হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে ইরানের হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত

ছবির উৎস, Reuters
- Author, জারোস্লাভ লুকিভ ও বার্ন্ড ডেবুসম্যান জুনিয়র
- Role, হোয়াইট হাউজ রিপোর্টার
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
হরমুজ প্রণালিতে দুটি ট্যাংকারে সোমবার ইরানের 'দুঃসাহসিক' হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার অভিযোগ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন অবরোধের অংশ হিসেবে এই জলপথটি ব্যবহার করা সব পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে।
আন্তর্জাতিক এই জলপথ নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সোমবার রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাতীয় ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুজন ইউক্রেনীয় নাগরিক বলে এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইউএই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই দুঃসাহসিক হামলার নিন্দা জানায়, যা একটি গুরুতর লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট অবমাননা। এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।"
পরে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তারা দাবি করে, দুটি ট্যাংকার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল, নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ করেছিল এবং মাইন পাতা একটি রুট দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি জানায়, তারা ট্যাংকার দুটিতে আঘাত হানে এবং সেগুলোকে অচল করে দেয়।
তারা আরও বলে, "আগ্রাসী শত্রুকে" সহযোগিতা করলে শেষ পর্যন্ত অনুশোচনা, ক্ষতি এবং প্রণালি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হবে, পাশাপাশি "বিশ্বে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি" হবে।
হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তেজনাপূর্ণ কেন্দ্র। রোববার রাতে অঞ্চলে হামলা বিনিময়ের পর সোমবার উভয় পক্ষ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে জড়ায়।
দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে টানা তৃতীয় রাতের মতো হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, তারা ইরানকে "খুব কঠোরভাবে" আঘাত করছেন।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বিরোধ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে, তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন- একটি চুক্তি এখনো সম্ভব।
এদিকে, অবরোধের ঘোষণার জবাবে ট্রাম্পের ব্যবহৃত একই শব্দ ব্যবহার করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান প্রণালিটির 'গার্ডিয়ান' বা অভিভাবক হিসেবে থাকবে।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
দিনটির শুরুতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করবে।
তিনি বলেন, এর ফলে "ইরানের জাহাজ বা তাদের গ্রাহকেরা" গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহনপথে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারবে না। তবে "অন্যান্য সব দেশ প্রণালিটি ন্যায্য ও উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারবে।"
মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে অবরোধ কার্যকর হবে বলেও তিনি জানান।
ট্রাম্প লেখেন, এই মুহূর্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র 'দ্য গার্ডিয়ান অব দ্য হরমুজ স্ট্রেইট' বা 'হরমুজ প্রণালির অভিভাবক' হিসেবে পরিচিত হবে। "তবে ন্যায্যতার খাতিরে, বিশ্বের এই অত্যন্ত অস্থিতিশীল অংশে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের কাজটি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খরচ মেটাতে" এই পথ দিয়ে আসা সব পণ্যের উপর ২০ শতাংশ হারে চার্জ পরিশোধ করতে হবে।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করছে"।
তিনি যোগ করেন, "আমরা তাদের সব আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ধ্বংস করছি। এবং আমরা প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছি।"
দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "হ্যাঁ, আমি মনে করি একটি চুক্তি সম্ভব, অবশ্যই সম্ভব।"
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা ৪৫) "সর্বাধিনায়কের নির্দেশে" হামলা শুরু করা হয়।
কয়েক ঘণ্টা পর তারা নিশ্চিত করে যে ইরানজুড়ে বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বুশেহর, চাহ বাহার, জাস্ক, কোনারাক, আবু মুসা এবং বান্দার আব্বাস। সেন্টকমের ভাষ্যে, এর লক্ষ্য ছিল "বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও কমিয়ে দেওয়া"।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত হরমুজ প্রণালি "চালাবে"। তার দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা একটি চুক্তি "ভঙ্গ" করেছে।
তিনি বলেন, "আমরা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছি।"

ছবির উৎস, Reuters
সেন্টকম জানায়, তাদের বাহিনী ১৪ই জুলাই থেকে "ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর অবরোধ পুনরায় আরোপ করবে"।
সেন্টকমের এক বিবৃতিতে বলা হয়, "অবরোধ লঙ্ঘন করছে না এমন সব জাহাজের জন্য আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচল অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।"
গত শুক্রবার বিবিসির দেখা একটি চিঠিতে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানান, ৭ই জুলাই থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
ফেডারেল আইন অনুযায়ী, ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে হোয়াইট হাউজ আরও ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারে।
ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, "পোটাস (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট) সম্পূর্ণ সঠিক। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য যে পক্ষ সেবা দেবে, তার পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত।"
তিনি আরও বলেন, "ইরান সবসময়ই প্রণালিটির গার্ডিয়ান ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে।"
আরাঘচি আরও যোগ করেন, "অবশ্যই ২০ শতাংশ অনেক বেশি। আমরা ন্যায্য থাকব।"
এদিকে বৈশ্বিক নৌপরিবহন নিয়ন্ত্রক জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) এক মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, "আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য ফি আরোপের বিরোধী অবস্থানে দৃঢ় রয়েছে আইএমও।"
মুখপাত্র আরও বলেন, "কেবল কোনো প্রণালি অতিক্রম করার জন্য বাধ্যতামূলক টোল আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।"
ট্রাম্পের ঘোষণার আগে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক সদরদপ্তর বলেছিল, তারা হরমুজ প্রণালির "পরিচালনায়" যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।
ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে খাতাম আল-আনবিয়ার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেন, প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের "বারবারের দুঃসাহসিকতা এবং বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড" আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলকে "গুরুতরভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে"।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সহযোগিতা ইরানের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে "যুদ্ধের" শামিল হিসেবে বিবেচিত হবে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে "যুদ্ধের আগুন পুরো অঞ্চলের সব দেশকে গ্রাস করবে" বলেও তিনি সতর্ক করেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জাতিসংঘের বিধিমালা অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (১৩ দশমিক ৮ মাইল) পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারে। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে হরমুজ প্রণালি এবং এর নৌপথ সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত।
২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে আগে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তেল এবং ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হতো।
এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) এর আগে তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা বাণিজ্যিক জাহাজে গুলিও চালিয়েছিল এবং দুটি জাহাজ জব্দ করেছিল। এর ফলে প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং তেলের দাম বেড়ে যায়।
তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে এপ্রিলে সব ইরানি বন্দরের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করে। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, অবরোধের আওতায় তারা ১০০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং চারটিকে অচল করেছে।
দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে জুনে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নেয়। কিন্তু পরে প্রণালি নিয়ে বিরোধ আবারও সামনে আসে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ চার্জ দেওয়ার সম্ভাবনায় আপত্তি জানাবে। ট্রাম্পের সমালোচকেরা দেশ-বিদেশে এ কথাও তুলে ধরতে পারেন যে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালিটি খোলা এবং বাধাহীন ছিল।
ঘোষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিকভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে।
কিছু আইনপ্রণেতা, এমনকি রিপাবলিকান দলের সদস্যরাও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধবিরতি, তার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করেছে।
এ ছাড়া অনেক আমেরিকানও প্রশ্ন তুলতে পারেন, বারবার উল্টো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কেন তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তবে রিপাবলিকান দলের অন্য প্রার্থীরা ভোটারদের মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত উদ্বেগের মুখোমুখি হবেন।
ঘোষণাটি আলোচনাকে পুনরায় শুরু করার এবং অন্য দেশগুলোকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার একটি কৌশলও হতে পারে- যে কৌশল অতীতেও ট্রাম্প ব্যবহার করেছেন।








