আমরা গুপ্তচরবৃত্তি করি না, বলছে চীনা নজরদারি প্রযুক্তি কোম্পানি হিকভিশন

    • Author, টেসা ওয়াং, পল এডামস এবং পিটার হসকিন্স
    • Role, বিবিসি নিউজ
  • Published

চীনের বৃহৎ এক নজরদারি প্রযুক্তি কোম্পানি হিকভিশন চীনা গুপ্তচরবৃত্তিতে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে এ ধরণের প্রযুক্তি অন্য নামে বিক্রির মাধ্যমে হিকভিশন চীনা গুপ্তচরবৃত্তিতে সহায়তা করে বলে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া পেন্টাগনের এক দলিলে অভিযোগ করা হয়।

বিবিসির প্রশ্নের উত্তরে হিকভিশন এরকম কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে তারা চীনা ইন্টেলিজেন্স সংস্থার সঙ্গে কাজ করে কীনা, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

হিকভিশন বিশ্বের নজরদারি প্রযুক্তির ক্যামেরার সবচেয়ে বড় কোম্পানি এবং তাদের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

হিকভিশন তাদের পণ্য বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রির জন্য দেয়, যারা আবার এগুলো বিভিন্ন দেশের সরকার এবং কোম্পানির কাছে বিক্রি করে।

এই বিক্রেতারা অনেক সময় তাদের পণ্যের ‘রি-ব্রান্ডিং’ করে, যে প্রক্রিয়াটিকে ‘হোয়াইট লেবেলিং’ বলে বর্ণনা করা হয়।

যদিও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই ‘হোয়াইট লেবেলিং’ বেশ প্রচলিত, তারপরও হিকভিশনের এ ধরণের কাজ তীব্র মনোযোগের কেন্দ্রে আসে চীনা রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং উইঘুর মুসলিমদের ওপর নজরদারিতে তাদের ক্যামেরা ব্যবহারের কারণে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এর আগে হিকভিশনের পণ্য তাদের সরকারি সাপ্লাই চেইনে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে সরকার এক্ষেত্রে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং পুরো দেশজুড়েই হিকভিশনের পণ্য নিষিদ্ধ করে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ফাঁস হওয়া এক দলিলে বিবিসি দেখতে পেয়েছে, হিকভিশনকে ‘চীনা ইন্টেলিজেন্স সংস্থার সঙ্গে যুক্ত’ একটি প্রতিষ্ঠান বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, হিকভিশন যাদের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করে, তাদেরকে ব্যবহার করে ভিন্ন পরিচয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহকারীদের কাছে তাদের প্রযুক্তি বিক্রি করছে।

ফাঁস হওয়া দলিলে আরও বলা হয়, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতরে বেইজিং এর জন্য তথ্য পাচারের নানা ‘বাহক’ তৈরি হচ্ছে।

এতে আরও দাবি করা হয়, গত জানুয়ারিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী ক্রেতাদের কাছে হিকভিশনের প্রযুক্তি ভিন্ন নামে পাওয়া যাচ্ছিল।

বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে হিকভিশনের এক মুখপাত্র জানান, “তারা ব্যবসা চালানোর জন্য আইন ভঙ্গ করেনি, এখনো করছে না বা ভবিষ্যতেও করবে না।

হিকভিশন বলেছে, তাদের প্রযুক্তি ‘হোয়াইট লেবেলিং’ বা ভিন্ন নামে বা ব্রান্ডে বিক্রির বিরুদ্ধে তাদের সুস্পষ্ট নীতি এবং অবস্থান অনেকদিন ধরেই কার্যকর আছে।

কোম্পানিটি বলছে, তারা বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে কাজ করছে যাতে তাদের পণ্য সরকারী সাপ্লাই চেইনের বাইরে থাকে, এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তাদের ক্যামেরা যেন কখনোই নিয়ম ভেঙ্গে বিক্রি করা না হয়।

তবে চীনা গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে হিকভিশনের সম্পর্ক আছে কিনা, এবং গ্রাহকদের তথ্য তারা এই গুপ্তচর সংস্থার কাছে পাচার করে কিনা, সে প্রশ্নের কোন উত্তর এই মুখপাত্র দেননি।

হিকভিশন এর আগে বহুবার বলেছে, তারা কোন সরকারেরই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। এর আগে তারা এমন কথাও বলেছিল, তারা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো তথ্য পায় না, কাজেই এসব তথ্য তারা তৃতীয় কোন পক্ষের কাছে পাঠাতে পারে না।

হিকভিশনের সবচেয়ে বড় অংশীদার হচ্ছে রাষ্ট্রীয়-মালিকানাধীন ‘চায়না ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ কর্পোরেশন’।

চীন এখন পুরো দেশজুড়ে নজরদারির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ফলে সরকারের কাছে এধরণের প্রযুক্তি সরবরাহের বহু শত কোটি ডলারের কাজ পেয়েছে হিকভিশন। এরমধ্যে শিনজিয়াং এর মতো এলাকাও আছে, যেখানে চীনা সরকার উইঘুরদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সমালোচকরা বলছেন, সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীন যে নিপীড়ন চালাচ্ছে, হিকভিশন তাতে সহায়তা করেছে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে সম্প্রতি হিকভিশনের বিরুদ্ধে সন্দেহ বেড়েছে, এবং এসব দেশে হিকভিশনের প্রযুক্তি যাতে ব্যবহৃত হতে না পারে, সেই চেষ্টা চলছে।

যুক্তরাজ্যে গত নভেম্বরে সরকারি দফতরগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়, স্পর্শকাতর স্থানে যেন চীনা কোম্পানির নজরদারি ক্যামেরা বসানো না হয়। যেখানে এরকম ক্যামেরা এরই মধ্যে বসানো হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নিতে বলা হয়।

অস্ট্রেলিয়ান সরকারও ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, তারা প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলো হতে চীনা নির্মিত নজরদারি ক্যামেরা সরিয়ে নেবে।