যায়, ১৮ বছর বয়সি দুই তরুণী নিজেদের ব্যাগ থেকে খাবারের প্যাকেট বের করছেন। বিবিসিকে তারা জানান, বিক্ষোভকারীদের খাবার দেওয়ার জন্য তাদের বাবা-মা তাদের কিছু টাকা দিয়েছেন।

তাদের একজন, প্রিয়া ভৎস, বলেন, "আমরা দোকান থেকে সিঙ্গারা আর কচুরি কিনে এনেছি। আমি এখন কলেজে পড়ি, আমিও কোনো এক সময় চাকরির খুঁজবো। ওরা যা করছেন, সেটা আমার ভবিষ্যতের জন্যও। আমি যতটুকু পারলাম, সেটুকুই করছি। আজ আমি ওদের খাবার দিতে আসতে পারি কি না, বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ওরাও খুব খুশি মনে সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন।"

স্লোগানের সঙ্গে এখানে চলছে গানও। জেপিএসসি-জেএসসি রিফর্মস মঞ্চের শিবিরের একটি কোণে বসে আছে একটি আদিবাসী লোকগানের দল। তাদেরও সমর্থন এই আন্দোলনরত পড়ুয়াদের প্রতি। তাদের সাহায্যের ধরন? গান গেয়ে পড়ুয়াদের মনোবল ধরে রাখা।

দলের সদস্য রামচন্দ্র রাম বিবিসিকে বলেন, "আমরা লোকশিল্পী, নাগপুরি ধারায় গান করি। আজ আমরা এখানে এসেছি গান, ঢোল আর বাঁশির মাধ্যমে আমাদের ছেলেমেয়েদের মানসিক শক্তি বাড়াতে। আমাদের দেশাত্মবোধক গান আছে, আমাদের শহিদদের নিয়ে গানও আছে।"

এই মঞ্চে অনশনকারীদের একজন উম্মে হাবিবা। মঙ্গলবার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই বিবিসিকে তিনি বলেন, "আমি একজন কৃষকের মেয়ে। মন্ত্রীদের ছেলেমেয়েদের মতো আমাদের বিদেশে পড়াশুনা করার ক্ষমতা নেই। আমাদের একটিমাত্র স্বপ্ন, আমরা একটি চাকরি পাব, তাতে আমাদের মা বাবার মুখ উজ্জ্বল হবে, আর আমি মাথা উঁচু করে সসম্মানে বাঁচতে পারব।"

তিনি বলছেন, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তার ভাইরা দিনমজুরির কাজ করেন।

তার কথায়, ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। কেবল তার পরিবার নয়, পুরো গ্রাম তার সাফল্যের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তার অভিযোগ, প্রত্যেকটি পরীক্ষায় কোনও না কোনও দুর্নীতির কারণে তার মতো মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পিছিয়ে পড়ছেন।

"আমরাই সেই তরুণ প্রজন্ম যারা ঝাড়খণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং সমৃদ্ধ করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম। যারা একসময় ঝাড়খণ্ডের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করেছিলেন, আমি নিশ্চিত, আজকের তরুণদের এই অবস্থা দেখে তাদের মনে গভীর আঘাত লাগত।"