কে এই উগ্র ডানপন্থী ইতামার বেন-গাভির যিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রী হচ্ছেন?

Published

ইসরায়েলের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ডানপন্থী দল লিকুদ পার্টি ঘোষণা করেছে যে জিউইশ পাওয়ার নামে একটি কট্টর ডানপন্থী দলের সাথে তারা জোট সরকার গঠনের লক্ষ্যে প্রথম চুক্তি সই করেছে।

এই চুক্তিটি যদিও নতুন সরকারের কাঠামো কী হবে সে সম্পর্কে চূড়ান্ত কোন ধারণা দেয় না, কিন্তু এর মাধ্যমেই জিউইশ পাওয়ার পার্টির নেতা ইতামার বেন-গাভির ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় একটি আসন পেতে যাচ্ছেন।

এই চুক্তির আওতায়, বেন-গাভির অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বর্ডার গার্ড পুলিশকে পরিচালনা করবেন এবং পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলির অবস্থা নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা দিয়ে ঐ মন্ত্রণালয়কে তার দলের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে।

গত ১লা নভেম্বর নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইসরায়েলের রাজনীতিতে চরম ডানপন্থীদের উত্থান।

কিন্তু এই উত্থানের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিত্ব ইতামার বেন-গাভির সম্পর্কে আসলে কতটুকু জানা যায়?

র‍্যাবাই কাহানের ভাবশিষ্য

বেন-গাভির ইসরায়েলের সেই উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর একজন, যারা বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েল একটি ইহুদি জাতীয়তাবাদী ও জায়নিস্ট রাষ্ট্র।

ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তারা ঘোর বিরোধী।

অতীতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে তিনি সমর্থন করেছেন, এবং টাইমস অফ ইসরায়েল পত্রিকার খবর অনুযায়ী, তিনি ‘অবিশ্বাসী’ আরব নাগরিকদের দেশ থেকে বল প্রয়োগ করে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেটা দেশের ভেতর তাকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।

ইতামার বেন-গাভির ১৯৭৬ সালের ৫ই মে জেরুজালেমের এক মহল্লায় ইরাকি ইহুদি পিতামাতার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

অল্প বয়স থেকেই তিনি অতি-অর্থোডক্স কাচ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।

এই দলটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন র‍্যাবাই মায়ার কাহানে।

বেন-গাভির ছিলেন হেব্রনের কেন্দ্রস্থলের কিরিয়াত আরবা বসতিতে কাচ আন্দোলনের নেতা নোয়াম ফ্রিডম্যানের অন্যতম সহকারি।

নিষিদ্ধ কাচ আন্দোলনের ফসল

ফিলিস্তিনিদের সাথে অসলো শান্তি চুক্তি সই হওয়ার পর বেন-গাভিরকে দেখা যায় ক্যামেরার সামনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎসহাক রাবিনের ক্যাডিলাক গাড়ির প্রতীক তুলে ধরে বলছিলেন: "আমার তার কাছে পৌঁছাতে পারি।"

এর এক মাসেরও কম সময় পর ১৯৯৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর ইৎসহাক রাবিন তেল আভিভের এক শান্তি সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন এবং গুরুতর আঘাত নিয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান।

কট্টর ডানপন্থী দল কাচ আন্দোলন হলো একমাত্র ইসরায়েলি রাজনৈতিক সংগঠন যেটিকে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

কাচ দলের বর্ণবাদ এবং চরমপন্থা এমনকি লিকুদ পার্টির জন্যও অসহনীয় ছিল।

উনিশশো নব্বই সালে নিউইয়র্ক সিটিতে এক ভাষণ দেয়ার সময় র‍্যাবাই কাহানে একজন মিশরীয়র হাতে খুন হন।

কাচ আন্দোলন নিষিদ্ধ হওয়ার পরও বেন-গাভির ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তার চরমপন্থি এবং বর্ণবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে থাকেন।

তার বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেয়া এবং সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থন করার অভিযোগসহ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয়ার মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়।

কিরিয়াত আরবাতে নিজের বাড়িতে বেন-গাভির এই সেদিন পর্যন্ত বারুচ গোল্ডস্টিনের একটি ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।

বারুচ গোল্ডস্টিন ১৯৯৪ সালে হেব্রনের ইব্রাহিম মসজিদে নামাজরত ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে খুন করেছিল।

'আরব শত্রুদের বহিষ্কার করো'

শিক্ষাগত দিক থেকে বেন-গাভিরের আইনের ডিগ্রি রয়েছে।

বিশেষ করে কিছু আলোচিত মামলায় ইহুদি বসতি-স্থাপনকারীদের পক্ষে তিনি আইনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন।

দু’হাজার সাত সালে "আরব শত্রুদের বহিষ্কার করো" লেখা একটি সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বর্ণবাদে উসকানি দেয়ার অভিযোগ তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

অবশ্য এখন তিনি বলেন, সব ফিলিস্তিনিকে বহিষ্কার তিনি আর সমর্থন করেন না, শুধুমাত্র যাদেরকে তিনি "বিশ্বাসঘাতক বা সন্ত্রাসী" বলে মনে করেন তারা বাদে।

জোটের রাজনীতিতে উত্থান

দু’হাজার বারো সালে র‍্যাবাই কাহানের অনুসারীদের প্রতিষ্ঠিত জিউইশ পাওয়ার পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন ইতামার বেন-গাভির।

এককভাবে বা জোট করে হোক, দলটি ২০১৩ এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনে ইসরায়েলের সংসদ কেনেসেটে ঢুকতে ব্যর্থ হয়।

দু’হাজার উনিশ সালের নির্বাচনের আগে, দলটি জিউইশ হোম নামে একটি জোটে ঢুকে পড়ে, যে জোটে রয়েছে বেশ কয়েকটি কট্টর ডানপন্থী দল।

ঐ জোট নির্বাচনে পাঁচটি আসন জিততে সক্ষম হয় এবং জোট দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে জিউইশ পাওয়ার পার্টির অবস্থান ছিল সপ্তম স্থানে।

দু’হাজার উনিশ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে দলটি এককভাবে লড়েছিল।

কিন্তু সে সময় তারা মাত্র ১.৮৮% ভোট পেয়েছিল এবং কেনেসেটে স্থান পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৩.২৫% ভোট জোগাড় করতে ব্যর্থ হওয়ায় জিউইশ পাওয়ার কেনেসেটে স্থান পায়নি।

গত বছর দলটি বেশ কয়েকটি চরমপন্থী জায়নিস্ট গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যে জোটের প্রতি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন ছিল।এবং তারই সুবাদে ইতামার বেন-গাভির প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি কেনেসেটে প্রবেশ করেছিলেন।

চলতি বছরের নভেম্বরের নির্বাচনে জিউইশ পাওয়ার পার্টির নেতৃত্বে চরমপন্থী ধর্মীয় দলগুলির একটি জোট রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি ১৪টি আসন জয়লাভ করে এবং সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল হয়ে ওঠে।

মি. নেতানিয়াহুর উদ্যোগে এই দলগুলিকে একত্রিত করা হয়। লক্ষ্য ছিল, চরম ডানপন্থীদের ভোটগুলো যেন ভাগ না হয়, এবং যাতে এই দলগুলি একক নামে কেনেসেটে প্রবেশ করতে পারে তা নিশ্চিত করা।

আর গত নির্বাচনে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে। উগ্র ডানপন্থী জোট সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।