আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কারাগারে 'জঙ্গি বন্দী'দের সাথে কেমন আচরণ করা হয়
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
শীত নিবারণে বাড়তি কম্বল এবং সাধারণ বন্দীদের মতো সুযোগ সুবিধা দাবি করে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কারাগারের ভেতরে বিক্ষোভ করেছেন জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে গ্রেফতার বন্দিরা।
কারা কর্তৃপক্ষ তাদের 'জঙ্গি বন্দী' হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
কারাগারের কয়েকজন কর্মকর্তার সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সকাল ১০টার দিকে বন্দী জঙ্গিরা কারাগারের ভেতরে বাড়তি কম্বল, স্বজনদের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে এক দিন সাক্ষাৎ ও ফোনে কথা বলা এবং কারাগারের ভেতরে সাধারণ বন্দীদের মতো চলাফেরার দাবি জানিয়েছে।
তবে সাধারণ বন্দীরা এ বিক্ষোভে অংশ নেয়নি।
কারা সূত্র বলছে, “বড় কোন বিক্ষোভ হয়নি। পাঁচ সাতজন জঙ্গি বন্দী দাবি দাওয়ার কথা জানিয়েছে। শনিবার সকালে নাস্তাও করেনি। পরে জেল সুপার তাদের সাথে দেখা করে বুঝিয়ে বললে বন্দীরা নাস্তা করেন। কোন বিশৃঙ্খলা হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।”
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত আইজি প্রিজন শেখ সুজা জানান, জেলে সব ধরনের বন্দীদের একসময় তিনটি কম্বল দেয়া হতো। একটি নীচে পাতার জন্য, একটি মাথার নীচে দিতে এবং আরেকটি গায়ে জড়াতে।
এখন প্রত্যেকের জন্য একটি বালিশ ও দুটি কম্বল বরাদ্দ করা হয়েছে।
এরপরও কোন বন্দীর বাড়তি কম্বলের প্রয়োজন হলে তারা বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানান।
তবে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাধারণ বন্দীদের মতো ঘোরাফেরার যে দাবি তারা জানিয়েছে তা কারাবিধি ও আইনের পরিপন্থী।
তাই এসব দাবি মানা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জঙ্গি বন্দীদের কেন আলাদা রাখা হয়?
কারা বিধি অনুযায়ী জঙ্গি বন্দীদের কারাগারের ভেতরে আলাদা ভবনের আলাদা সেলে রাখা হয়। অন্য সাধারণ কয়েদি বা হাজতিদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হয় না।
অন্য বন্দীদের মতো ইচ্ছামতো চলাচলের সুযোগ পান না তারা। খুব বেশি হলে তারা তাদের সেলের বারান্দা পর্যন্ত আসতে পারেন। এর বেশি নয়।
তাদের গতিবিধিও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়। কারাগারের ভেতরে জঙ্গি বন্দীরা সিসি ক্যামেরা এবং ওয়াচ টাওয়ারের আওতায় থাকেন। সেলের বাইরে থাকে বাড়তি কারারক্ষী।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিদিন সেলগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। ঘন ঘন তাদের কক্ষ তল্লাশি করা হয়।
এতো কড়াকড়ির কারণ হল কারা কর্তৃপক্ষ জঙ্গিদের ‘হাই-রিস্ক’ হিসেবে বিবেচনা করেন। যেখানে কিনা সাধারণ বন্দীদের ‘লো-রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে ডেপুটি জেল সুপার মফিজুল ইসলাম জানান, “এই জঙ্গি বন্দীদের মধ্যে অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নাহলে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত। যেহেতু হাই রিস্ক তাই তাদের আলাদা রাখা হয়"
"সাধারণ বন্দীদের সাথে মিশতে দিলে তারা সাধারণ বন্দীদের প্রভাবিত করতে পারে, সংগঠিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এজন্য কারাবিধি তাদেরকে সবার সাথে মেলামেশা বা ঘোরাফেরার অনুমোদন দেয়নি।” তিনি বলেন।
দেখা করা ও কথা বলার সীমাবদ্ধতা
কারা বিধি অনুযায়ী, জঙ্গি বন্দীদেরকে কারাগার থেকে তাদের স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেয়া হয় না।
তবে প্রতি মাসে একবার তারা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
সাক্ষাতের আগে বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাকে অবহিত করা হয় এবং সাক্ষাতের সময় তাদেরকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয় বলে জানান ডেপুটি জেল সুপার।
করোনা মহামারীর আগে সাক্ষাত ও কথা বলার বিধিতে কিছুটা শিথিলতা আনা হলেও গত নভেম্বরে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের দুজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী ছিনতাইয়ের ঘটনার পর বেশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
এখন জঙ্গি বন্দীরা মাসে একবার এবং সাধারণ বন্দীরা ১৫ দিনে একবার স্বজনদের সাথে দেখা করতে পারেন।
তবে এমনও অভিযোগ রয়েছে মোটা অংকের বিনিময়ে এবং দুর্নীতির সুযোগে এই জঙ্গি বন্দীরা সার্বক্ষণিক মোবাইল রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে যার সাথে ইচ্ছা সাক্ষাতও করতে পারেন।
পরিবহনে কড়াকড়ি
জঙ্গি বন্দীদের আদালতে হাজিরা, অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে নেওয়া, কিংবা এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের সময় আদালত, পুলিশ সদর দফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাড়তি কিছু নির্দেশনা রয়েছে।
জঙ্গি বন্দীদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পুলিশের সংখ্যা সাধারণ বন্দী স্থানান্তরের চেয়ে বেশি থাকে।
কারাগার থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত যতো থানা পড়বে সেখানকার পুলিশ ও গোয়েন্দাদের বিষয়টি জানানো হয়।
আইনানুযায়ী, কোনো জঙ্গি বন্দীর আদালতে হাজিরা থাকলে কারা কর্তৃপক্ষ আসামিকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে।
সাধারণত তাদেরকে প্রিজনভ্যানে বা বিশেষ গাড়িতে বহন করা হয়। সে সময় একজন আসামীর সঙ্গে তিনজন পুলিশ সদস্য বা ক্ষেত্র বিশেষে আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ থাকতে পারেন। গাড়ির আগে-পরে এসকর্ট রাখারও বিধান রয়েছে।
আগে এসব হাই রিস্ক আসামীদের ডান্ডাবেড়ি পরানোর নিয়ম থাকলেও ২০১৭ সালের ১৪ই মার্চ উচ্চ আদালত মানবিক কারণে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির না করার নির্দেশ দেয়।
এর পর থেকে আসামীদের নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি না থাকলে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয় না। শুধু হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর হাই রিস্ক আসামিদের আদালতে হাজির করার সময় ডান্ডাবেড়ি পরানোর ব্যবস্থা নিতে কারা সদর দপ্তরে প্রসিকিউশন পুলিশের প্রধান চিঠি দিয়েছিলেন।
এই আচরণ কতোটা মানবিক?
বন্দীরা যে ক্যাটাগরিতেই পরুক তাদের নূন্যতম সুবিধা ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।
তিনি জানান, শীতের মধ্যে বন্দীদের শীতের কষ্ট দেয়া কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে না। এজন্য তাদেরকে চাহিদা মতো শীতের কাপড়, নিরাপদ খাদ্য/পানি সময় মতো দেয়া জরুরি।
কারণ মানবাধিকারের দৃষ্টিকোন থেকে একজন ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে এমনভাবে রাখা যাবে না যা সাজার সমতূল্য।
তিনি বলেন, “একজন বন্দী যদি শাস্তিও পেয়ে যান, তারপরও জেলকোডে একজন কয়েদিকে যে সেবা দেয়ার কথা বলা রয়েছে, সেট তাকে পূর্ণ মাত্রায় দিতে হবে।”
পরিবারের সাথে যোগাযোগ এবং কারাগারের ভেতরে সীমিত পরিসরে হলেও তাদের বিচরণের অনুমোদন দেয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, 'হাই রিস্ক' আসামীদের রাখার জন্যই কাশিমপুর কারাগারটি আলাদাভাবে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তৈরি করা হয়েছে।
সেই কারাগারের ভেতরে আবার বিশেষ ব্যবস্থা রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
“কারাগার হল সংশোধন করে মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনার জায়গা। তাই বন্দীদের বিরুদ্ধে এমন কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না যা নিপীড়নমূলক হতে পারে। এই জেলখানা তৈরি হয়েছে 'হাই রিস্ক' আসামীদের জন্য। সেখানে আবার আলাদা ব্যবস্থা কেন?”
এই জঙ্গি বন্দীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে তাদের সাধারণ বন্দীদের সাথে মেলামেশা করতে দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান
"তাদেরকে কোনঠাসা করে, খাঁচায় বন্দী করে রাখলে তারা বরং বিচ্ছিন্নতায় ভুগবে যা তাদের বড় অপরাধী হয়ে উঠতে পারে,” তিনি বলেন।
এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা এবং চিন্তায় পরিবর্তন আনতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাহায্য নিয়ে ধীরে ধীরে সহিংস পথ থেকে সরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
সংশোধন হচ্ছে কি?
কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগের অধীনে রয়েছে ১৭টি।
দেশটির সব কারাগারে ৫৭৪ জন জঙ্গি বন্দী রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এই বন্দীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা আছে। কিছু মামলা এখনও বিচারাধীন।
বাংলাদেশের কারা অধিদফতরের অন্যতম লক্ষ্য হল কারাগারগুলোকে সংশোধনালয়ে রূপ দেয়া।
যেন কারাগার থেকে মুক্তির পর একজন বন্দী সমাজে পুনর্বাসিত হয়ে অন্য দশ জন মানুষের সাথে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
এজন্য সাধারণ সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে এবং তাদেরকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানো হয়।
এসব কাজের মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ড পরিচালনা, বন্দীদের পাহারা, কারা হাসপাতালের রাইটার, পত্র লেখক, রান্না, পানি সরবরাহ, ধোপা, বই বাঁধাই, নাপিত, সুইপার, উৎপাদন বিভাগের বিভিন্ন ট্রেড অর্থাৎ কাঠ, বেত, বাঁশ, তাঁত, মোড়া, সেলাই, কামার ইত্যাদি।
প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে, ব্যানার বা সাইনবোর্ড লিখন, মৎস্য চাষ, কাগজের প্যাকেট তৈরি, ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি মেরামত ইত্যাদি।
নিরক্ষর বন্দীদের গণশিক্ষার মাধ্যমে অক্ষর জ্ঞান দেয়া এবং কারাগার মসজিদের ইমামের মাধ্যমে বন্দীদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, কারাগারে বন্দীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৩৮টি কারাগারে ৩৯টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বন্দীরা যে পণ্য উৎপাদন করছেন তার লাভের ৫০% তাদেরকে মজুরি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। বন্দীরা সেই অর্থ তারা পরিবারের কাছেও পাঠাতে পারছেন।
কিন্তু জঙ্গি বন্দীরা এ ধরনের সংশোধন কার্যক্রমের অধীনে নেই এবং তাদের জন্য কারাগারে আলাদাভাবে সংশোধনমূলক কোনো কর্মসূচিও নেয়া হয়নি।
এর কারণ হিসেবে কারা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “শুধু প্রশিক্ষণ বা কাজে যুক্ত করা যথেষ্ট নয়। জঙ্গিরা যেহেতু তথাকথিত আদর্শভিত্তিক ধ্যানধারণা নিয়ে চলেন তাদের সেই মতাদর্শের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে হবে, যেটা খুব কঠিন কাজ। এজন্য এমন কাউকে লাগবে যারা পাল্টা যুক্তিসহ বক্তব্য তাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। ”
বিভিন্ন দেশে এই জঙ্গি বন্দীদের জন্য কারাগারে ডির্যাডিক্যালাইজেশনের কর্মসূচি থাকে এবং দেশগুলো এর সুফল পাওয়ার কথাও জানিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল ছয়টি কারাগারে ডি-রেডিক্যালাইজেশন সেন্টার গড়ে তোলা হবে।
সেখানে মনোবিজ্ঞানী, সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষজ্ঞ ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ বা ইমাম নিয়োগের কথাও বলা হয়েছিল
মূলত হলি আর্টিসান বেকারিতে ভয়াবহ হামলার পর ওই প্রকল্পের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোন কৌশল বা পরিকল্পনা নিতে দেখা যায়নি।
আবার কারাগারে জঙ্গি বন্দিদের সংশোধন বা ডি-রেডিক্যালাইজেশনের কাজ করে এমন কোন বেসরকারি সংস্থাও নেই।
তবে কারা সূত্র বলছে, এই জঙ্গি বন্দীদের ভ্রান্ত ধারণা ও ভুল মতাদর্শ থেকে সরিয়ে সঠিক পথে আনতে তারা, মোটিভেশনাল প্রোগ্রামসহ নানাবিধ উদ্যোগ নেবেন।
‘উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় সম্মেলন-২০১৯’ -এ তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছিলেন, জঙ্গিরা কারাগারে সংশোধন হতে পারছে না। কারণ জেলের সুযোগও বেশ সীমিত।
'জঙ্গি-বন্দী' কোন শ্রেণীভুক্ত
কারাগারের ভেতরে বন্দীদের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও সাধারণ বন্দীর শ্রেণীবিন্যাস থাকে।
এরমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর বন্দীরা ভালো মানের খাবার, যেমন চিকন চালের ভাত, বেশি পরিমাণে মাছ, মাংস পেয়ে থাকেন।
শোবার জন্য বিছানা বরাদ্দ থাকে, অপেক্ষাকৃত কম মানুষ ব্যবহার করে এমন সেল ও টয়লেট ব্যবহার সেইসাথে পত্রিকা পড়ার সুবিধা পেয়ে থাকেন।
প্রতিটি কারাগারে ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলা এবং বন্দী ব্যারাকে টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা থাকে।
সাধারণত প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তারা দণ্ডপ্রাপ্ত হলে কারাগারে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পান।
তবে সেটাও মামলার ধরন, প্রকৃতি, দণ্ড ইতাদির ওপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি জেল সুপার।
কোন বন্দীকে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হবে কি না সেটার নির্দেশ আদালত থেকে আসে। এবং এ সংক্রান্ত সুপারিশ যায় জেলা প্রশাসক ও ডিসির মাধ্যমে।
কিন্তু জঙ্গি বন্দীরা যেই হোন না কেন তারা সব সময় সাধারণ শ্রেণীর মর্যাদাই পেয়ে থাকেন।
প্রাচীন বিধি আধুকায়ন হচ্ছে না
কারা বিভাগ বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান। ১৭৮৮ সালে ঢাকায় একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে কারা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তীতে ১৮১৮ সালে রাজবন্দীদের আটকার্থে বেঙ্গল বিধি জারি করা হয়। ১৮৬৪ সালে প্রবর্তন হয় জেল কোড।
তবে বাংলাদেশে বর্তমানে ১৮৯৪ সালের প্রিজন অ্যাক্ট (কারাবিধি) কার্যকর রয়েছে এবং বাংলাদেশের কারা বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্রিটিশ শাসনামলের ১৩০ বছরের কারাবিধি থেকে বের হয়ে বার বার নতুন বিধি প্রণয়নের কথা বলা হলেও এখনও তা পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।
কারাগারের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ধারণ ক্ষমতার চাইতে দ্বিগুন বন্দির অবস্থান এবং তাদের ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় জনবল না থাকা।
দেশটির ৬৮টি কারাগারের ধারণক্ষমতা সাড়ে ৪২ হাজারের কিছু বেশি হলেও ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এসব কারাগারে বন্দির সংখ্যা ছিল ৮৪ হাজারের বেশি। ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুনেরও বেশি।
এদিকে, কারাবিধিতে, বিচার চলমান কয়েদি এবং হাজতিদের জন্য জেলখানায় ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে একজন বন্দীকে জেল কোডে বর্ণিত জায়গার এক-তৃতীয়াংশ জায়গায় থাকতে হচ্ছে।
অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ২০১৬ সালে কেরানিগঞ্জে স্থানান্তর হলেও এখন বাড়তি বন্দীর চাপ কাটানো যায়নি
কারাবিধির অনুযায়ী প্রতি আট বন্দির জন্য একজন কারারক্ষী থাকার নিয়ম রয়েছে, জঙ্গি বন্দীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাাট আরও বেশি।
অথচ দায়িত্ব পালনের জন্য দেশব্যাপী কারাগারগুলোয় কারারক্ষী রয়েছেন ৯ হাজারের মতো। প্রায় দুই হাজার কম।
সীমিত জনবল ও অপর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্টের মাধ্যমে এই বাড়তি বন্দীর চাপ সামাল দেয়া সেইসাথে তাদের নিরাপত্তা দেয়া, শৃঙ্খলা রক্ষা, মানবিক আচরন, সুযোগ সুবিধা দেয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কারা অধিদফতর।
আবার এই কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৮০% হলেন হাজতি বা বিচারাধীন বন্দী। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের কারাগারে সর্বোচ্চ ৩৪ শতাংশ এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ বিচারাধীন বন্দি থাকলে সেটিকে আদর্শ মান হিসেবে ধরা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের কারাগারে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা আদর্শ মানের দ্বিগুণেরও বেশি।
এর ফলে হাজতির সংখ্যায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে এবং বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ (সিএইচআরআই) এর গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।