পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে কী অর্জন করতে চায় বিএনপি সরকার

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যে 'টানাপোড়েন' লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, এই সফরের মাধ্যমে সেটির অবসান ঘটিয়ে দু'দেশের সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করতে চায় ঢাকা।

একইসঙ্গে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতা মাথায় রাখে, সেই বার্তাও দিতে চায় বিএনপি সরকার।

"হাসিনার আর ভারতের সম্পর্ক তো আর হবে না। হাসিনা তো বাংলাদেশে নন এক্সিসটেন্ট, রাজনৈতিকভাবে মরে গেছে আজকে প্রায় অনেকদিন হয়ে গেছে। হাসিনা আর আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে কিচ্ছু নাই। সো, এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া," সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

মি. কবির নিজেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে দিল্লিতে যাচ্ছেন।

প্রায় ৪৮ ঘণ্টার সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।

সেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দু'দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, ভিসা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নসহ আরও বেশকিছু বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দু'দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।

ভারত সফর শেষে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে একই ফ্লাইটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মরিশাস যাওয়ারও কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে ভারত ও বাংলাদেশের 'পরস্পরকে বোঝার সফর' বলে বর্ণনা করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এর মাধ্যমে আগামীতে দু'দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাতের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা।

"বিশেষ করে যেহেতু নতুন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে, সেই জায়গা থেকে স্বাভাবিকভাবেই তার ভারত সফর নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর
ছবির ক্যাপশান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের

কার কার সঙ্গে বৈঠক?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনে'র আয়োজনে আগামী ১১ই এপ্রিল মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে 'ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স' অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

দু'দিন ব্যাপী চলা এই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

পোর্ট লুইসে যাওয়ার আগে তিনি ৪৮ ঘণ্টার জন্য ভারতে অবস্থান করবেন।

"সেই হিসেবে এই সফরকে একটা ট্রানজিট সফরও বলা যেতে পারে," বলছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. রহমান মঙ্গলবার বিকেলে ভারতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন।

দিল্লিতে পৌঁছানোর পর এদিন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

পরের দিন বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে মি. রহমানের।

সফরকালে মোদি সরকারের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গেও মি. রহমানের আলাদা একটি বৈঠক হতে পারে, তবে সেটি এখনও নিশ্চিত নয় বলে জানতে পেরেছে বিবিসি।

একের পর এক এসব বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার সকালে খলিলুর রহমান পোর্ট লুইসের উদ্দেশ‍্যে দিল্লি ত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে একই বিমানে চেপে মরিশাসে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।

ফলে এয়ার মরিশাসের ওই বাণিজ্যিক বিমানে একটানা সাত-আট ঘণ্টার ওই দীর্ঘ সফরেও দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে একান্তে কথাবার্তা বলার বিস্তর সুযোগ থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির

'মন খুলে' আলোচনা চায় ঢাকা

বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মাস দেড়েকের মাথায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফরকে দু'দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে 'টানাপোড়েন ও দূরত্ব' তৈরি হয়েছে, সেটি কমিয়ে আনার জন্য 'মন খুলে' আলোচনা করতে চায় ঢাকা।

"আমরা এটা যত ওপেন এবং ক্লিয়ারলি এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ থাকবে, তত সাম অব দি চ্যালেঞ্জিং ইস্যুস ইউ মে বি অ্যাবল টু রিসলভ," সাংবাদিকদের বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

তিনি আরও বলেন, "ফিউচারে আমরা কীভাবে কোলাবোরেট করতে পারি। পিপল টু পিপল সম্পর্ক করতে পারি। যাতে ইউ ডোন্ট কমিট দি মিসটেক অব দি পাস্ট, হোয়্যার ইট ইজ সোললি সম্পর্কটা ভারতের যাতে কোনো ব্যক্তির সাথে না হয়ে যায়... কীভাবে আগামীতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কিছু কিক স্টার্ট করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা হবে।"

বাংলাদেশ বা ভারত- কোনোপক্ষ থেকেই এখনও সফরে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

তবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে অতীতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক অনেক ইস্যুও আলোচনায় থাকবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

"ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু পরিমাণ ডিজেল কিনেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সামনে ভারত আরও কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সেটি এই বৈঠকের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে আমার ধারণা," বলছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।

ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী
ছবির ক্যাপশান, ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের

জ্বালানির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের আলোচনায় ভিসা ইস্যুও বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

"অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের অবনতিকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ ভিসা প্রদান সীমিত করেছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ভিসার ওপর থেকে বাধা-নিষেধ তুলে নিলেও ভারত এখনও পুরোদমে ভিসা দেওয়া শুরু করেনি। কাজেই সেটি আলোচনায় জায়গা পেতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে।

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তিটি নবায়ন বা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে এবারের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অমীমাংসিত অন্যান্য ইস্যুর মধ্যে সীমান্ত হত্যা বন্ধের ব্যাপারটি বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এছাড়া বিভিন্ন কানেক্টিভিটি প্রকল্পর অগ্রগতি এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সুবিধাগুলো পুনর্বহাল করার ব্যাপারেও এই সফরে কথাবার্তা হবে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

তারেক রহমানের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
ছবির ক্যাপশান, সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন

সম্পর্কের গতিপথ পাল্টাচ্ছে?

অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনগুলোতে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মুখে পড়েছিল ভারত সরকার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক নেতাকে ভারতের মাটিতে থাকতে দেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দু'দেশের সম্পর্কে 'টানাপোড়েন' তৈরি হয়।

একপর্যায়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের পর তারা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিবে।

এর মধ্যে নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে বিএনপি'র তৎকালীন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মারা গেলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর।

এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়লাভ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।

এসব ঘটনায় দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

"বিশেষ করে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশ- উভয় পক্ষ থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটা প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর সেটিরই ধারাবাহিকতা বলা যায়। টানাপোড়েন কাটিয়ে দু'দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়," বলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপির প্রাক্তন এমপি এম জে আকবরের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা যে 'গতিপথ পাল্টানো' দরকার, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই সেটি উপলব্ধি করছে।

"আমি বলব, দু'পক্ষের মধ্যেই এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে যে, মাঝের বেশ কিছুদিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিরাট ডিসরাপশন লক্ষ্য করা গেছে, যা কারোরই উপকারে আসেনি," বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষকে বলেন মি. আকবর।

"তবে সুখবর হল, দু'পক্ষই এখন অনুধাবন করেছে, এটা পাল্টানো দরকার," যোগ করেন ভারতের সাবেক এই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি।