বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস থেকে পাওয়া সাতটি অভিজ্ঞতা

    • Author, ফার্নান্দো দুয়ার্তে
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপের ফলাফল আগে থেকে অনুমান করার চেষ্টা অনেক পুরোনো। আজকাল সুপারকম্পিউটারগুলোও এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। তাদের পাশাপাশি বাজিগর, বিস্তর জানাশোনা ভক্ত এবং তথাকথিত জ্যোতিষীরাও এতে অংশ নিচ্ছেন।

গত তিনটি আসরে বিজয়ীদের নাম সঠিকভাবে অনুমান করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন জার্মান আর্থিক বিশ্লেষক ইয়োআখিম ক্লেমেন্ট। তিনি মনে করেন, শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে জয়-পরাজয়ের অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

বিবিসি স্পোর্টকে তিনি বলেছেন, নির্দিষ্ট দিনে কোনো দলের ফর্ম বা রেফারির সিদ্ধান্ত আগে থেকে বোঝা যায় না। এমনকি বল পোস্টে না লেগে জালে জড়িয়ে যাওয়ার ভাগ্যও "সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত"।

তবে অতীতের ইতিহাস বিবেচনা করলে, শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত। এর মধ্যে কিছু বিষয় বেশ চমকপ্রদ।

বিজয়ীদের ছোট্ট তালিকা

ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে এ পর্যন্ত ৮৪টি দল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি দল ট্রফি ঘরে নিতে পেরেছে। এরা হলো- আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন এবং উরুগুয়ে।

বিশ্বকাপের ফাইনালে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দেশ খেলেছে। এর মধ্যে কয়েকটি দল বেশ নিয়মিতভাবেই ফাইনালে উঠেছে।

জার্মানি সর্বোচ্চ আটবার ফাইনালে পৌঁছেছে। এরপরে রয়েছে ব্রাজিল (সাত বার), এবং আর্জেন্টিনা ও ইতালি (ছয় বার)।

বিজয়ীদের এই তালিকায় প্রবেশ করা বেশ কঠিন। ২০১০ সালে সর্বশেষ নতুন দল হিসেবে শিরোপা জিতেছিল স্পেন।

নেদারল্যান্ডস তিনবার ফাইনালে খেললেও কখনো জিততে পারেনি। তবে ক্লেমেন্টের মতে, ২০২৬ সালে তারা এই ট্রফি জিততে পারে।

এছাড়া, আফ্রিকা বা এশিয়া থেকে মাত্র দু'বার কোনো দল সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২০২২ সালে মরক্কো এই কীর্তি গড়ে।

ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ

১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২২ সালে কাতারের সর্বশেষ আসর পর্যন্ত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নিজেদের মহাদেশের বাইরে কোনো দলের শিরোপা জয় বেশ বিরল।

২২টি আসরের মধ্যে মাত্র ছয়বার এমনটি ঘটেছে। ব্রাজিল (১৯৫৮, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সাল), স্পেন (২০১০), জার্মানি (২০১৪) এবং আর্জেন্টিনা (২০২২) এই সাফল্য অর্জন করেছে।

আর যদি শুধু দক্ষিণ আমেরিকা বা ইউরোপের মাটিতে অনুষ্ঠিত আসরগুলো বিবেচনা করা হয়, তবে ১৯টি বিশ্বকাপের মধ্যে মাত্র দু'বার এই ভৌগোলিক নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে।

নিজেদের মহাদেশে দলগুলো তুলনামূলক ভালো খেলতে পারে। কারণ তারা সেখানকার আবহাওয়ার সাথে বেশি পরিচিত থাকে এবং ভ্রমণের ক্লান্তি কম হয়। তাছাড়া তাদের বিপুল সংখ্যক দর্শকও মাঠে উপস্থিত থাকে। বস্তুত, স্বাগতিক দেশ হিসেবে ছয়টি দল বিশ্বকাপ জিতেছে।

টুর্নামেন্টের আগের ধাপগুলোতেও এই ভৌগোলিক প্রভাব দেখা গেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার সাতটি দেশ ১৬-দলের নকআউট পর্বে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে ইউরোপের মাত্র ছয়টি দেশ সেখানে জায়গা করে নেয়। অথচ সেবারও অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় ইউরোপ থেকে বেশি দল মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

এরপর চার বছর পর রাশিয়ায়, ইউরোপীয় দলগুলো শেষ ষোলোতে ১০টি স্থান নিশ্চিত করে। এর বিপরীতে লাতিন আমেরিকা থেকে জায়গা পায় মাত্র পাঁচটি দল। এছাড়া, সেমিফাইনালে ওঠা চারটি দলই ছিল ইউরোপের।

তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নতুন ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিনটি ভিন্ন দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো) এই আসরের আয়োজন করবে। আর ৩২টির বদলে ৪৮টি দল এতে অংশ নেবে।

কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান- এই চারটি দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলবে। হয়তো এই টুর্নামেন্টটি অতীতের সব ঐতিহাসিক ধারা ভেঙে দেবে।

ফিফা র‍্যাঙ্কিং কি দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করা দলটি বিশ্বকাপে ভালো করবে- এমনটা আশা করা যুক্তিসঙ্গত। তবে এটি সাফল্যের নিশ্চিত কোনো মাপকাঠি নয়।

১৯৯২ সালে ফিফা বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং চালু করা হয়। টুর্নামেন্টের ফেভারিট দলগুলোর মধ্যে যাতে শুরুতেই লড়াই না হয়, সে জন্য র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী দলগুলোকে বাছাই করা হয়।

টেনিসের মতো অন্যান্য খেলার মতোই একটি দল কতটা ভালো খেলছে তার নির্দেশক হিসেবে এই র‍্যাঙ্কিং হিসাব করা হয়। ফিফা স্বীকৃত প্রীতি ম্যাচসহ অন্যান্য ম্যাচের ফলাফল এখানে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বকাপ জয়ীরা প্রায় সবসময়ই শীর্ষ ১০-১৫টি দলের মধ্য থেকেই আসে। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে থাকা কোনো দল আজ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি।

৮ই জুনের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রবণতা আর্জেন্টিনার জন্য দুঃসংবাদ হতে পারে, কারণ তারা বর্তমানে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে রয়েছে।

১১ই জুন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর দিনে চূড়ান্ত র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হবে।

শিরোপাধারীদের হারার লড়াই

একাধিক বিশ্বকাপ জেতা অনেক দেশ রয়েছে। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি এবং আর্জেন্টিনার সম্মিলিত শিরোপা সংখ্যা ১৬টি। তবে ট্রফি ধরে রাখা বেশ কঠিন একটি কাজ।

টুর্নামেন্টের পুরো ইতিহাসে মাত্র দুটি দেশ টানা দু'বার শিরোপা জিততে পেরেছে - ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সাল) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২ সাল)।

পতনের আগেই আসে বিজয়

২০০২ সাল থেকে হিসাব করলে, আগের আসরের ছয়টি বিজয়ী দলের মধ্যে চারটিই গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম হলো ব্রাজিল (২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০০৬ সালে কোয়ার্টার-ফাইনালিস্ট) ও ফ্রান্স (২০১৮ সালে বিজয়ী এবং ২০২২ সালে রানার্সআপ)।

বিদেশি কোচরা এখনো সুবিধা করতে পারেননি

বিশ্বকাপে বিদেশি কোচ নিয়োগের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে গত তিন দশকে বিদেশি অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করা দলের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৬ সালে এটি সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, যখন অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের মধ্যে ২৭টিতেই বিদেশি কোচ থাকবেন।

এর মধ্যে অতীতের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডও রয়েছে। তাদের দলের দায়িত্বে থাকবেন যথাক্রমে ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তি এবং জার্মান কোচ টমাস টুখেল।

কিন্তু সমস্যা হলো, বিদেশি কোচের অধীনে কোনো দল আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

বায়ার্ন মিউনিখ-ইন্টার মিলানের অদ্ভুত সমীকরণ

এটি সম্ভবত বিশ্বকাপের অন্যতম অদ্ভুত একটি পরিসংখ্যান; গত ১১টি আসরে ফাইনালে ওঠা দলগুলোর মধ্যে অন্তত একটিতে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ অথবা ইতালীয় ক্লাব ইন্টার মিলানের কোনো না কোনো খেলোয়াড় ছিলেন। অথবা এই দুই ক্লাবেরই খেলোয়াড় ছিলেন।

১৯৮২ সাল থেকে মাত্র দু'বার (১৯৮৬ ও ২০১০ সালে) এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এই দুটি ক্লাবের কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই একটি দল ট্রফি জিততে সক্ষম হয়েছে।

ফিফার প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক খেলোয়াড় তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে খেলা ৪৮টি দলের মধ্যে ১৫টি দলে বায়ার্ন মিউনিখ বা ইন্টার মিলানের খেলোয়াড় থাকবেন। এমনকি উভয় ক্লাবের খেলোয়াড়ও থাকতে পারেন।

এর মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মতো শীর্ষ দলগুলোও রয়েছে।