ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বর্তী উপবাসের উপকারিতা কি অতিরঞ্জিত?

হাতে কাঁটাচামচ ও খাবার

ছবির উৎস, BBC/ Javier Hirschfeld/ Getty Images

    • Author, সালি অ্যাডি
    • Role, বিবিসি নিউজ
  • Published
  • পড়ার সময়: ৯ মিনিট

যেকোনো জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মতো, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বতী উপবাস যে কার্যকর তা প্রমাণ করা বেশ কঠিন। তবে নতুন প্রযুক্তি কোন বিষয়টি কাজ করে আর কোনটি করে না, তা আমাদের আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

প্রতি কয়েক মাস পরপরই মনে হয় অন্তর্বর্তীকালীন উপবাসের উপকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে উপবাস করা অথবা দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়ের মধ্যে খাবার গ্রহণ সীমাবদ্ধ রাখার এই জনপ্রিয় ও বহুমুখী ডায়েটটি সাধারণ ক্যালরি কমানোর পদ্ধতির চেয়ে ওজন কমানোকে সহজ করে তোলে বলে পরিচিতি পেয়েছে।

তবে এর তথাকথিত সুবিধাগুলো আরও বেশি বিস্তৃত। যেমন ক্যানসার ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি কমানো। ফলে এই জীবনযাত্রা এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার মধ্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রমাণ এই দাবিগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গবেষণার ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অন্তর্বর্তী উপবাস অন্য ডায়েটের তুলনায় কখনো বেশি কার্যকর, আবার কখনো কম কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে।

একটি গবেষণায় তো এমনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এই চর্চাটি ক্ষতিকর হতে পারে এবং এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কথা ছেড়েই দিন, সব তথ্যের বিষয়ে বিজ্ঞানীরাও সব সময় একমত হতে পারেন না।

"এটি কোনো যাদু নয়।"

তাহলে কি অন্তর্বর্তীকালীন উপবাসকে অতিরিক্তভাবে প্রচার করা হয়েছে? নাকি এটি এমন একটি আশাব্যঞ্জক খাদ্যপদ্ধতি, যা আমাদের জীবনে আরও কয়েক বছর যোগ করতে পারে? আর কেনই বা এর প্রমাণগুলো এত অসামঞ্জস্যপূর্ণ?

অনেক গবেষক বলছেন, ডাটা বা তথ্যকে আরও নির্ভরযোগ্য করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাটি সমাধান করাও সবচেয়ে কঠিন।

অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, "মানুষ আসলে কী খাচ্ছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই।"

এই কথাটি অন্যান্য অনেক, বা বলা চলে সব ধরনের খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি অন্য খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় বেশি উপকার বয়ে আনে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি অন্য খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় বেশি উপকার বয়ে আনে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

প্রাগৈতিহাসিক খাদ্যাভ্যাস

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

অন্তর্বর্তীকালীন উপবাসের ধারণা হলো আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে খাওয়ার জন্য বিবর্তিত হয়েছিলেন, সেটিকে প্রতিফলিত করা।

বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে কাজ করা স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্ক ম্যাটসন, যার গবেষণা এই ক্ষেত্রের ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, বলেন, "আমরা এমন পরিবেশে বিবর্তিত হইনি যেখানে দিনে তিন বেলা খাবার এবং তার সঙ্গে দুইবার নাশতা খেতাম।"

উপবাসের ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া প্রথমে চিনি পোড়ানো (যে প্রক্রিয়াকে গ্লাইকোলাইসিস বলা হয়) থেকে রক্তে সঞ্চালিত চর্বি পোড়ানোর দিকে স্থানান্তরিত হয়।

এই বিপাকীয় পরিবর্তন কোষের আচরণ বদলে দেয়। সুস্থ কোষ ক্ষয়প্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন পুনর্ব্যবহার শুরু করে, যাকে অটোফ্যাজি বলা হয়। এর ফলে কোষ যেন নবজীবন লাভ করে।

তাত্ত্বিকভাবে, এখান থেকেই দাবিকৃত স্বাস্থ্যগত উপকারিতাগুলো আসে।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি প্রভাবশালী পর্যালোচনায় ম্যাটসন এই বিপাকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি এবং ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের হার কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু একটি সমস্যা আছে।

এই আকর্ষণীয় ব্যাখ্যার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ এসেছে ইঁদুর, মাছি এবং কৃমির ওপর গবেষণা থেকে। তাদের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস যেন এক জাদুকরী সমাধান ছিল।

ইঁদুরের একটি দলকে আরেকটি দলের সমান ক্যালরি দেওয়া হলেও, যদি তাদের খাবার খাওয়ার সময় সীমিত রাখা হতো, তাহলে তারা বার্ধক্য পর্যন্ত সুস্থ ও ছিপছিপে থাকত। অন্যদিকে মুক্তভাবে খাওয়া দলটি স্থূল ও অসুস্থ হয়ে পড়ত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষের ওপর গবেষণার ফলাফল এতটা স্পষ্ট নয়।

অনেক মানুষের ক্ষেত্রে তারা কী খেয়েছে সে সম্পর্কে স্মৃতি গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে তারা কী খেয়েছে সে সম্পর্কে স্মৃতি গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ।

মানুষ ও ইঁদুরের পার্থক্য

স্থূলতার ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।

অন্তর্বর্তীকালীন উপবাসের ধরনের ওপর নির্ভর করে এটি মানুষের শরীরে "প্রায় ৫% ওজন কমায়", বলেন অধ্যাপক ভারাডি।

এটি "অন্য যেকোনো ডায়েট কৌশলের মতোই কার্যকর", তিনি বলেন, তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রমাণগুলো ইঁদুরে (বা সোশ্যাল মিডিয়ার গল্পে) দেখা যাওয়া চমকপ্রদ ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেনি।

তিনি বলেন, "এটি অন্য যেকোনো খাদ্য কৌশলের মতোই কার্যকর," কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এখনো ইঁদুরে দেখা নাটকীয় ফল দেখা যায়নি।

নিঃসন্দেহে, সামান্য ওজন কমাও বিপাকীয় উপকারিতা আনতে পারে।

অধ্যাপক ভারাডি বলেন, "বিপাকীয় ঝুঁকির কিছু সূচকে হ্রাস দেখা যায়," যার মধ্যে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ রয়েছে। এমনকি এটি পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের উপসর্গও কমাতে পারে।

তিনি বলেন, পদ্ধতির শুরুতে একজন ব্যক্তি যতটা কম সুস্থ থাকবেন, তিনি তত বেশি স্বাস্থ্য সুবিধা পাবেন।

তবে ইঁদুরের ক্ষেত্রে যা পর্যবেক্ষণ করা গেছে, মানুষের ক্ষেত্রে এগুলোও তুলনামূলকভাবে কম সুস্পষ্ট হতে থাকে। তদুপরি, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের আরও তীব্র রূপগুলো-যেমন একদিন পর পর উপবাস করা-পেশির ভর কমিয়ে দিয়ে একজন ব্যক্তির মেটাবলিক স্বাস্থ্য দুর্বল করে তুলতে পারে।

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির দাবির ক্ষেত্রেও এক পরিচিত গল্প সামনে আসে: ইঁদুর ও মানুষের তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। আর ক্যানসার সংক্রান্ত গবেষণাও একইভাবে মিশ্র বার্তা দেয়।

প্রাণির ওপর পরিচালিত পরীক্ষা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে ক্যানসার প্রতিরোধের পাশাপাশি বিষাক্ত কিমোথেরাপি সহ্য করার অতিরিক্ত সহনশীলতার সাথে যুক্ত করেছিল। কিন্তু ইঁদুরে কাজ করা সেই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে মানুষের ক্ষেত্রে করা একটি বড় গবেষণা ব্যর্থ হয়েছে।

(গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদী উপবাসের জৈবিক প্রতিক্রিয়ার অনুকরণে একটি বিশেষ ডায়েট তৈরি করেছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে, এটি সুস্থ কোষগুলোকে আরও সহনশীল করার পাশাপাশি ক্যানসার কোষগুলোকে দুর্বল করে দেবে। তবে, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কখনোই কাঙ্ক্ষিত মেটাবলিক পরিবর্তনের স্তরে পৌঁছাতে পারেননি।)

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আমাদের ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি অন্যান্য ডায়েটের তুলনায় বেশি সুবিধা আনে কি না তা স্পষ্ট নয়।

তা সত্ত্বেও, ৫:২ ডায়েট মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের কিমোথেরাপি নেওয়ার সময় জীবনযাত্রার মান এবং রোগের গতি ধীর করার দিক থেকে আরও ভালো প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বিভ্রান্তিকর ও পারস্পরিক বিরোধী অনুসন্ধানের মধ্যে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন ফুটে ওঠে: ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সুবিধাগুলো প্রাণির ক্ষেত্রে যতটা চিত্তাকর্ষক ছিল, মানুষের ক্ষেত্রে ততটা নয়।

কেন? আংশিকভাবে এর কারণ মৌলিক জৈবিক পার্থক্য।

উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুরের বিপাকীয় হার মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোর্টনি পিটারসন বলেন, "একটি ক্ষুদ্র কৃন্তক প্রাণির ১৬ ঘণ্টার উপবাস মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক দিনের উপবাসের সমান, কারণ তাদের বিপাকীয় হার অনেক বেশি।"

তারপর আবার এই পরীক্ষাগুলোতে ব্যবহৃত ইঁদুরগুলো সাধারণত একে অপরের জিনগত ক্লোন হয়ে থাকে, ভারাডি বলেন, যা মানুষের মধ্যে থাকা বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়।

"তারা একেবারেই বাজে মডেল," তিনি বলেন।

তবে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাধাটি জৈবিক নয়। সেটি হলো তথ্য।

"মানুষ আসলে কী খাচ্ছে তা জানা খুবই কঠিন," পিটারসন বলেন।

মানুষ কী খেয়েছে তার আরও নির্ভুল রেকর্ড তৈরি করা গেলে অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস এবং অন্যান্য বহু হস্তক্ষেপ নিয়ে বিদ্যমান প্রশ্নগুলোর সমাধানে সহায়তা করবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মানুষ কী খেয়েছে তার আরও নির্ভুল রেকর্ড তৈরি করা গেলে অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস এবং অন্যান্য বহু হস্তক্ষেপ নিয়ে বিদ্যমান প্রশ্নগুলোর সমাধানে সহায়তা করবে।

ত্রুটিপূর্ণ স্মৃতিশক্তি

প্রাণির ক্ষেত্রে খাদ্য ও প্রভাবের মধ্যবর্তী যোগসূত্র এত স্পষ্ট হওয়ার একটি কারণ ছিল যে তারা কী খাচ্ছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।

ইঁদুর ও ল্যাবরেটরির অন্যান্য প্রাণির "ডায়েট মেনে চলা" ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। একজন গবেষক ঠিক যতটা এবং যে খাবার দেন, তারা সেটাই খায়। এটি খাদ্য ও জৈবিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রভাবের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন সহজ করে তোলে।

তবে মানুষ অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে করা বেশিরভাগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে আপনি তাদের পুষ্টি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

আপনি তাদের যে ডায়েট অনুসরণ করতে চান সে বিষয়ে নির্দেশ দিতে পারেন এবং একটি ফুড ডায়রি বা খাবারের ডায়রি দিতে পারেন, যা কাগজের বা কখনো ভার্চুয়াল হতে পারে।

তারপর তারা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়।

"পুষ্টি বিষয়ক গবেষণায় মানুষ আসলে কী খাচ্ছে তা পরিমাপের কোনো উপায় আমাদের কাছে নেই," অধ্যাপক ভারাডি বলেন। "তাই তারা সততা বজায় রাখছে কি না তার ওপর আমাদের সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে হয়।"

কিন্তু সৎ মানুষের স্মৃতিশক্তিও নিখুঁত নয়। তারা ফুড ডায়রিতে কোনো একবেলার খাবার অন্তর্ভুক্ত করতে ভুলে যেতে পারেন (যা দেখতে সময়-নিয়ন্ত্রিত খাওয়ার মতো মনে হয়)। অথবা, নিয়ম না মানার লজ্জাবোধ থেকে, তারা উপবাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়তো খেয়ে ফেলা দু-একটি খাবার বাদ দিতে পারেন।

ক্রিস্টা ভারাডি অনুমান করেছেন যে তাঁর গবেষণা নিবন্ধের বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে মাত্র ৫০% লোক ফুড রেকর্ড বা খাবারের তালিকা ফেরত দেন। বাকিরা কখনো কখনো তথ্য জালিয়াতি করেন।

ভারাডি জানান যে একজন তরুণ পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে এই শিক্ষা পেয়েছিলেন।

গবেষণা নিবন্ধের বিষয়বস্তুরা যে ঘরে তাঁদের খাবারের রেকর্ড জমা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এক অংশগ্রহণকারীকে তাড়াহুড়ো করে পুরো এক সপ্তাহের খাবারের হিসাব খাতায় লিখতে দেখেন। "তারা পুরোটাই বানিয়ে লিখছিল," তিনি বলেন। "আর আমি ভাবলাম, বাহ, এটা তো একেবারে ভুয়া তথ্য। তারপর আমি চিন্তা করলাম, 'আরও কতজন মানুষ এমনটা করছে?''

আবেরেস্টউইথ ইউনিভার্সিটির পুষ্টি বিষয়ক গবেষক থমাস উইলসন বলেন, প্রায় ৩০% মানুষ তাদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ কম উল্লেখ করেন। "মানুষ বেশি তথ্য প্রকাশ করছে এমনটা খুব কমই ঘটে," তিনি আরও যোগ করেন।

একজন ব্যক্তি কতটুকু শক্তি গ্রহণ করছেন তা নিখুঁতভাবে ট্র্যাক বা অনুধাবন করার জন্য 'ডাবলি লেবেলড ওয়াটার' স্টাডিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় বলে মনে করা হয়।

এই পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের নিরাপদ স্থায়ী আইসোটোপ দিয়ে সমৃদ্ধ পানি পান করেন। ঘাম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে এগুলো কত দ্রুত শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তা মেপে বিজ্ঞানীরা হিসাব করতে পারেন যে ওই সময়ে তাঁদের শরীর কতটা শক্তি ব্যবহার করেছে।

২০২৫ সালের সমীকরণটি নির্দেশ করেছে যে মানুষ গড়ে ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরিরও বেশি কম রিপোর্ট করে। তবে ব্যক্তিভেদে এই হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি যখন একজন মানুষের খাবার গ্রহণের স্মৃতি বাস্তবের থেকে কতটা আলাদা তা অনুমান করতে এটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। "মানুষ দিনে ১,৬০০ থেকে ২,০০০ ক্যালরি খাওয়ার কথা জানায়," তিনি বলেন।

"এবং তারপর আমরা যখন ডাবলি লেবেলড ওয়াটার থেকে মূল তথ্য পাই, দেখা যায় সেটি প্রায় ৩,৫০০ ক্যালরি।"

এমনকি পুষ্টিবিদদের জন্যও পুষ্টির সঠিক মান রিপোর্ট করা কঠিন, পিটারসন বলেন। কারণ পরিবেশনের পরিমাণের অনেক পার্থক্য থাকে।

বিষয়টি আরও জটিল করে তোলে যে কোনো খাবারের উপাদান অনুমান করতে বিজ্ঞানীরা যে নিউট্রিশন কম্পোজিশন টেবিল ব্যবহার করেন-যেমন একটি বার্গারে কতগুলো ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে-তাতে কেবল গড় হিসাব থাকে, পণ্যভিত্তিক নির্দিষ্ট বিবরণ নয়।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো এত সুপরিচিত এবং এত বিরক্তিকর যে জার্নালগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে রিপোর্ট করা খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা প্রকাশ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে বাস্তবতার খাতিরে পুষ্টিবিদরা রেকর্ড ও জরিপগুলো একেবারে ত্যাগ করতে পারেন না। "আমাদের হাতে যা আছে তা কেবল এটাই," ভারাডি বলেন।

তবে হয়তো আর বেশি দিন এমন থাকবে না।

প্রাণির তুলনায় মানুষের মধ্যে বৈচিত্র অনেক বেশি এবং নানা ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকে

ছবির উৎস, Serenity Strull/ BBC

ছবির ক্যাপশান, প্রাণির তুলনায় মানুষের মধ্যে বৈচিত্র অনেক বেশি এবং নানা ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকে

স্মার্ট কাঁটাচামচ, গলার ডিভাইস ও দাঁতের সেন্সর

মানুষের ওপর করা সব গবেষণা নিজস্ব রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে না। বিজ্ঞানীরা এখন এজন্য নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।

ইনপেশেন্ট ফিডিং ট্রায়াল-এক ধরনের নিখুঁত গবেষণা যেখানে গবেষকরা অংশগ্রহণকারীরা কী খাচ্ছেন তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন-ইঁদুরের গবেষণার মতোই বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রদান করতে পারে।

প্রতিটি ক্যালরি যত্ন সহকারে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, খাদ্য মেপে দেখা হয়, বাড়তি খাবারের সুযোগ থাকে না।

পিটারসন এই ধরনের পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। তাঁর গবেষণায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সাধারণ তথ্যের তুলনায় শক্তিশালী প্রভাব দেখিয়েছে; যেমন রক্তের শর্করা ও রক্তচাপ কমে যাওয়া, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নামক আণবিক ক্ষতির হ্রাস এবং অটোফেজি বৃদ্ধি।

তবে খরচের কারণে এই পরীক্ষাগুলোকে খুব ছোট এবং সংক্ষিপ্ত হতে হয়েছিল, যা তাদের থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলোকে কিছুটা সীমাবদ্ধ করে। (খাদ্য বিষয়ক পরীক্ষার জন্য ছয় মাসের জন্য গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো সময় খুব কম অংশগ্রহণকারীরই থাকে।)

কিন্তু আপনি যদি প্রযুক্তির সাহায্যে এই অত্যন্ত নজরদারিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারতেন তবে কেমন হতো? ক্রমান্বয়ে পুষ্টিবিদরা এমন সব অভিনব পদ্ধতির দিকে নজর দিচ্ছেন যা নিজস্ব রিপোর্টের ওপর কম বা একেবারেই নির্ভর করে না। বেশ কয়েকটি নতুন প্রযুক্তি এখন মানুষ কী খায় তার একটি আরও বস্তুনিষ্ঠ রেকর্ড প্রদান করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের যা কিছু খান তার ছবি তোলার কথা বলা হয়। তবে এটিও অংশগ্রহণকারীর সক্রিয়ভাবে সেই তথ্য রেকর্ড করার ওপর নির্ভর করে, তাই অন্য গবেষণায় চশমা বা নেকলেসে বসানো ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। তবে ক্যামেরা গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

মানুষ কী খেয়েছে তার আরও ভালো রেকর্ড তৈরি করা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এবং অন্যান্য অনেক পদ্ধতির ওপর এখনো অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সমাধানে সাহায্য করবে।

ক্যামেরা ছাড়াই খাবার ও স্ন্যাক্স পর্যবেক্ষণ করার জন্য অন্যান্য সেন্সর তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে চর্বণ সনাক্তকারী নেকলেস, স্মার্ট ফোর্ক যা কেউ কখন এবং কী পরিমাণ খাবার মুখে তুলছে তা সনাক্ত করে এবং দাঁতে বসানো নিউট্রিয়েন্ট সেন্সর।

এই ধারণাগুলোর বেশিরভাগই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আপাতত সবচেয়ে ব্যবহারিক সমাধান হলো নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা যা শরীর দ্বারা প্রক্রিয়াজাত হওয়া ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে।

"প্রস্রাব ও রক্ত বিশ্লেষণ আপনাকে আরও উপাদানভিত্তিক তথ্য দেবে," উইলসন বলেন।

জ্ঞানের প্রয়োজন

গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন গোপনীয়তার লঙ্ঘন এবং খাদ্যাভ্যাসের সঠিক ধরন বোঝার মধ্যবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবধান দূর করার চেষ্টা করছেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা ইঁদুরের ফলাফলকে মানুষের ফলাফলের সাথে মিলিয়ে ফেলছেন এবং ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের কিছু সুবিধাকে মাত্রাতিরিক্ত প্রচার করছেন।

"আমি একটি ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার কথা ভাবছি কারণ আমি প্রচুর ভুয়া তথ্য দেখতে পাই," ক্রিস্টি ভারাডি বলেন।

এই সমস্যা কেবল ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

"এ কারণেই মানুষ পুষ্টিবিষয়ক গবেষণা নিয়ে এত হতাশ হয়," তিনি ব্যাখ্যা করেন।

তিনি কোলেস্টেরলের পরামর্শের দিকে ইঙ্গিত করেন, যা বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিকর বস্তু থেকে ভালো বস্তুর তকমায় পরিবর্তিত হয়েছে। "কারণ মানুষ কী খাচ্ছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই।"