ভারতের হাসপাতালে স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তায় টাস্ক ফোর্স গঠনের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে সারা ভারতে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে সারা ভারতে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভারতের হাসপাতালগুলিতে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

এর আগে মঙ্গলবার ভারতের সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে কর্তব্যরত তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে মামলা শুনেছে।

সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশও দিয়েছে যে এখন থেকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে।

গত বুধ-বৃহস্পতিবার ‘রাতের রাস্তা দখল’-এর কর্মসূচী চলার সময়ে যেভাবে ওই হাসপাতালে ঢুকে হামলাকারীরা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, ভাঙচুর করেছে, সেই প্রেক্ষিতেই এই নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদীদের ওপরে কোনও বলপ্রয়োগ যাতে না করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশকে সেই নির্দেশও দিয়েছে ভারতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।

ধর্ষণের শিকার ও খুন হওয়া ওই তরুণী চিকিৎসকের নাম ও ছবি যেভাবে নানা সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা যে বেআইনী, সেটা উল্লেখ করে আদালত লিখিত নির্দেশ দিয়েছে যে তার নাম এবং ছবি সব সামাজিক মাধ্যম থেকে মুছে দিতে হবে।

এই সময় সর্বোচ্চ আদালত মন্তব্য করে যে, পরিবর্তন আনার জন্য জাতি আরও একটা ধর্ষণ আর খুনের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করবে না।

ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করেছে

গত বুধ-বৃহস্পতিবার ‘রাতের রাস্তা দখল’-এর কর্মসূচি চলার সময়ে যেভাবে ওই হাসপাতালে ঢুকে হামলাকারীরা তাণ্ডব চালিয়েছে, ভাঙচুর করেছে, সেই প্রেক্ষিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত।

একই সঙ্গে ওই ঘটনার তদন্তের কী অবস্থা, সেটাও শীর্ষ আদালতে জানাতে হবে বৃহস্পতিবার ২২ শে অগাস্টের মধ্যে। তার পরের দিন, ২৩শে অগাস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের ভূমিকা, কেন ঘটনার এফআইআর করতে দেরী হল, কীভাবেই বা ‘রাতের রাস্তা দখল’ কর্মসূচির রাতে হাসপাতালে দুষ্কৃতিরা ঢুকে ভাঙচুর করতে পারল, এইসব বিষয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট, এমনটাই জানাচ্ছে ‘লাইভ-ল’ ওয়েবসাইট।

এসব বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে পৃথক একটি প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

সারা দেশে হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য-কর্মীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখতে ১০ সদস্যের একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

প্রশ্নের মুখে রাজ্য সরকার

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার মামলাটি মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শুনানির জন্য গ্রহণ করেছিল। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে মঙ্গলবার এই মামলাটিই যে সবথেকে অগ্রাধিকার পাবে, সেকথাও আগেই জানিয়ে দিয়েছিল আদালত।

সকাল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা মামলাটির শুনানি চলে।

তার মধ্যে বেশ কয়েকবার কলকাতা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত।

রাজ্য সরকারের কাছে বেঞ্চ জানতে চায় যে “ঘটনাটি যে খুন, তা স্পষ্ট,” তবুও প্রথম এফআইআরে খুনের কথা উল্লেখ ছিল কি না। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের অপসারিত অধ্যক্ষ কী করছিলেন, তা-ও জানতে চান প্রধান বিচারপতি।

গত সপ্তাহের বুধ-বৃহস্পতিবার রাতে ‘রাতের রাস্তা দখল’ কর্মসূচি চলাকালীন ওই হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় হামলাকারীরা।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে যে ওই ভাঙচুরের সময়ে পুলিশ কী করছিল, তাদের তো প্রথম দায়িত্ব ‘ক্রাইম সিন’ বা যে জায়গায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটিকে সুরক্ষিত রাখা!

আরজি করের ঘটনায় দোষীদের ফাঁসি চেয়ে পথে নেমেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরজি করের ঘটনায় দোষীদের ফাঁসি চেয়ে পথে নেমেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী - ফাইল ছবি

‘লাইভ-ল’ ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে যে চিকিৎসকদের কাজে ফেরানোর জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

তাই হোস্টেল সহ হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট সংখ্যায় কেন্দ্রীয় শিল্প-নিরাপত্তা বাহিনী অথবা কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানায় শীর্ষ আদালত।

আদালতের প্রথম লিখিত নির্দেশটিতে অবশ্য এই বিষয়টি ছিল না।

কিন্তু পরে আরও একটি নির্দেশ জারি করে শীর্ষ আদালত, যেখানে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে ওই হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এর পরেও যদি কোনও চিকিৎসক নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন, তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে সেটা ইমেইল করে জানাতে পারবেন।

জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠিত

মামলার শুনানি চলাকালীনই প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ঘোষণা করেছিলেন যে সারা দেশ থেকে চিকিৎসকদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা হবে, যারা দেশের সব হাসপাতালে স্বাস্থ্য-কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই পরামর্শ দেবেন।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এও জানায় যে পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে হাসপাতালে সহিংসতা-রোধী আইন রয়েছে।

কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার খামতির বিষয়গুলি ওইসব আইনে দেখা হয় নি।

‘লাইভ-ল’ আদালতের লিখিত নির্দেশ উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের কাজে নারীরা বেশি সংখ্যায় যোগ দিচ্ছেন।

তাই তাদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করাটা জাতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যারা অন্যদের চিকিৎসা দেন, তাদের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে কোনও রকম আপোস করা যায় না।

বাস্তবে পরিবর্তন আনার জন্য জাতি আরও একটা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করবে না।“

কীভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে কিছু খামতি তুলে ধরেছে শীর্ষ আদালত।

আরজি করের ঘটনায় সারা দেশে কর্মবিরতি চালাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরজি করের ঘটনায় সারা দেশে কর্মবিরতি চালাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ

বলা হয়েছে যে, রাতের ডিউটি করার সময়ে স্বাস্থ্য-কর্মীদের বিশ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় ঘর থাকে না। নারী ও পুরুষদের পৃথক ডিউটি-রুমও দেওয়া হয় না।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ছাড়াই ইন্টার্ন, রেসিডেন্ট ও সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তারদের ৩৬ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়।

হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তারক্ষীদের অনুপস্থিতিই যেন একটা নিয়ম হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য-কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যায় টয়লেট থাকে না।

এছাড়াও যথেষ্ট সংখ্যায় সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা, হাসপাতাল চত্বরের সব জায়গায় যথেষ্ট আলো না থাকা, কেউ অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করছে কী না, তা দেখা হয় না – এই বিষয়গুলিও উল্লেখ করেছে আদালত।

জাতীয় টাস্ক ফোর্সে দশ জন সদস্য থাকবেন বলে নির্দেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

ডাক্তারদের কাজে ফেরার আবেদন

একই সঙ্গে সারা দেশে কর্মবিরতি চালাচ্ছেন যে চিকিৎসকরা, তাদের উদ্দেশ্যে আদালত আবেদন করেছে যে তারা যেন দ্রুত কাজে ফিরে আসেন।

লিখিত নির্দেশে বলা হয়েছে যে চিকিৎসকদের এই কর্মবিরতি সমাজের সেই অংশের মানুষকে সমস্যায় ফেলে, যাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা সবথেকে বেশি প্রয়োজন।

“কর্মবিরতি পালন করা স্বাস্থ্য-কর্মীরা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কাছে সবথেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে,” বলা হয়েছে নির্দেশে।

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন যে তারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ হাতে পাওয়ার পরে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন যে তারা কাজে ফিরবেন কী না।