কিশোরী ধর্ষণে মূল অভিযুক্ত 'এনকাউন্টারে' নিহত, এখনো ক্ষোভে ফুঁসছে বারুইপুর

সোমবার দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব স্থানীয়রা

ছবির উৎস, Archishman Saha/BBC

ছবির ক্যাপশান, সোমবার দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব স্থানীয়রা
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত ও প্রত্যূষ রায়
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ১০ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় পুলিশের 'এনকাউন্টারে' নিহত হয়েছেন অন্যতম একজন অভিযুক্ত। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ওই অভিযুক্তের নাম প্রভাস মণ্ডল, যাকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল পরিবারের তরফে।

গত শনিবার চৌঠা জুলাই কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি অঞ্চলের বারুইপুর থানার সূর্যপুরে একজন কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ আসে। স্কুলের ছাত্রী, ১১-১২ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে পাঁচই জুলাই ওই অঞ্চলের পুকুর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, মঙ্গলবার মধ্যরাতে অন্যতম ওই অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে ওই পুকুরের কাছেই তদন্তের স্বার্থে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে পৌঁছান পুলিশ কর্তারা। পুলিশের অভিযোগ, তখন পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল অভিযুক্ত।

পুলিশ জানিয়েছে, তখনই তারা গুলি চালায়। অভিযুক্তকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

"আমার ছেলের মৃতদেহ আমি দেখতে চাইনা, ওর শেষকৃত্যও করব না আমরা।" ঘটনা শোনার পরে জানিয়েছেন মৃত অভিযুক্তের মা। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, "আমার ছেলে দোষ করলে ওর এই শাস্তিই কাম্য।"

ধর্ষণ করে খুনের ওই ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই পুলিশি গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল। প্রাথমিক ময়নতদন্তের যে রিপোর্ট, সেই রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে ওই কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে জলে ডুবে।

স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, যে সময়ে পুলিশের কাছে যাওয়া হয়, তখনই পুলিশ যদি তৎপর হতো, তাহলে হয়তো সেই কিশোরীটিকে বাঁচানো যেত।

এক স্থানীয় বাসিন্দা সোমবার জানিয়েছেন, "রাতে প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা থানায় যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ গুরুত্ব দিচ্ছিল না। রোববার সকালে আমরা স্থানীয়দের থেকে খবর পেলাম। পরে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীকে আমরাই ধরে ফেলি।"

ওই স্থানীয় বাসিন্দা যাকে 'দোষী' বলে উল্লেখ করছিলেন, তিনিই হলেন প্রভাস মণ্ডল। পুলিশের গুলিতে তারই মৃত্যু হয়েছে আটই জুলাই মধ্যরাত্রে। তার বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।

বারুইপুরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, বারুইপুরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান শুভেন্দু অধিকারী

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাতই জুলাই (মঙ্গলবার) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিহত ও ধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে তিনি রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশককে এই তদন্তের নিষ্পত্তি করতে ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি নিজেই।

মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের হাতে 'এনকাউন্টারে' নিহত হলেন।

ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআর-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রঞ্জিত শূর এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, "এই ঘটনা সন্দেহজনক। কারণ, এই ব্যক্তি ছিলেন সম্পূর্ণ ঘটনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। এই সাক্ষীকে সরিয়ে দিলে পুলিশ নিজের মতো কেস সাজাতে পারবে ও নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পারবে।"

তিনি বলেন, "ভারতের বহু রাজ্যে এনকাউন্টারের গল্প এখন একই, পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর সময়ে গুলি।"

বস্তুত সাম্প্রতিক অতীতে ভারতে বহু এমন এনকন্টারের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশের দাবি ছিল পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পালানোর সময়ে অভিযুক্তের দিকে গুলি চালায় পুলিশ এবং তার ফলে মৃত্যু হয় সেই অভিযুক্তের।

প্রথম এই ধরনের ঘটনা সামনে এসেছিল ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদে।

এক পশুচিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্তকে প্রায় মধ্যরাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্ত বলে অভিযোগ করেছিল তেলেঙ্গানা রাজ্যের পুলিশ। তখনই গুলি চালানো হয়।

ওই ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন এই বিচারবহির্ভূত হত্যার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বলেছিল যে, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমেই অপরাধীর শাস্তি হওয়া কাম্য।

ভারতের সবর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কার্যকালে ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে বলে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে উত্তর প্রদেশ পুলিশ। এই এনকাউন্টারগুলিতে মারা গিয়েছেন ২৮৯ জন।

এর মধ্যে অনেকগুলিই ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর সময়ে ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে বারুইপুর

ছবির উৎস, PTI

ছবির ক্যাপশান, কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে বারুইপুর

এর আগে বারুইপুরে যা দেখেছিলেন বিবিসি সংবাদদাতা

"প্রথমে ভেবেছিলাম আশেপাশে কোথাও ঘুরছে। এই (বাড়ি ফিরে) আসবে, এই আসবে। তখনো বুঝিনি… বস্তার মধ্যে থেকে ওকে পাওয়া যাবে," কথাগুলো বলতে বলতে কিছুটা থামলেন পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে খুন হওয়া কিশোরীর পরিবারের এক সদস্য। খুনের আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিলো বলে ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ হওয়া ওই কিশোরীর বস্তাবন্দি দেহ রোববার সকালে উদ্ধার হয় কাছের এক জলাশয় থেকে। ক্লাস সিক্সে পড়তো সে।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুর থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই এলাকা। রোববার থেকে ক্ষোভে ফুঁসছে সূর্যপুর। তার আঁচ এলাকায় ঢোকার বেশ আগে থেকে পাওয়া যাচ্ছিল।

মঙ্গলবারও সেই ক্ষোভের আঁচ কমেনি। যদিও গত দুদিনে মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় অনেক নেতা নেত্রীই ওই কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন সেখানে গিয়ে। তবুও এলাকাবাসীর মধ্যে প্রবল ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।

এরই মধ্যে নানা মহল থেকে ওই কিশোরী এবং গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের ধর্মীয় পরিচয় সামনে এনেও প্রচার চলছে সামাজিক মাধ্যমে। খুন হওয়া ১১-১২ বছরের ওই কিশোরী মুসলিম এবং যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে ওই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে, তারা হিন্দু।

আবার এই অভিযোগও এসেছে যে ঘটনার পরেই একজন অভিযুক্তকে এলাকাবাসী আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও স্থানীয় একজন বিজেপি নেতার কথায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই বিজেপি নেতা অবশ্য সংবাদ মাধ্যমের সামনে এরকম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সোমবার ধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরীর বাড়ির সামনের রাস্তার ছবি

ছবির উৎস, Archishman Saha/BBC

ছবির ক্যাপশান, সোমবার ধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরীর বাড়ির সামনের রাস্তার ছবি

এলাকায় গিয়ে যা দেখা গেলো

খুন ও ধর্ষণের শিকার কিশোরীর বাড়িতে ঢোকার মুখে গাড়ি চলাচল করার জন্য যে বড় রাস্তা রয়েছে সেখানে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা আছে।

সোমবার সকালে যে সময় আমরা সূর্যপুর গিয়ে পৌঁছেছিলাম সে সময় রাস্তায় মানুষের জমায়েত ছিল লক্ষ্য করার মতো। রাস্তা থেকে শুরু হয়েছিল পুরুষ-নারী নির্বিশেষে মানুষের জটলা। এরা মূলত স্থানীয় বাসিন্দা, যাদের মধ্যে জ্বলতে থাকা ক্ষোভের আঁচ পেতে সময় লাগে না।

তাদেরই একজন রশিদা বিবি। গত কয়েক বছরে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "একের পর এক জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে… কোথায় বন্ধ হচ্ছে?"

রোববার সকালে ওই কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর থেকেই বারে বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এই এলাকা। রাস্তায় তার নিথর দেহ রেখে বিক্ষোভ করেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে রাস্তা অবরোধ করা হয়, নিকটবর্তী রেলওয়ে ট্র্যাক অবরোধ করা হয়, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়।

খুন ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এক স্থানীয় এক অটোচালককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে।

ওই ঘটনায় পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলার সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন নির্যাতনের শিকার হওয়া কিশোরীর কাকা

ছবির উৎস, Archishman Saha/BBC

ছবির ক্যাপশান, বিবিসি বাংলার সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন নির্যাতনের শিকার হওয়া কিশোরীর কাকা

'মেয়েটা বাড়ি ফিরল না'

বন্ধুর জন্মদিনে উপহার কিনতে বেরিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেনি ক্লাস সিক্সের ওই শিক্ষার্থী। সেই আক্ষেপ ভুলতে পারছেন না কেউই।

বাড়ির একতলার একটা ঘরে স্থবির হয়ে বসে ছিলেন তার বাবা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, "কী বলব… মেয়েটা বাড়ি ফিরল না।"

তার কাকার কথায়, "বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ বন্ধুর জন্মদিনের জন্য গিফট কিনতে গিয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম আশেপাশেই কোথাও বাজারে ঘুরছে। সূর্যপুর হাটের সব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গল্প করতো, খুব মিশুক মেয়ে ছিল। পড়াশোনার পর অবসর সময়ে এখানেই ঘুরত। এখানে তো মাঠ নেই। এই রাস্তা, সূর্যপুর হাট এটাই ওর কাছে খেলার মাঠ ছিল।"

ক্রমে সন্ধ্যে বাড়তে থাকে। তার কাকা বলেছেন, "ভেবেছিলাম এই ফিরে আসবে…এই ফিরে আসবে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বাড়তে থাকে।"

এরপর আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তারা। সূর্যপুর হাটের দোকানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেন। পুলিশ ফাঁড়িতেও ঘটনার বিষয়ে জানানো হয়।

ওই কিশোরীর কাকার কথায়, "আমরা রাতেই মিসিং ডায়রি করি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আমরা একজন অভিযুক্তর খোঁজ পাই। প্রথমে ডিনাই (অস্বীকার) করলেও পরে সে আমাদের কয়েকজনের কথা বলে। পুলিশও আমাদের সঙ্গে যায়।"

ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ওই ছাত্রীর দেহ উদ্ধার করা হয় কাছের এক জলাশয় থেকে।

বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলার সময় তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কী অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল নাবালিকার দেহ।

"ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ওর ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। একজনের বেশি লোক ছিল। ঠোঁটে, মাথায়, শরীরের নিচের দিকে আঘাতের চিহ্ন ছিল," কথাগুলো বলতে বলতে একটু থামলেন নিহত ওই কিশোরীর কাকা।

তারপর তিনি বলেন, "অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তারপর কী করে জানি না তাকে শান্তনু মণ্ডল বলে একজন ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। সে নিজেকে বিজেপির মণ্ডল সভাপতি বলে। জানি না সে কী পদে আছে।"

যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ওই কিশোরীকে খুঁজে বের করার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন শান্তনু মণ্ডল। পরে অভিযুক্তকে মারধর না করে, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও না কি তিনি বলেছিলেন।

তার বিরুদ্ধেই এক অভিযুক্তকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

"সবাই মিলে দোষীদের খুঁজে এনে দিল, তারপর বিজেপির একজন পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এটা কী করে হতে পারে?" প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা আনসার মোল্লা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এরপর পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়।

ওই কিশোরীর কাকা বলেন, "পরে শুনলাম এই নিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে নাকি ভাঙচুর করা হয়, পুলিশকে মারধর করা হয়। সবই পরে শুনেছি। তখন আমরা এখানে বাচ্চার দেহ নিয়ে বসে ছিলাম। বেলার দিকে আমরা রাস্তায় আন্দোলন শুরু করি।"

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় এক অটোচালককে মারধর করা হয়। গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ।

সে প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে নিহত ছাত্রীটির কাকা বলেছেন, "দেখুন এই বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। আমরা আন্দোলন করছিলাম রাস্তায়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বহু মানুষ জড়ো হয়েছিল। সেই সময় কে কী করেছে জানি না।"

"যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি, কিন্তু আমরা সত্যিই কিছু জানি না।"

গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তির মা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ও কিছু করেনি। তবুও ওরা মেরে ফেলল। যখন লোকজন আমাদের বাড়িতে আসে, তখন ওর বাবা বলেছিল, ওকে মেরো না। যদি দোষী হয়, আমি নিজের হাতে তোমাদের কাছে তুলে দেব। কেউ শোনেনি।"

ঘটনার পর থেকে বারে বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সূর্যপুর এলাকা

ছবির উৎস, Archsihman Saha/BBC

ছবির ক্যাপশান, ঘটনার পর থেকে বারে বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সূর্যপুর এলাকা

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন পরিজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই।

এলাকারই এক বাসিন্দা আনসার মোল্লা বলেন, "রাতেই পুলিশ চেষ্টা করলে হয়তো মেয়েটাকে বাঁচানো যেত। পরদিন সকালে যখন আমরাই অভিযুক্তদের পুলিশের কাছে তুলে দিই তারপরেও ওদের যেতে দিল।"

রোববার সকালে সূর্যপুর হাটে বিক্ষোভ চলাকালীনও পুলিশে খবর দেওয়ার পর বিলম্ব হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তা মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, "পুলিশের দিক থেকে যদি কোনো ডিলে (বিলম্ব) হয়ে থাকে বা কিছু থাকে তা খতিয়ে দেখা হবে।"

অন্যদিকে, যারা পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছিল এবং রেল লাইন অবরোধের সময় লাইনের ক্ষতি করেছিল বলে অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "(নিহতের) বাবা যা যা চেয়েছেন, সব করব। ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের সুপারিশ করা হবে।"

পাশাপাশি গণপিটুনি, রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক যোগের কথা উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, "গণপিটুনির নেপথ্যে সাম্প্রদায়িক অ্যাঙ্গল ছিল। রেললাইন যেভাবে উপড়ানো হয়েছে, তাতে অতীত মনে পড়ছে। ২০১৯ সালে সিএএ বিরোধী আন্দোলন বা কিছু দিন আগে ওয়াকফ আইন বিরোধী আন্দোলনের কথা মনে পড়ছে।"

পাশাপাশি, তার আরো অভিযোগ, রোববারের বিক্ষোভের সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলের 'ইন্ধন' ছিল।

বিরোধীদের বিধানসভা ভোটে হেরে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এনে শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, "'বাকি যারা অতৃপ্ত আত্মা রয়েছেন, ভোটে হেরে যারা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন…এখনো ঘরে রয়েছেন, তারা যে কাণ্ড করেছেন, তাদেরও ভুগতে হবে।"

তৃণমূলের পক্ষ থেকে একটা ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করা হয়েছে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে বিজেপি। অন্যদিকে, বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার সাংবাদিকদের বলেছেন, "এখানে দলীয় সরকার চলছে না। বারুইপুরে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। কাউকে রেয়াত করা হবে না।"

স্থানীয় বাসিন্দা সুজাতা নস্কর

ছবির উৎস, Archishman Saha/BBC

ছবির ক্যাপশান, স্থানীয় বাসিন্দা সুজাতা নস্কর জানিয়েছেন, এই এলাকায় বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে

'এখানে হিন্দু-মুসলমান কোথায়?'

'সাম্প্রদায়িকতার' অভিযোগ থেকে বাঁচার চেষ্টা দেখা গেছে সূর্যপুরের অনেকের মধ্যে, একইসঙ্গে রাজনৈতিক রঙ থেকেও।

সোমবার বেলা থেকেই জমায়েতকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজে হাত দিয়েছেন স্থানীয়দের একাংশ। জমায়েতের উদ্দেশ্যে রাস্তায় সুষ্ঠুভাবে যান চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা যেমন তারা বলেছেন, তেমনই 'রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িক রঙ' থেকে দূরে থেকে বিচারের দাবিতে অনড় থাকার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাদের।

রোববার মমতা ব্যানার্জীর পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, তাকে না কি বারুপুরের নির্যাতনের শিকার মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত রাখার 'চেষ্টা চলছে।'

সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপি মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে পাল্টা বলতে শোনা গিয়েছে, "গত ১৫ বছরে প্রতিদিন, প্রতি মিনিটে যখন বাংলার মহিলাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, তখন তিনি উন্নাও-তে ওনার টিম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মণিপুরে টিম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার গ্রামে গ্রামে যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তখন তিনি একটা লোককেও পাঠাননি।"

"আপনি সোশ্যাল সার্ভিস করতে চান ঠিক আছে, কিন্তু ১৫ বছর ধরে চলে আসা ভোটব্যাংকের রাজনীতি যদি করতে চান তাহলে তা হবে না।"

নিহত মেয়েটি মুসলিম পরিবারের। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যখন অব্যাহত তখন হামিদ মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা বলেছেন, "এখানে হিন্দু মুসলমান কোথায়? সূর্যপুর শান্ত এলাকা। এমন একটা ঘটনা কীভাবে ঘটল সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না। এখানে মাদ্রাসা আছে আর কিছুটা দূরে মন্দির আছে এখানে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নেই।"

"একটা জঘন্য অপরাধ ঘটেছে। আমরা দোষীদের ফাঁসি চাই চাই। এখানে হিন্দু-মুসলমান, রাজনীতি- কিছুর জায়গা নেই।"

এক সময় সুজাতা নস্করের বাড়ির কাছেই থাকত নিহতের পরিবার। ঘটনার কথা জানতে পেরেই তিনি ছুটে এসেছেন সন্তানহারা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

এই গৃহবধূ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমি ৩০ বছর হলো এখানে থাকি। কোনোদিনই আমরা হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ করিনি। এত অপ্রীতিকর ঘটনা যে গা শিউড়ে উঠছে। একটুও বুক কাঁপল না এদের?"

সোমবার-মঙ্গলবার মিলিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু যতবারই নেতারা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, ততবারই সেখানে উপস্থিত জটলার কাছ থেকে দু'টো কথা শোনা গিয়েছে।

প্রথম দাবিটা দোষীদের চরম শাস্তির, আর দ্বিতীয়টা 'সন্তর্পণে' রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রাখার।

এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে স্থানীয় এক যুবক বলেন, "নেতারা আসছেন ভালো কথা, কিন্তু কোনোভাবেই এখানে রাজনীতি ঢুকতে দেব না আমরা।"

মঙ্গলবার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিজেপির অগ্নিমিত্রা পাল ও লকেট চ্যাটার্জী

ছবির উৎস, WB/BJP

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিজেপির অগ্নিমিত্রা পাল ও লকেট চ্যাটার্জী

কেন এই ক্ষোভ?

বারুইপুরের ঘটনায় রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার পরও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের আঁচ স্পষ্ট।

কিন্তু কেন?

রশিদা বিবি নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "কোথায় বন্ধ হচ্ছে ধর্ষণ? মুখ্যমন্ত্রী বলছে বিচার হবে। কীসের বিচার? ফাঁসি দিক, ফাঁসি।"

ক্ষোভ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। এক স্থানীয় যুবক বলেন, "পুলিশ আরেকটু অ্যাক্টিভ হলে হয়তো এমনটা ঘটত না। তবে শুধু এই ঘটনা নয়, বেশিরভাগ কেসেই আমরা দেখেছি পুলিশ এমন করে।"

স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে ঘুরে ফিরে এসেছে সাম্প্রতিক ঘটনার প্রসঙ্গ। সূর্যপুর হাটের এক দোকানে অন্যান্যদের সঙ্গে বসে ছিলেন আনন্দ নস্কর। এলাকারই একটা দোকানে কাজ করেন তিনি। তার কথায়, "রোজই একটা না একটা কিছু ঘটছে। বাচ্চা মেয়েদেরও রেহাই দিচ্ছে না। আরজি করের যে ডাক্তারের ঘটনাতেও কিছু হলো কী?"

একই কথা শোনা গিয়েছে নিহতের পরিবারের সদস্যদের কথাতেও।

নিহত কিশোরীর কাকার কথায়, "দোষীদের শাস্তি হোক, নয়তো আমাদের মেয়ের মতো ঘটনা, আরজি করের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।"